টিফিনের সময় সরকারি স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয় সেদ্ধ ডিম। কিন্তু কিছু সময় পরই বদলে যায় পুরো পরিবেশ। একের পর এক শিশু পেটব্যথায় কাতরাতে শুরু করে। কারো বমি বমি ভাব, কেউ তীব্র অস্বস্তিতে ছটফট করতে থাকে। দ্রুত তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ঘটনাটি শুধু একটি বিদ্যালয়ের সংকট নয়, বরং সারা দেশে পরিচালিত স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মান ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়া কমানোর লক্ষ্য নিয়ে গত বছরের ১৫ নভেম্বর শুরু হয় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি। প্রথম পর্যায়ে দেশের ৬২ জেলার ১৫০টি উপজেলায় চালু হওয়া এ কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে প্রাথমিকের প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে প্রতিদিন খাবার পৌঁছে দেয়ার কথা। সরকারের প্রত্যাশা ছিল, ক্ষুধামুক্ত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পরিবেশে শিশুরা আরো আগ্রহ নিয়ে বিদ্যালয়ে আসবে এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পড়বে ইতিবাচক প্রভাব। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরছে ভিন্ন চিত্র। বিভিন্ন জেলা থেকে নিম্নমানের খাবার, কম ওজনের খাদ্যসামগ্রী, সংরক্ষণে অনিয়ম এবং খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হয়ে পড়ার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। এসব ঘটনা অভিভাবক, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি সরজমিনে কয়েকটি উপজেলায় গিয়ে দেখা যায়, অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে নিম্নমানের খাবার। কোথাও বনরুটি শক্ত ও বাসি, কোথাও ডিমের মান নিয়ে প্রশ্ন, আবার কোথাও দুধ বা বিস্কুটের মেয়াদ ও সংরক্ষণ নিয়ে রয়েছে অনিয়ম। অভিভাবকদের অভিযোগ, পুষ্টি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া কর্মসূচি উল্টো নিম্নমানের খাবারের কারণে সন্তানদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪০০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের ২৯ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন খাবার সরবরাহ করার কথা। প্রকল্পভুক্ত উপজেলার মধ্যে ১৩৫টি অতি উচ্চ ও উচ্চ দারিদ্র্যপ্রবণ, আর বাকি ১৪টি উপজেলা নিম্ন দারিদ্র্যপ্রবণ। ২০২৭ সাল পর্যন্ত এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার ধাপে ধাপে বড় অংকের অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রকল্পটি চালু করার সময় সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে ৩৮ কোটি টাকা, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২ হাজার ১৬১ কোটি ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ১৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়।
কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত খাদ্যতালিকা অনুযায়ী, সপ্তাহে পাঁচদিন শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট মেনু রয়েছে। রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার ১২০ গ্রাম বনরুটি ও ৬০ গ্রাম ওজনের সেদ্ধ ডিম, সোমবার ১২০ গ্রাম বনরুটি ও ২০০ গ্রাম ইউএইচটি দুধ, আর বুধবার ৭৫ গ্রাম ফর্টিফায়েড বিস্কুট ও ১০০ গ্রাম মৌসুমি ফল সরবরাহের কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে অভিযোগ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত ওজনের চেয়ে কম খাবার দেয়া হচ্ছে। কোথাও বনরুটির ওজন কম, কোথাও ফল বা বিস্কুটের পরিমাণও নির্ধারিত মানের সঙ্গে মিলছে না। ফলে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত ব্যাহত হচ্ছে।
শরণখোলা উপজেলার পূর্ব ধানসাগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সহকারী শিক্ষক আব্দুন নূর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওইদিন ৫৫ শিক্ষার্থী স্কুল ফিডিংয়ের ডিম খায়। তাদের মধ্যে ১১ জন প্রচণ্ড পেটব্যথা অনুভব করে। প্রথমে বিদ্যালয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হলেও পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অস্বাস্থ্যকর ডিম খাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের এ শারীরিক সমস্যা হয়েছে।’
ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানায় উপজেলা প্রশাসন। এ বিষয়ে উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা অর্থিতা হাওলাদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা কী কারণে অসুস্থ হয়েছে সে ব্যাপারে শরণখোলা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনির আহমেদকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
