যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে তুলনা করলে অনুপাতটি চলনসই। কিন্তু বাংলাদেশে এ স্থায়ী মূলধনের বড় অংশই অনুৎপাদনশীল কিংবা অপব্যয় হয়েছে। অর্থনীতিতে এ স্থায়ী বিনিয়োগের বড় অংশ কোনো ভূমিকা রাখছে না। এর মধ্যে সরকারি বিনিয়োগ বা অবকাঠামো যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বেসরকারি উদ্যোগও।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশের গ্রস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফরমেশনের (জিএফসিএফ) আকার ছিল ১৩৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। জিএফসিএফ বা মোট স্থায়ী মূলধন গঠন হলো জাতীয় পরিসরে নিট বিনিয়োগের ধারণা, যা সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে অ-আর্থিক সম্পদে ব্যয় পরিমাপ করে। মোটা দাগে কোনো দেশে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যেসব সম্পদ (অবকাঠামো, ভবন ও যন্ত্রপাতি) নতুন করে তৈরি বা কেনা হয়, তার মোট মূল্যই হলো গ্রস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফরমেশন। এর হিসাবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের (অবকাঠামো, মেগা প্রকল্প) পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও বিদেশী বিনিয়োগকেও (এফডিআই) আমলে নেয়া হয়। এ ধরনের বিনিয়োগ অর্থনীতিতে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করে। সৃষ্টি করে কর্মসংস্থান, ত্বরান্বিত করে শিল্পায়ন ও উন্নয়ন ঘটায় অবকাঠামো খাতের।
বাংলাদেশে এ স্থায়ী মূলধনের কত শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ দেশে বিপুল বিনিয়োগে গড়ে ওঠা মেগা প্রকল্প অলস পড়ে থাকার ঘটনা দেখা যায়। অস্বাভাবিক ব্যয়ে গড়ে তোলা অনেক মেগা প্রকল্পের আয়ে পরিচালন ব্যয়ও মেটানো যাচ্ছে না। আবার বেসরকারি খাতের অনেক বৃহৎ শিল্পেও সক্ষমতার অর্ধেক অব্যবহৃত পড়ে আছে। কিছু শিল্প-কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। সম্পদ না হয়ে অনেক শিল্প-কারখানা দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগকারীরা বলছেন, সরকারি অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের দেশ। এখানে সর্বোচ্চ ব্যয়েও নিম্নমানের অবকাঠামো তৈরি হয়। আবার তৈরীকৃত অনেক অবকাঠামো অর্থনীতিতে কোনো উৎপাদনশীলতা সৃষ্টি না করেই অলস পড়ে থাকে। এ কারণে মোট মূলধনের আকার জিডিপির ৩০ শতাংশের বেশি হলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সেগুলো যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারছে না। এজন্য অনিয়ম-দুর্নীতি ও অদক্ষতাকে দায়ী করছেন তারা।
সরকারি বিনিয়োগে অনুৎপাদনশীল সম্পদ সৃষ্টির উদাহরণ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মোরিং (এসপিএম) প্রকল্পকে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। গভীর সাগরে নোঙর ফেলা জ্বালানি তেলবাহী বড় জাহাজ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাসের জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের আমলে প্রকল্পটি নেয়া হয়েছিল। এ প্রকল্পে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে শুরু করা পাইপলাইন ও অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে দুই বছর আগে। কিন্তু জ্বালানি তেলের এ মহাসংকটের সময়েও সেটিকে কাজে লাগানো যায়নি। বরং বিপুল ব্যয়ের এ প্রকল্পটি এখনো অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে।
সম্পদ সৃষ্টির পরও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার আরো বড় উদাহরণ হলো ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ টার্মিনালের উদ্বোধন হয়েছে ২০২৩ সালের অক্টোবরে। যদিও এখন পর্যন্ত টার্মিনালটি অর্থনৈতিক কোনো উৎপাদনশীলতা তৈরি করতে পারেনি। প্রায় তিন বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে জাপানের ঋণে তৈরি করা মেগা প্রকল্পটি।
কেবল বৃহৎ এ দুটি প্রকল্পই নয়, গত দেড় দশকে সরকারি উদ্যোগে নির্মিত অনেক অবকাঠামোই বসে আছে, আবার কিছু চালু হলেও সম্পদ না হয়ে বোঝায় রূপান্তরিত হয়েছে। যেমন ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম সুড়ঙ্গপথ বা টানেল। এ টানেল নির্মাণে চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০২৩ সালে উদ্বোধন হওয়া এ প্রকল্প প্রথম দিন থেকেই লোকসানি। টানেলটির আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয়ই তোলা যাচ্ছে না। বরং প্রতিদিন টানেলটিতে সরকারের লোকসান হচ্ছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
উদ্বোধন হলেও রাজধানীবাসীর কাজে আসছে না ঢাকা ওয়াসার উদ্যোগে নির্মিত দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার। ৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পে রাজধানীর উল্লেখযোগ্য অংশের পয়োবর্জ্য পরিশোধন হওয়ার কথা। কিন্তু ২০২৩ সালে উদ্বোধন হওয়া এ প্রকল্পে নির্ধারিত এলাকা থেকে পয়োবর্জ্য শোধনাগারে পৌঁছার পাইপলাইনই (নেটওয়ার্ক) তৈরি করা হয়নি।
দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। যদিও পিক আওয়ারে চাহিদা সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো। বিদ্যুৎ খাতের বড় সক্ষমতা অলস পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে এ বছর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট চালু হলে তেলভিত্তিক অনেকগুলো বিদ্যুৎ কেন্দ্র অলস হয়ে যাবে। ফলে বিদ্যুৎ খাতের বিপুল বিনিয়োগের অনেক পাওয়ার প্লান্ট অর্থনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখছে না।
সরকারি বিনিয়োগে গড়ে ওঠা অনেক অবকাঠামোকে ‘অ্যাসেট’ বা সম্পদ বলার মতো কোনো বাস্তবতা নেই বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক এ মুখ্য অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা সম্পদ বলতে সেটিকে বুঝি, যার উৎপাদনশীলতা আছে, অর্থনৈতিক মূল্য আছে। এখন যদি কর্ণফুলী টানেলকে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা হয়, তাহলে সেটির শেয়ার কে কিনবে? যে সম্পদ তার পরিচালন ব্যয়েরই সংস্থান করতে পারে না, সেটিকে সম্পদ বলা যায় না। সরকারি অর্থায়নে গড়ে ওঠা অনেক অবকাঠামোর অবস্থাই একই।’
তবে বেসরকারি বিনিয়োগকে একই পাল্লায় সরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না বলে মনে করেন ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি অর্থায়নে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে না পারার কারণ ভিন্ন হতে পারে। কোনো কারখানা যদি গ্যাসের সংকটে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেটির জন্য উদ্যোক্তাকে দায়ী করা যায় না। আবার গ্যাস পাওয়া যাবে না, এটি জেনেও কেউ কারখানা গড়ে তুললে বুঝতে হবে, তার উদ্দেশ্য ভিন্ন।’
বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত দুই যুগে দেশের জিডিপির আকার ও গ্রস ক্যাপিটাল ফরমেশন বা মোট মূলধনের আকার বহু গুণ বেড়েছে। তবে এ সময়ে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকারের ঋণও বেড়েছে বহু গুণ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল মাত্র ৬১ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির এ আকার ৪৫৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এ সময়ে বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ ও এ খাতে ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি কয়েক গুণ বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি শতাব্দীর শুরুতে তথা ২০০০ সালে বাংলাদেশের গ্রস ক্যাপিটাল ফরমেশন ছিল মাত্র ১২ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। পাঁচ বছর পর ২০০৫ সালে এর আকার বেড়ে ১৭ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এরপর ২০১০ সালে ৩০ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ও ২০১৫ সালে ৫৬ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারে ঠেকে। আর ২০২০ সালে এসে মোট মূলধনের আকার বেড়ে ১১৭ দশমিক শূন্য ৯ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে গ্রস ক্যাপিটাল ফরমেশনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে।
কেবল বিশ্বব্যাংকের এ পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে মনে হবে, দেশের মোট স্থায়ী মূলধন গঠনের আকার গত দুই যুগে প্রায় ১১ গুণ বেড়েছে। তবে অর্থনীতিতে এ সময়ে যে অনুৎপাদনশীল অনেক সম্পদও তৈরি হয়েছে, তা এ হিসাব থেকে বোঝা যাবে না। সরকারি খাতের পাশাপাশি এ সময়ে বেসরকারি খাতও অনেক অনুৎপাদনশীল সম্পদ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) তথ্যানুসারে, বর্তমানে দেশে মোট সিমেন্ট উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে ৮ কোটি টন। এর মধ্যে কেবল ৪ কোটি টনের কাছাকাছি বা ৪৮ শতাংশ সক্ষমতা কাজে লাগছে। অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে ৫২ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা।
সিমেন্টের চেয়েও উৎপাদন সক্ষমতা বেশি অব্যবহৃত পড়ে আছে স্টিল খাতে। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে ১ কোটি ৩০ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টন স্টিল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। যদিও এর মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার হচ্ছে।
কেবল সিমেন্ট বা স্টিল খাতই নয়, বরং ভারী ও মাঝারি শিল্পের অনেক খাতেরই উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ এখন অনুৎপাদনশীল। এর মধ্যে সিরামিক ও কাচ শিল্পের অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠান বন্ধই হয়ে গেছে। বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের বহু কারখানা বন্ধ। আর যে কারখানাগুলো সচল রয়েছে, সেগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। চলতি অর্থবছরে দেশের রফতানি খাত নেতিবাচক ধারায় চলছে। ক্রয়াদেশ না থাকায় দেশের শীর্ষ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ২০-৪০ শতাংশ অলস বসে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দেশের সমুদ্রগামী জাহাজ ও এলপিজি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ইস্ট কোস্ট গ্রুপ। এ গ্রুপটির চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার বাছবিচার ছাড়াই এলপিজি খাতে ৫২টি কোম্পানির লাইসেন্স দিয়েছিল। কিন্তু এ কোম্পানিগুলোর মধ্যে মাত্র ১৪-১৫টির এখন কার্যক্রম আছে। বাকিগুলো অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এলপিজি খাতে সাত-আটটি কোম্পানি টিকতে পারে। অথচ লাইসেন্স পাওয়া সব কোম্পানিই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। এখন কোম্পানি বন্ধ আর ব্যাংকের ঋণ খেলাপি।’
