অনিয়ম-দুর্নীতি কমানো, শৃঙ্খলা ফেরানো এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চলতি বছরের শুরুতে ১৩ সদস্যের বোর্ড গঠন করা হয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক)। কিন্তু আট মাস পেরিয়ে গেলেও সেই বোর্ড কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতি দুই মাসে অন্তত একটি সভা হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত হয়েছে মাত্র দুটি। এছাড়া অভ্যন্তরীণ অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে বোর্ডের সুপারিশও আমলে নিচ্ছে না রাজউক। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও বোর্ডকে পাশ কাটানোর অভিযোগ তুলেছেন সদস্যরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কাঠামো চালু হলেও কার্যত পুরনো পদ্ধতিতেই চলছে রাজউক; শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি ফেরানোর উদ্যোগও প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।
রাজউক অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর ১৫ ধারা অনুযায়ী গত ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখে গঠিত হয়েছিল রাজউক বোর্ড। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীকে সভাপতি, একই মন্ত্রণালয়ে সচিবকে সহসভাপতি ও রাজউক চেয়ারম্যানকে সদস্য সচিব করে মোট ১৩ সদস্যের বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের অন্য সদস্য হলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার, ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. ইশরাত ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য প্রকৌশলী আলমগীর হাছিন আহমেদ ও বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের (আইএবি) সভাপতি ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ। এছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকার কর্তৃক মনোনীত রাজধানীর বাইরে থেকে নির্বাচিত দুজন সংসদ সদস্য ও সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধিও থাকবেন সদস্য হিসেবে।
রাজউক বোর্ড গঠনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, রাজউক অধ্যাদেশের অধীনে প্রণীত কৌশলগত পরিকল্পনা, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা এবং সব ধরনের প্রকল্প ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নীতিনির্দেশনা প্রণয়ন করবে বোর্ড। এসব পরিকল্পনা ও প্রকল্পে কোনো সংশোধনের প্রয়োজন হলে সে বিষয়েও সুপারিশ করবে তারা। এছাড়া সংরক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণা, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রণয়ন, রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো মূল্যায়ন এবং সরকারের অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা, রাজউকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দেশিকা প্রণয়ন, বার্ষিক প্রতিবেদন, বাজেট ও সম্পূরক বাজেট মূল্যায়ন এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন মূল্যায়ন ও অনুমোদনের দায়িত্বও বোর্ডের। একই সঙ্গে বোর্ড সভার কার্যপদ্ধতিও নির্ধারণ করবে তারা। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রতি দুই মাসে অন্তত একটি বোর্ডসভা আয়োজন করতে হবে এবং সভার কার্যবিবরণী রাজউকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।
রাজউক বোর্ডের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অনেক কার্যক্রমই বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও বোর্ডকে পাশ কাটানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও রাজউক বোর্ডের সদস্য ড. আকতার মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজউক বোর্ড সেভাবে কার্যকর হচ্ছে না। ফেব্রুয়ারিতে বোর্ড গঠনের পর আট মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি সভা হয়েছে। সেসব সভাতেও তেমন কার্যকর আলোচনা হয়নি। এমনকি সভার কার্যবিবরণীও আমরা এখনো পাইনি। কথা ছিল, ভবনের নকশা ও প্রকল্প অনুমোদন, রাজউকের চলমান সমস্যা ও তার সমাধান এবং ড্যাপ কীভাবে কার্যকর করা হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত দেবে বোর্ড। রাজউক সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই হচ্ছে না। বোর্ডসভা আয়োজনের ক্ষেত্রেও রাজউকের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘এটা আসলে কাগজে-কলমে গঠিত একটি বোর্ড। সবকিছু আগের মতোই চলছে। রাজউক কী করছে, কীভাবে করছে বা কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—কিছুই আমাদের জানানো হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে শহরের ক্ষতি আরো বাড়বে। একই সঙ্গে যে উদ্দেশ্যে বোর্ড গঠন করা হয়েছিল, সেটিও পূরণ হবে না।’
