সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ বান্দরবান কার্যালয়ের অধিগ্রহণ করা বিভিন্ন সড়কের জমি দখলের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জমি দখলকারীর তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবশালীসহ একাধিক ব্যক্তি। তবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা না করায় নতুন করে দখলের ঘটনাও ঘটছে। প্রতিষ্ঠানটির অধিগ্রহণ করা চকরিয়া-আলীকদম-লামা সড়ক ঘেঁষে রিসোর্টের নামে একাধিক স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সড়কের দুই পাশ সংকুচিত হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। নির্মাণাধীন ওই স্থাপনাগুলোসহ লামার অন্তত ৮০টি পর্যটন স্থাপনার পরিবেশগত ছাড়পত্র বা সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরের অনুমোদন নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, রিসোর্ট নির্মাণের জন্য সরকারি অনুমোদন ও লাইসেন্স নেয়া বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভাসহ অঞ্চলভিত্তিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন, ফায়ার সার্ভিস থেকে ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন রিপোর্ট। এছাড়া নির্মাণকাজের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভবন নির্মাণের অনুমোদনও নিতে হয়। ট্যাক্স ও ভ্যাটের জন্য রেজিস্ট্রেশন করাও বাধ্যতামূলক।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, সওজের অধিভুক্ত বিভিন্ন সড়কের একটি কেরানিহাট-বান্দরবান (কেবি) সড়ক। প্রায় ২২ কিলোমিটার সড়কটি বান্দরবান ও চট্টগ্রাম দুই জেলার মধ্যে পড়েছে। চট্টগ্রামের কেরানিহাট থেকে বান্দরবান সদর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে রয়েছে স্থাপনা। এর মধ্যে কোনো কোনো স্থাপনা বা স্থাপনার দেয়াল সড়ক ঘেঁষেই করা হয়েছে। জেলা সদর থেকে কেবি সড়কের তিন-চার কিলোমিটার অংশে ভেনাস নামে একটি রিসোর্টের দেয়াল ও বেড়া রয়েছে সড়ক ঘেঁষে। ওই অংশের অপর পাশেও একইভাবে সড়ক ঘেঁষে প্লাজা নামে একটি কমিউনিটি সেন্টারের দেয়ালসহ একাধিক স্থাপনা রয়েছে। অবশ্য ১৯৭০-৭১ সালে ওই অংশে সড়কের উভয় পাশ মিলে ৭০ শতক জমি সওজের নামে নামজারি হয় বলে সওজ সূত্রে জানা গেছে। জমির দাগ ও ম্যাপ অনুযায়ী ওই অংশে সড়কের উভয় পাশে স্থান ভেদে ১০০-১৫০ ফুট পর্যন্ত সড়কের জমি।
বান্দরবান-বাঙ্গালহালিয়া, রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি, বার আউলিয়া-টঙ্কাবতি, আজিজনগর-গজালিয়া-লামা সড়কের বিভিন্ন স্থানেও সওজের জমি দখলেরও অভিযোগ রয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বোমাংহাট বাজালিয়া বাজারে ৪০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। তবে বান্দরবানে এমন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়নি।
সওজ কর্তৃপক্ষ বলছে, চকরিয়া-আলীকদম-লামা সড়কের ১৫ কিলোমিটারে বদুর ঝিরি এলাকায় নির্মাণাধীন নতুন দুটি স্থাপনা সরাতে নোটিস দেয়া হয়েছে। যদিও নোটিসের সময়কাল পেরিয়ে গেছে। ওই এলাকার মো. ফারুখ ও মো. ফরহাদ নামে দুই ব্যক্তিকে ১৯ নভেম্বর নোটিসটি দেয়া হয়।
নোটিসে বলা হয়, নির্মাণাধীন স্থাপনা মহাসড়ক সংরক্ষণ রেখার মধ্যে অবস্থিত। মহাসড়ক আইন অনুযায়ী সংরক্ষণ রেখার মধ্যে কোনো স্থাপনা করা যাবে না, যা আগামী সাতদিনের মধ্যে নিজ দায়িত্বে সরিয়ে নিতে হবে। তবে এখনো স্থাপনাগুলো সরানো হয়নি বলে জানা গেছে।
তবে ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে লামা রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাদেকুল মাওলা ইরাক বলেন, ‘আমাদের সমিতিতে বর্তমানে ৭০ জন সদস্য রয়েছেন। জেলা প্রশাসন থেকে বাণিজ্যিক লাইসেন্স পেতে হলে একটি রিসোর্টে নয়টি ঘর বা কটেজ থাকতে হবে। এ রকম কেবল একটি রিসোর্টে রয়েছে। অন্যগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটির সাতটি, পাঁচটি, তিনটি ও দুটি করে কটেজ রয়েছে। ট্রেড লাইসেন্স ও এনআইডি কার্ডের ভিত্তিতে সদস্যভুক্ত করা সমিতিতে ৭০টি রিসোর্টের মালিক বা সদস্য রয়েছেন। সওজের নোটিস জারি করা দুই ব্যক্তি সমিতির সদস্য নন।’
লামায় রয়েল রিসোর্টসহ আরো একটি রিসোর্ট রয়েছে। তবে সেটিরও অনুমোদন নেই। ছাড়পত্রের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ পরিবেশ অধিদপ্তর বান্দরবান কার্যালয়ে আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিসোর্টের মালিক মো. রাসেল।
লামা উপজেলার কোনো রিসোর্টের অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর বান্দরবানের পরিদর্শক মো. নুর উদ্দিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লামায় ৭০টির বেশি রিসোর্ট রয়েছে। কোনোটিরই অনুমোদন নেই। সম্প্রতি রয়েলসহ দুটি রিসোর্ট পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য অসম্পূর্ণ আবেদন করেছে। স্থাপনার নকশাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি থাকায় ছাড়পত্র দেয়া যাচ্ছে না।’
এদিকে চট্টগ্রামের বাজালিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জাইল্যার বিল এলকায় কেবি সড়ক থেকে ২০ ফুট দূরত্বে স্থাপন করা হয়েছে পোলট্রি ফার্ম। পাঁচ বছর আগে ফার্মটি করা হয় বলে জানিয়েছেন মালিক মো. মিনহাজ। ফার্মে প্রতি ব্যাচে চার-পাঁচ হাজার মুরগি পালন করা হয়। জায়গাটি বড়দুয়ারার বাসিন্দা মতিউর রহমানের কাছ থেকে তিনি ভাড়া নিয়েছেন।
জায়গাটি সওজের জমিতেই পড়েছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেটও নেই বলে স্বীকার করেছেন মো. মিনহাজ। সড়কের ওই অংশের উভয় দিকে কমপক্ষে ৫০ ফুট করে জমি সওজ বিভাগ অধিগ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন ওয়ার্ডের মেম্বার মো. নাসির উদ্দিন।
সার্বিক বিষয়ে সওজ বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নোটিসের সময় শেষ হওয়ার পরও কিছু স্থাপনা সরানো হয়নি। শিগগির উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। অন্যান্য সড়কে উচ্ছেদ সংক্রান্ত বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’