আজম জে চৌধুরী আরো বলেন, ‘সম্ভাবতা যাচাই ছাড়াই আমাদের অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসায় নেমেছেন, কারখানা বানিয়েছেন। আর ব্যাংকগুলোও বাছবিচার ছাড়াই সেগুলোতে ঋণ দিয়েছে। এখন ব্যাংক ও উদ্যোক্তা—উভয়ই বিপদে আছে। সিরামিক খাতের ৬০ শতাংশ কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে গ্লাস উৎপাদনে অনেক কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু চায়না গ্লাসের সঙ্গে দামে ও মানে টিকতে পারছে না। রড-সিমেন্ট কোম্পানির অবস্থাও একই। ভালো কোম্পানিগুলোরও উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেক বসে আছে।’
কয়েক বছর ধরেই দেশের অর্থনীতি নানা সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান সংকট হলো জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বিপরীতে একই অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির গড় হার ছিল দুই অংকের ঘরে। সর্বশেষ মার্চেও দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধির হার নেতিবাচক। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। একই সময়ে আমদানি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ শতাংশের নিচে। অর্থনীতিতে ইতিবাচক রয়েছে কেবল রেমিট্যান্স প্রবাহ। এখন পর্যন্ত এ খাতে প্রায় ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির সবক’টি সূচকের মধ্যে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধিই এখন সবচেয়ে বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির এ হার দ্বিগুণের বেশি তথা ৩৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। যেখানে একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ ছিল।
দেশে জিডিপির আকার কিংবা গ্রস ক্যাপিটাল ফরমেশনের চেয়েও গত দুই যুগে সরকারের ঋণ বেশি বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকারের নেয়া ঋণের স্থিতি প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা। অথচ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখনো সরকারের ঋণ স্থিতি মাত্র ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা ছিল। কেবল আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলেই সরকারের ঋণ স্থিতি সাড়ে ১৫ লাখ কোটি টাকার বেশি বেড়েছে। বর্তমানে কেবল বিদেশী উৎস থেকে দেশের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলার।
বেসরকারি খাতের ভঙ্গুরতার প্রভাবে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার অস্বাভাবিক পর্যায়ে ঠেকেছে। এক্ষেত্রে ২০০৮ সাল-পরবর্তী দেড় দশকে ব্যাংকগুলোতে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের প্রভাবও রয়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৩০ শতাংশ। অবশ্য এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা। ওই সময় খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় ৩৬ শতাংশ। বছরের শেষ তিন মাসে ব্যাংকগুলো পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমাতে পেরেছে।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে দেশের ভারী শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির ফাঁদ বিষয়ে বেসরকারি খাতের ওয়ান ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহিত রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনেকে ফিজিবিলিটি স্টাডি করেননি। এ কারণে অনেক ব্যাংকের পাশাপাশি উদ্যোক্তারা বিপদে পড়েছেন। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে সংগতি রেখে ভারী শিল্পের উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছেন। এখন দেখা যাচ্ছে সরকার তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কমিয়ে দিয়েছে। তাহলে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার কীভাবে হবে?’
মুহিত রহমান আরো বলেন, ‘আমাদের ডেটা বা তথ্য-উপাত্তের ক্ষেত্রেও অনেক ভুল রয়েছে। বিবিএসসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আমরা যে ডেটা পাই, সেটি প্রকৃত চিত্র নয়। এখন সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে কোনো ব্যাংক বা উদ্যোক্তা যদি বিনিয়োগ করে, এরপর যদি বিপদে পড়ে, সেটির দায়ভারও তো কেবল বিপদগ্রস্তদের ওপর চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয়।’