বন বিভাগের বাধা উপেক্ষা

সংরক্ষিত বনে পাকা রাস্তা নির্মাণ করছে এলজিইডি

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে পাকা রাস্তা নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বন বিভাগের অনুমোদন না থাকায় কাজ বন্ধ রাখতে স্থানীয় বন বিভাগের পক্ষ থেকে এলজিইডিকে কয়েক দফা চিঠি দেয়া হয়েছে। সংরক্ষিত বনের ভেতরে পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হলে বনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে পাকা রাস্তা নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বন বিভাগের অনুমোদন না থাকায় কাজ বন্ধ রাখতে স্থানীয় বন বিভাগের পক্ষ থেকে এলজিইডিকে কয়েক দফা চিঠি দেয়া হয়েছে। সংরক্ষিত বনের ভেতরে পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হলে বনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়া রাস্তা পাকাকরণ কাজ বন্ধ রাখতে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিস পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। তবু সবকিছু উপেক্ষা করেই রাস্তার নির্মাণকাজ চলছে।

এলজিইডি ও বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, লাঠিটিলা এলাকায় লাঠিছড়া থেকে লালছড়া হয়ে রূপাছড়া পর্যন্ত কাঁচা রাস্তার শুরু থেকে এক কিলোমিটার পাকাকরণের জন্য এলজিইডি দরপত্র আহ্বান করে। প্রায় ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্যারাডাইস কনস্ট্রাকশন নামে স্থানীয় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পায়। কার্যাদেশে ২ এপ্রিল থেকে কাজ শুরু করতে বলা হয়। চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা সম্পন্ন হওয়ার কথা। প্রতিষ্ঠানটি ২১ এপ্রিল এক্সক্যাভেটর দিয়ে মাটি কাটার কাজ শুরু করেছে। বিষয়টি জানতে পেরে বন বিভাগের স্থানীয় লাঠিটিলা বিটের ফরেস্টার মো. সালাহ উদ্দিন এলজিইডির উপজেলা কার্যালয়ের প্রকৌশলীর কাছে একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে রাস্তাটির কাজের দরপত্র আহ্বানের আগে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো পরামর্শ বা অনুমতি নেয়া হয়নি উল্লেখ করে সংরক্ষিত বন এলাকায় কোনো ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন না করার বিষয়ে অনুরোধ জানানো হয়। অনতিবিলম্বে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, লাঠিটিলা এলাকার পুরনো সেগুন বাগানের ভেতরে কাঁচা রাস্তা পাকাকরণের জন্য এক্সক্যাভেটর দিয়ে মাটি কাটার কাজ শেষ করে বর্তমানে বালি ফেলা হচ্ছে। এছাড়া মেশিন দিয়ে ভাঙা হচ্ছে স্তূপ করে রাখা ইট।

স্থানীয়রা জানান, লাঠিটিলা এলাকায় লালছড়া ও রূপাছড়া পুরো এলাকাটি সংরক্ষিত বন। কমলা লেবু, সাতকড়াসহ বিভিন্ন লেবুজাতীয় ফলের জন্য খ্যাতি রয়েছে এ এলাকার। এ জায়গা দিয়ে যাতায়াতের জন্য রাস্তাটির পাকাকরণ শুরু করেছে এলজিইডি।

বন বিভাগ জানায়, বনভূমির মধ্যে যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণসংক্রান্ত বিষয়ে ২০১৮ সালের ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সভায় বলা হয়, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বনভূমির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে, প্রজননক্ষেত্র হ্রাস পাচ্ছে। তাই বনভূমির মধ্যে যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে বন বিভাগের মাধ্যমে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নিতে হবে।

লাঠিটিলা বিটের বিট কর্মকর্তা মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, বন বিভাগের অনুমতি বা পরামর্শ ছাড়া রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। আমরা চিঠি দিয়ে আপত্তি জানিয়েছি, তারা তা মানেননি। বর্তমানে কাজের গতি বাড়িয়ে সেটি দ্রুত সম্পন্ন করা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেছি।

এদিকে রাস্তা পাকাকরণের কাজ বন্ধ রাখতে গত ২৭ এপ্রিল বেলা আইনি নোটিস পাঠিয়েছে। বেলার সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ সাহেদা স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, লাঠিটিলা বন পাথারিয়া হিল রিজার্ভ ফরেস্টের একটি অংশ। প্রাকৃতিক মিশ্র চিরসবুজ এ বনের আয়তন ৫ হাজার ৬৩১ একর। ১৯২০ সালের ২১ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন জারি করে এ বনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০৯ প্রজাতির প্রাণী ও ৬০৩ ধরনের উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে এ বনাঞ্চলে। এটি পরিবেশগতভাবে অরক্ষিত ইন্দো-বার্মা জীববৈচিত্র্য হটস্পটের অংশ এবং দেশের ছয়টি আন্তঃসীমান্ত সংরক্ষিত বনের একটি।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, সংরক্ষিত বনে এ ধরনের রাস্তা নির্মাণ করা হলে বনের পুরনো গাছগুলো রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। বনের ভেতর দিয়ে যানবাহন চলাচলের কারণে বন্যপ্রাণী মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট এবং বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ বনের মূল্যবান সেগুন গাছ চুরির ঘটনাসংক্রান্ত খবর প্রায়ই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। সংরক্ষিত বনের মধ্যে রাস্তা পাকা হলে সেগুন গাছ চুরি বহুগুণ বেড়ে যাবে।

দেশের বনভূমির সংরক্ষণ নিয়ে বেলা কর্তৃক দায়ের করা একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ১১ মার্চ দেয়া হাইকোর্টের একটি আদেশও উল্লেখ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে। ওই আদেশ অনুযায়ী, দেশের বিদ্যমান বনভূমির যথাযথ সংরক্ষণ জরুরি। এর অংশ হিসেবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে লাঠিটিলা বনকে সমৃদ্ধিশালী করে তার যথাযথ সংরক্ষণ করার জোরালো দাবি জানিয়েছে বেলা। আইনি নোটিসে লাঠিটিলা বনের ভেতর রাস্তা পাকাকরণের কাজ বন্ধসহ সেখানে বনবিরুদ্ধ সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো হয়। বেলার আইনজীবী এস হাসানুল বান্না স্বাক্ষরিত নোটিসে এ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ সাতদিনের মধ্যে বেলাকে অবহিত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো হয়।

নোটিস পাওয়া ব্যক্তিরা হলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রধান বন সংরক্ষক, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক, মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার, সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজার কার্যালয়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, এলজিইডির মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী, জুড়ীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্যারাডাইস কনস্ট্রাকশনের মালিক সাইদুল ইসলাম।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এলজিইডির মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী আজিম উদ্দিন সরদার বণিক বার্তাকে বলেন, লাঠিটিলা এলাকাটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের নির্বাচনী এলাকা জুড়ী উপজেলার মধ্যে পড়েছে। তাই তিনি ডিও লেটারের মাধ্যমে ওই এলাকায় এক কিলোমিটার রাস্তা পাকাকরণের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব করেন। বিষয়টি মন্ত্রী মহোদয়ের জানা, তাই আলাদাভাবে চিঠি দিয়ে অনুমতি নেয়া হয়নি।

আরও