রাজউক বোর্ডের আরেক সদস্য বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. আবু সাঈদ এম আহমেদও বোর্ড পরিচালনায় রাজউকের অনীহার অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি সভা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী অন্তত দুই মাসে একটি সভা হওয়ার কথা, প্রয়োজনে এর চেয়েও বেশি হতে পারে। কিন্তু এখন তো সভাই হচ্ছে না। রাজউকের কোনো সিদ্ধান্ত বা কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে আমরা জানতে পারছি না। সর্বশেষ সভায় আমি বলেছি, অন্তত যেসব ভবনের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে, সেগুলো যেন আমাদের জানানো হয় বা আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেটাও করা হচ্ছে না।’
অনুষ্ঠিত দুটি বোর্ডসভার অভিজ্ঞতাও ভালো নয় জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘বোর্ডসভায় সদস্যদের বাইরে ১০-১৫ জন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকেন। তাদের না থাকলেও সভা আরো সুন্দরভাবে পরিচালিত হতে পারে। এ ধরনের অপেশাদার আচরণ কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের বোর্ডসভায় হওয়া উচিত নয়।’
আট মাসে মাত্র দুটি সভা হয়েছে। তাতেও কার্যকর আলোচনা হয়নি। সভার কার্যবিবরণীও পাইনি। কথা ছিল ভবনের নকশা ও প্রকল্প অনুমোদন, রাজউকের সমস্যার সমাধান এবং ড্যাপ কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত দেবে বোর্ড, রাজউক সে অনুযায়ী কাজ করবে। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না —ড. আকতার মাহমুদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও বোর্ড সদস্য, রাজউক
বোর্ড সদস্যরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রাজউককে বের করে আনতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পুরোপুরি অনলাইনে নেয়ার সুপারিশ করেছিলেন তারা। তবে গত আট মাসেও সে সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি সংস্থাটি। তাদের অভিযোগ, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে প্রয়োজনীয় আগ্রহের অভাবেই পুরো ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা হচ্ছে না। ফলে অবৈধ অর্থ লেনদেনের সুযোগও এখনো রয়ে গেছে।
রাজউক বোর্ড গঠনকে ‘মন্দের ভালো’ বললেও এটি কার্যকর না হলে ঢাকার জন্য কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না বলে মনে করেন ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজউক বোর্ড গঠন হয়েছে, এটা মন্দের ভালো। তবে বোর্ডে এখনো আমলাতান্ত্রিক প্রাধান্যই বেশি। কয়েকজন পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি জায়গা পেয়েছেন। বর্তমান কাঠামোতেই যদি বোর্ড কার্যকরভাবে কাজ করত, তাহলে শহরের জন্য ইতিবাচক কিছু আশা করা যেত।’
তিনি আরো বলেন, ‘রাজউকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বোর্ডের মাধ্যমেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমলারা জানেন কীভাবে বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে বড় প্রকল্প ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করাতে হয়। ফলে রাজউকও সেভাবেই চলছে। আবার বোর্ডে আমলাদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা অনেক সময় ওপরের চাপের মধ্যেও থাকেন। তাই আমলাতান্ত্রিক প্রাধান্য কমিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বোর্ড গঠন না হলে রাজউকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে।’
আমরা চেষ্টা করব প্রতি দুই মাসে একটি করে সভা করতে। নতুন কোনো প্রকল্প বা নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে বোর্ডের অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তবে রাজউকের নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বোর্ডকে জানানোর প্রয়োজন নেই। এটি মূলত একটি নীতিনির্ধারণী বোর্ড —মো. রিয়াজুল ইসলাম , চেয়ারম্যান, রাজউক
বোর্ড সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদদের এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নন রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খুব দ্রুতই বোর্ডসভা হবে। আমরা চেষ্টা করব প্রতি দুই মাসে একটি করে সভা আয়োজন করতে।’ বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজউক নতুন কোনো প্রকল্প বা নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে বোর্ডের অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে রাজউকের নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বোর্ডকে জানানোর প্রয়োজন নেই। এটি মূলত একটি নীতিনির্ধারণী বোর্ড।’