পূর্ব ধানসাগরের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসছে। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বাঁশবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত বুধবার সরজমিনে দেখা যায়, সরবরাহ করা কিছু সেদ্ধ ডিম পচা ও পাউরুটিতে রয়েছে ছত্রাক। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক সময় ডিমের কুসুমে কালো আবরণ ও দুর্গন্ধযুক্ত পারুটি পাওয়া যায়। এসব খাবার খেয়ে অনেক সময়ই শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি দুধ খেয়ে কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। মৌখিকভাবে তা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানোর পরও কোনো সমাধান হয়নি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় দিনই পচা ডিম, নিম্নমানের কলা ও পাউরুটিতে ছত্রাক পাওয়া যায়। একাধিকবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। এসব নিম্নমানের খাবারের কারণে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে।’
অভিভাবকদের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বাঁশবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী তাসনিম খাতুনের বাবা মিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুল ফিডিং চালু হওয়ার পর আমার মেয়ে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে স্কুলে বেশি মনোযোগী হয়েছে। কিন্তু কিছুটা বিপত্তি দেখা দিয়েছে খাবারের মান নিয়ে। নিম্নমানের ডিম ও পাউরুটি খেয়ে অনেক সময় পেটে ব্যথা করছে বলে জানায়। পুষ্টির পরিবর্তে যদি শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে কর্মসূচির উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে। তাই সংশ্লিষ্টদের উচিত খাবারের মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া।’
বিদ্যালয়টিতে স্কুল ফিডিং কার্যক্রমে নিম্নমানের খাদ্য বিতরণের অভিযোগ উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের তদন্তেও বেরিয়ে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের জন্য ১ জুলাই সরবরাহ করা ১৩৩টি ডিমের মধ্যে ২০টি ছিল নিম্নমানের। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যালয়ের ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সুশীলনের নজরে আনে।
অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে প্রতিষ্ঠানটির এরিয়া ম্যানেজার সুমন হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পচা ডিম পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে।’ তবে পাউরুটিতে ছত্রাকের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি উল্টো অভিযোগ করেন, ‘অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের খাবার শিক্ষকরা রেখে দিয়ে পরে তা সরবরাহ করে। এতে খাবারের মান কমে যেতে পারে।’
একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে মাদারীপুরেও। গত এপ্রিলে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার খেয়ে সদর উপজেলার পাঁচটি বিদ্যালয়ের অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা এবং দুজনকে গ্রেফতারও করা হয়। এরপর কিছুদিন পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অভিভাবকদের অভিযোগ, এখনো খাবারের মান সন্তোষজনক নয়।
মাদারীপুরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীর অভিভাবক অখিল সাহা বলেন, ‘বিদ্যালয় থেকে যে খাবার সরবরাহ করা হয়, অধিকাংশ সময়ই তা যথেষ্ট মানসম্মত থাকে না। প্রায়ই এ খাবার খেয়ে সন্তান পেটে ব্যথা অনুভব করে। বিশেষত পাউরুটি ও ডিমের ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা বেশি থাকে। কিছুদিন আগেও স্কুলের খাবার খেয়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। এরপর খাবারের মান আগের তুলনায় কিছুটা ভালো হয়েছিল, কিন্তু এখনো আশানুরূপ নয়। আমরা অভিভাবকরা বিষয়টি নিয়ে বেশ শঙ্কিত থাকি।’
বিদ্যালয়ে মানহীন খাবার বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে অভিমত দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে শিশুদের জন্য নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা না গেলে সরকারের এত বড় উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাবে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পচা বা বাসি খাবার খেলে শিশুদের খাদ্যজনিত অসুস্থতা ও তীব্র পেটের পীড়া হতে পারে। যদি এটি সংক্রামক জীবাণুর কারণে হয়, তাহলে একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে শুধু অসুস্থতার হারই নয়, মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। তাই কোনো অবস্থায়ই শিশুদের পচা বা বাসি খাবার দেয়া উচিত নয়। এ ধরনের খাবার মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে।’
