রাবনাবাদ চ্যানেল ড্রেজিংয়ে উজানের নদীতে বাড়ছে ডুবোচর পথ হারাচ্ছে ইলিশ

বাধাগ্রস্ত বিচরণ ও প্রজনন

রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্য ধরে রাখতে ২০২২-২৪ সময়ে পরিচালিত ড্রেজিংয়ের পর সেখানে দ্রুত পলি জমার বিষয়টিও একটি গবেষণায় উঠে এসেছে।

নোনা জলের ইলিশ ডিম ছাড়তে নদীর স্রোত ঠেলে উজানে মিঠা পানিতে উঠে আসে। প্রজনন শেষে আবার নদী বেয়ে ফিরে যায় সাগরে। এ দীর্ঘ পরিযায়ী যাত্রার পথের কোথাও নাব্য কমে গেলে কিংবা ডুবোচর তৈরি হলে বাধাগ্রস্ত হয় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল। গবেষকরা বলছেন, পায়রা বন্দরকেন্দ্রিক রাবনাবাদ চ্যানেল ড্রেজিংয়ের পর উজানের কয়েকটি নদ-নদীতে পলি সঞ্চয় ও ডুবোচর বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে ইলিশের পথ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি প্রজনন ও পোনার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইলিশের জন্য নদী ও সাগরের মধ্যে অবাধ সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তলদেশের প্রকৃতি, পানির প্রবাহ, তাপমাত্রা ও পানির গুণগত মানে পরিবর্তন এ মাছের বিচরণ ও প্রজননকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে নদীর নাব্য কমে ডুবোচর তৈরি হলে সাগর থেকে নদীর প্রজনন ক্ষেত্রে ওঠার পথ সংকুচিত হয়ে যায়।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যেও ইলিশ উৎপাদনে সাম্প্রতিক নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টন ইলিশ উৎপাদন হয় দেশে। তবে এরপর টানা দুই অর্থবছর উৎপাদন কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে। পরের অর্থবছরে আরো ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমে তা ৫ লাখ ২৮৮ টনে নেমে আসে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো প্রকাশ হয়নি। তবে মৎস্য অধিদপ্তরের একটি সূত্রের ধারণা, ওই অর্থবছরে ইলিশ আহরণ পাঁচ লাখ টনের নিচে নেমে গেছে।

ইলিশের এ নিম্নমুখী প্রবণতার সঙ্গে নদীর নাব্য ও পরিযায়ী পথের পরিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। ইলিশ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ড. আনিছুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এর আগে ইলিশ আহরণ কখনো এতটা কমেনি, মানে পরপর তিন বছর কমেনি। বরাবর বেড়ে আসছিল, বাজারঘাটেও আমরা সেটার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছিলাম। বাজারে এখন বড় ইলিশ খুব কম। বড় ইলিশের চেয়ে মাঝারি আকার বা ছোট আকারেরই বেশি। ইলিশ নিয়ে আমি ৩৫ বছর গবেষণা করছি। এভাবে এতটা চিন্তা হয়নি কখনো।’

ডুবোচর তৈরির প্রভাব ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘পানিপ্রবাহ কমে গেলে সিল্টেশন বেড়ে গিয়ে চর-ডুবোচর তৈরি হয়। ডুবোচর হওয়া মানে মাইগ্রেটরি রুট (পরিযায়ী পথ) নষ্ট হওয়া। সাগরের মোহনা থেকে ইলিশ প্রধান নদ-নদীগুলোয় আসার পথে সে জায়গায় বিশালভাবে বাধা পায়। এ ঘটনাটা কয়েক বছর ধরেই কমবেশি চলে আসছে। এটি ক্রমেই বাড়ছে।’

পায়রা বন্দরকেন্দ্রিক রাবনাবাদ চ্যানেল ড্রেজিংয়ের কারণে পানির প্রবাহ পরিবর্তন এক্ষেত্রে বড় প্রভাবক বলে মনে করেন এ গবেষক। ড. আনিছুর রহমান বলেন, ‘রাবনাবাদ, আড়িয়াল খাঁ, হিজলা, মেঘনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীগুলো মূলত মেঘনা হয়ে সাগরের সঙ্গে যুক্ত। এসব নদী-উপনদী ও শাখা নদী ইলিশের পরিযায়ী চলাচলের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিভিন্ন স্থাপনা ও নৌপথের পরিবর্তনের কারণে পানির গুণগত মান ও তাপমাত্রায় পরিবর্তন হলে ইলিশের খাদ্যপ্রাপ্যতা, বিচরণ ও প্রজননেও প্রভাব পড়তে পারে।’

রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্য ধরে রাখতে ২০২২-২৪ সময়ে পরিচালিত ড্রেজিংয়ের পর সেখানে দ্রুত পলি জমার বিষয়টিও একটি গবেষণায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশ মেরিটাইম জার্নালে চলতি বছর প্রকাশিত ‘পায়রা পোর্ট: চ্যালেঞ্জেস অব সেডিমেন্টেশন অ্যান্ড দ্য ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক গবেষণায় রাবনাবাদ-সংলগ্ন চ্যানেলে ড্রেজিংয়ের পর পলি সঞ্চয় এবং দীর্ঘমেয়াদে নাব্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, নদীর একটি অংশ গভীর করে দিলে শুধু ওই অংশের তলদেশই বদলায় না; পরিবর্তিত হতে পারে পানির প্রবাহ, জোয়ার-ভাটার গতি এবং পানির সঙ্গে ভেসে চলা পলির স্বাভাবিক গতিপথও।

চীনের ইয়াংজি নদীর মোহনা নিয়ে ২০২৫ সালের একটি গবেষণায়ও চ্যানেল গভীর করার ফলে তলদেশ ঘেঁষা ভূমিমুখী পানির প্রবাহ শক্তিশালী হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে সমুদ্র থেকে নদীর ভেতরে পলি প্রবেশের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি পরিবর্তিত চ্যানেল আকৃতির কারণে পলি আটকে রাখার প্রবণতাও বাড়তে পারে বলে গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়। তবে ইয়াংজির এ গবেষণার ফলাফল রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য কিনা, তা নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

নদীর নাব্য কমে যাওয়া ও ডুবোচর তৈরির বিষয়টি রাবনাবাদ চ্যানেল ড্রেজিংয়ের প্রভাব বলে মনে করেন ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’-এর সাবেক পরিচালক (পিডি) মোল্লা এমদাদুল্যাহ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নদীতে পানি নেই। মাছ কীভাবে আসবে? মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীতেই আড়াইশর বেশি চর তৈরি হয়েছে। সাগর থেকে নদীতে আসা কিংবা নদী থেকে সাগরে ফিরে যাওয়ার পথে বাধা তৈরি হয়েছে। ফলে ইলিশ ডিম ছাড়ার মৌসুমে নদীতে আসতে পারছে না।’

মোল্লা এমদাদুল্যাহ আরো বলেন, ‘ইলিশের মাইগ্রেশনের পথ, প্রজনন ক্ষেত্র ও নার্সারি গ্রাউন্ড নষ্ট হচ্ছে। দূষণ বেড়েছে। ডুবোচরের কারণে বাচ্চা ইলিশ সাগরে যেতে পারছে না। আর সাগরে যেতে না পারলে ইলিশের বৃদ্ধি কমে যায়।’

শুধু নাব্য সংকটই নয়, দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়ন ও দূষণও ইলিশের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। ইলিশ অতি সংবেদনশীল প্রজাতি হওয়ায় পানির তাপমাত্রা ও গুণগত মানের পরিবর্তন এর প্রজননে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে একদিকে নদীর তলদেশে পলি জমে চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া, অন্যদিকে দূষণ ও পানির গুণগত পরিবর্তন—দুই ধরনের চাপই ইলিশের প্রজনন ও বিচরণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এ অবস্থায় রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্যতা রক্ষায় ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি উজান ও ভাটির নদ-নদীতে এর প্রভাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি নৌপথ গভীর রাখলেই হবে না; ইলিশের পুরো পরিযায়ী পথ, নদীর প্রবাহ, পলি সঞ্চয়, পানির গুণগত মান ও প্রজনন ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ইয়ামিন হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নাব্য কমায় প্রজনন মৌসুমে নদ-নদীগুলোতে একেবারেই স্রোত থাকে না। ফলে সাগর থেকে নদীতে চলাচলের পথে বাধা তৈরি হয়।’

ইলিশ গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালীর রাবনাবাদ, আন্ধারমানিক ও তিয়াখালী নদী সমুদ্র থেকে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে বিভিন্ন পরিযায়ী মাছের চলাচলের সঙ্গে যুক্ত। পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত মূল্যায়নেও রাবনাবাদ ও তিয়াখালীকে ইলিশের সমুদ্র ও নদীর মধ্যে চলাচলের পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

আরও