রংপুর বিভাগে ৫ হাজার ৫০০ হেক্টরের বেশি জমিতে টমেটো চাষ হয়। যার অর্ধেকের বেশিই আবাদ হয় দিনাজপুর জেলায়। তবে বছরের পর বছর সংরক্ষণের অভাবে দ্রুত পচনশীল টমেটোর বাজারমূল্য না পাওয়ায় কৃষক নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বিষয়টি বিবেচনা করে বিভাগের পঞ্চগড়, দিনাজপুর এবং রংপুর জেলায় উৎপাদিত টমেটো সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন কর্মসূচি নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। ২০২১ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। বৈশ্বিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় স্থগিত ও হ্রাসকরণের বেড়াজালে থমকে যায় তা। সে অনিশ্চয়তা কাটিয়ে আবারো আশার আলো দেখছে প্রকল্পটি।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর রংপুর বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রংপুর, দিনাজপুর ও পঞ্চগড় জেলায় উৎপাদিত টমেটো সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণ এবং বিপণন উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় চারটি সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হবে। এরই মধ্যে গণপূর্তের মাধ্যমে দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে প্রথম পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রকল্প পরিচালক নিখিল চন্দ্র দে।
বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা নিরসন হয়েছে। আমরা প্রথমে রংপুর এবং পঞ্চগড়ে একটি করে এবং দিনাজপুর জেলায় দুটিসহ চারটি সংরক্ষণাগার নির্মাণে দরপত্র আহ্বানের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়েছি। যদি এ সংরক্ষণাগারগুলোর ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়, তাহলে কর্মসূচিতে আরো ছয়টি সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হবে। আশা করছি, চারটি সংরক্ষণাগার চলতি অর্থবছরেই নির্মাণ হবে।’
রংপুর এবং দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগে ৫ হাজার ৫০০ হেক্টরের বেশি জমিতে টমেটোর আবাদ হয়। দিন দিন তা বৃদ্ধিও পাচ্ছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি আবাদ হয় দিনাজপুর জেলায়। তবে টমেটো দ্রুত পচনশীল হওয়ায় সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছরই লোকসানে পড়তে হয় কৃষককে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পঞ্চগড়, দিনাজপুর এবং রংপুর জেলায় টমেটো সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন কর্মসূচি নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় স্থগিত ও হ্রাসকরণের বেড়াজালে থমকে যায় প্রকল্পটি। চলতি বছর ১৭ মার্চ বণিক বার্তায় এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার কৃষক মতিয়ার রহমান গত বছর ৬০ (১০০ শতকে ১ একর) একর জমিতে টমেটো চাষ করেছিলেন। প্রতি একরে তার খরচ হয়েছিল গড়ে ৭০ হাজার টাকা। একেকটি গাছ থেকে টমেটো পেয়েছিলেন সাত-আট কেজি। তিনি বলেন, ‘রংপুর বিভাগের বৃহৎ টমেটোর হাট বলে পরিচিত দিনাজপুরের সদর উপজেলার শেখপুরার গাবুড়াহাট। ১ এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত চলা হাটে শুধু টমেটোই বিক্রি হয়। প্রতিদিন ৪৫-৬০টি ট্রাকে করে ১০-১২ টন টমেটো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। মৌসুমের শুরুতে ১২ হাজার থেকে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা প্রতি টন টমেটো বিক্রি হলেও মাঝামাঝি সময়ে টমেটোর কেজি ৪ টাকারও নিচে নেমে যায়। এ সময় যদি দ্রুত পচনশীল টমেটো সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে কৃষকের লাখ লাখ টাকা সাশ্রয় হবে।’
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর রংপুর বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১০টি সংরক্ষণাগারের মধ্যে দুটি নির্মিত হবে রংপুর জেলা সদরে এবং মিঠাপুকুর উপজেলায়। দিনাজপুর জেলায় সংরক্ষণাগার হবে পাঁচটি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় দুটি, বিরলে দুটি এবং চিরিরবন্দরে একটি। পঞ্চগড় জেলায় তিনটি সংরক্ষণাগার নির্মিত হবে। যার দুটি হবে সদর উপজেলায় এবং একটি বোদা উপজেলায়। উন্নয়ন কর্মসূচির মধ্যে আরো থাকবে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাজার সংযোগ এবং প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর রংপুর বিভাগের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. রবিউল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বছরের পর বছর সংরক্ষণের অভবে দ্রুত পচনশীল টমেটোর বাজার মূল্য না পাওয়ায় কৃষক নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বিষয়টি বিবেচনা করে পঞ্চগড়, দিনাজপুর এবং রংপুর জেলার টমেটো সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ২০-২৫ টন ধারণক্ষমতার সংরক্ষণাগার নির্মাণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এতে কৃষক টমেটো সংরক্ষণ করে সময়মতো বাজারমূল্য পাবেন। এখানে টমেটোর কথা বলা হলেও বছরের অন্য সময় আম, কাঁচা মরিচ, লেবু, গাজরসহ ওই এলাকায় যেসব সবজি ও ফল বেশি হয় সেগুলোও যদি একই প্রকৃতির হয়, অবশ্যই কৃষক সেগুলো সংরক্ষণ করতে পারবেন।’