নষ্ট বা পচা খাবার কোনো অবস্থায়ই কাউকে দেয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘শিশু হোক, মধ্যবয়সী হোক, বয়স্ক হোক কিংবা অসুস্থ ব্যক্তি—সবার জন্যই এটি সমানভাবে ক্ষতিকর। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের খাবার সরবরাহ করে, তাহলে তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকার যেসব প্রতিষ্ঠানকে খাবার সরবরাহের দায়িত্ব দিয়েছে, তাদের কোনো গাফিলতি থাকলে সে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’
শুধু মানহীন খাবারই নয়, নির্ধারিত ওজনের তুলনায় কম ওজনের খাবার সরবরাহ করারও অভিযোগ রয়েছে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া ও কাশিয়ানী উপজেলার ৩৫৮ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চলমান। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অভিযোগ, বনরুটি শক্ত, পোড়া কিংবা বাসি থাকে। ডিম আকারে ছোট, অনেক সময় ভাঙা ও পচা থাকে। কলা কখনো কাঁচা, কখনো অতিরিক্ত পাকা দেয়া হয়। এমনকি নির্ধারিত ওজনের তুলনায় কম খাবারও সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
কোটালীপাড়ার ৯৩ নং দক্ষিণ ফুকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তায়েবা জান্নাত ত্বহা বলে, ‘আমাদের বনরুটি মাঝে মাঝে পোড়া ও শক্ত থাকে। রুটি থেকে গন্ধ আসে। ডিম ছোট, কলা কাঁচা থাকে।’
এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে কোটালীপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন ভক্ত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্কুল ফিডিং কার্যক্রম শুরুর পর অবস্থা খুব খারাপ ছিল। তদারক করে আমরা সে অবস্থার অনেক উন্নতি ঘটিয়েছি, যা অব্যাহত রয়েছে।’
এদিকে একটি নতুন প্রকল্পের আওতায় বিদ্যালয়ে খাবার সরবরাহের পরিধি আরো বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন এ প্রকল্পের আওতায় ৩৪৯টি উপজেলা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ, উপস্থিতি বাড়ানো ও পুষ্টি নিশ্চিত করা এ প্রকল্পেরও উদ্দেশ্য।
পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, খাবারের যথাযথ মান নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের উদ্যোগে শিক্ষার্থীরা কোনো সুফল পাবে না। বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতালের নিউট্রিশন বিভাগের প্রধান শারমীন আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় শৈশব। এ সময়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু নষ্ট বা দূষিত খাবার শিশুর তাৎক্ষণিক অসুস্থতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। ডায়রিয়া, খাদ্য বিষক্রিয়ার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্ত্রের (নিউরোলজিক্যাল) জটিলতাও দেখা দিতে পারে।’
বিদ্যালয়ভিত্তিক স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে প্রতিদিন টাটকা খাবার প্রস্তুতের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। সেটি সম্ভব না হলে নিরাপদ শুকনো খাবার, মৌসুমি দেশীয় ফল কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প খাদ্য সরবরাহের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে খাবারের মান, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন বলে জানান শারমীন আক্তার।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি সহায়তার অংশ হিসেবে একসময় পুষ্টিসমৃদ্ধ বিস্কুট বিতরণ করা হতো। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে শিক্ষার্থীদের গরম খাবার, বিশেষ করে খিচুড়ি দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত খাবারের তালিকায় জায়গা করে নেয় বানরুটি, ডিম ও কলা। তবে সে উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়েও এখন নানা প্রশ্ন।
জানা গেছে, এসব খাদ্যসামগ্রী স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করে সরবরাহের দায়িত্বে থাকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা এজেন্টের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করে। সরবরাহ ব্যবস্থার এ একাধিক স্তরকে কেন্দ্র করেই তৈরি হচ্ছে অনিয়মের সুযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বরাদ্দে বানরুটির জন্য যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, বাস্তবে অনেক জায়গায় তার চেয়ে অনেক কম দামে কেনা হচ্ছে। ফলে বরাদ্দের অর্থ ও প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের ব্যবধান। একই সঙ্গে খাবারের মান, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় যথাযথ তদারকির অভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তবে এ প্রকল্পের ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক বেড়েছে বলে দাবি করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কর্মসূচির পরিচালক মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আমরাও অভিযোগ পাচ্ছি এবং বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে আমরা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করেছি। মাঠপর্যায়ে মনিটরিংও বাড়িয়েছি।’