পদ্মা ও মেঘনাতীরবর্তী চাঁদপুরে ২০১০ সালের এক জনসভায় শহরটিতে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৮ সালে মেডিকেল কলেজটি সরকারি অনুমোদন পায়। ২০১৯ সাল থেকে চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে অস্থায়ীভাবে একাডেমিক কার্যক্রম চালাচ্ছে চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ। অবশেষে প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং নার্সি কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাস পেতে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। তবে কলেজ স্থাপনের প্রস্তাবিত স্থানে বন্যা, নদীভাঙন এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি রয়েছে বলা হয়েছে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায়। এমনকি পরিবেশের ওপর প্রভাব বিবেচনায় প্রকল্পটিকে ‘লাল’ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্রমতে, চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ। প্রকল্পটি আজ একনেক সভায় উত্থাপন করার কথা রয়েছে। ১ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫ থেকে ৩৩টি অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ৩০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য রাখা হয়েছে ১৪৬ কোটি টাকা।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দেখা গেছে, মেডিকেল কলেজটি স্থাপন করা হবে চাঁদপুর শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ডাকাতিয়া নদীতীরবর্তী গাছতলা নামক স্থানে। চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কের পাশের স্থানটিতে তেমন কোনো জনবসতি নেই। এলাকাটিকে বন্যাপ্রবণ নিম্নাঞ্চল বলা হয় সম্ভাব্যতা সমীক্ষায়। ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৪ সালের বন্যায় এখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তাছাড়া স্থানটিতে নদীভাঙন এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি রয়েছে। মহাসড়কের পাশে হওয়ায় রয়েছে উচ্চশব্দের ঝুঁকি। সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনাও বাড়তে পারে।
সার্বিক পরিবেশগত দিক বিবেচনায় প্রকল্পটিকে ‘লাল’ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যেখানে কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পকে কমলা ও সবুজ তালিকায় রাখা হয়। আর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়া হয়নি। যদিও শর্তসাপেক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনাপত্তিপত্র নেয়ার কথা বলা হয়েছে ডিপিপিতে। এর আগে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির বৈঠকেও পরিবেশ ছাড়পত্র নেয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে পরিবেশবিদ ড. আহমদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ লাল তালিকায় থাকা প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের বাধ্যবাধকতা থাকতে হয়। সেটি না থাকলে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী অবস্থানগত ছাড়পত্র দেয়া হয় না। ফলে নির্মাণ করা শুরু করা যাবে না।’
আর মহাসড়কের পাশে শব্দ দূষণ থাকায় নীরব এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ করার পরামর্শ দেন তিনি। তবে একান্ত বাধ্য হলে শব্দ দূষণ প্রতিরোধে যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে রোগী ও ডাক্তারদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা প্রকাশ করেন এ অধ্যাপক।
প্রকল্পটির বিষয়ে বাস্তবায়নকারী সংস্থা স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব বলেন, ‘প্রকল্পটি নিয়ে তিনবার মূল্যায়ন কমিটির বৈঠক হয়েছে। অনেক সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে। চূড়ান্ত পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরে টাকাও জমা দেয়া হয়েছে।’ মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু ইস্যু থাকায় লাল তালিকাভুক্ত থাকলেও একনেক সভায় উত্থাপন করা হলে মন্ত্রীরা বিষয়টি (ইতিবাচকভাবে) দেখবেন বলে জানান তিনি।
তবে ঝুঁকি প্রশমনে করণীয় নিয়ে বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলছে।
এদিকে পরিকল্পনা কমিশনের স্বাস্থ্য উইংয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রকল্পে ধরন ও প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়েই লাল তালিকাভুক্ত করা হয়। সে অনুযায়ী প্রকল্পটি প্রক্রিয়াকরণ হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে চাননি তিনি।
স্থায়ী ক্যাম্পাস ছাড়া অসুবিধার মধ্য দিয়েই একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হচ্ছে বলে জানান চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ডা. মো. হারুন আর-রশীদ। তিনি বলেন, ‘আপাতত যতটুকু সেবা দেয়া সম্ভব আমরা সেভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছি। কিন্তু স্থায়ী ক্যাম্পাসের দায়িত্ব কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।’
ক্যাম্পাসের স্থানটির ঝুঁকির বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। যদিও স্থানটি নদীর একদম কাছে নয় বলে দাবি করছেন কলেজের হিসাব কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির সরকার।