নাহিদা ম্যাম চাইতেন, অপ্রতিম যেন সব সময় ভালো কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ভালো কাজের মধ্যেই বড় হয়ে উঠে। এজন্য তিনি তাকে যেকোনো ভালো কাজে যুক্ত রাখতে চাইতেন। ম্যাম আমাদের বলতেন, তাকে যেন সঙ্গে রাখি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগম ও তার ছেলে অপ্রতীমকে নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন শিক্ষার্থী কাজী মিরাজ।
গত বছর রমজানে ইফতার বিতরণের সময় একটি ছবিতে দেখা যায়, মায়ের হাত ধরে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট অপ্রতিম। সেই ছবির পেছনেও ছিল ছেলেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সঙ্গে রাখা মায়ের এক উদ্যোগ। ছেলেটির পুরো নাম ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম। বয়স ১৩ বছর। কুমিল্লা বর্ডার গার্ড স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী।
তার সঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও ছিল ঘনিষ্ঠতা। গত রমজানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ টাকায় ইফতার বিক্রির উদ্যোগ নেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। সেই উদ্যোগে আর্থিক সহায়তা করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইফতার বিতরণেও অংশ নিতেন ড. নাহিদা বেগম।
কাজী মিরাজ বলেন, ইফতার দেয়ার সময় অপ্রতিমকে যেন বাসা থেকে নিয়ে আসি, ম্যাম তা বলতেন। যেদিন ইফতারের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতাম, ম্যামই তাকে নিয়ে আসতেন। অথবা বলতেন, তোমার কোনো বন্ধুকে পাঠিয়ে অপ্রতিমকে নিয়ে যাও।
তিনি বলেন, গত রমজানে প্রায় ১৭-১৮ দিন ইফতার বিতরণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৯-১০ দিন অপ্রতিম তাদের সঙ্গে ছিল। পরের বছর থেকে ম্যাম নিজেই ইফতার রান্না করে পাঠানোর কথা বলেছিলেন। আর অপ্রতিম পাশে থেকে এসব দেখবে।
কাজী মিরাজ বলেন, ম্যাম চাইতেন, সে যেন এসব দেখে মানুষের জন্য কাজ করতে শেখে। যেন ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ হয়।
অপ্রতিমের জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়ে ড. নাহিদাকে মেসেজ করেছিলেন কাজী মিরাজ। জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমি চাই, আমার ছেলে তোমার মতোই হোক। একেবারে পরোপকারী। যেন সে মানুষের জন্য কাজ করতে পারে।
বাংলা বিভাগের ১৫তম আবর্তনের শিক্ষার্থী রুমি আক্তার জানান, ম্যামের বাসায় তারা প্রায়ই দলবেঁধে যেতেন। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া ও সময় কাটানোর সূত্রে তাকেও কাছ থেকে দেখেছেন।
রুমি বলেন, সে অনেক প্রাণোচ্ছল ছিল, সবার সঙ্গে মিশে যেত। ম্যাম সবসময় বলতেন, উনার ছেলে বেশি আধুনিক মানুষ হবে না; বরং এমন হবে, যাতে সবার কাজে আসতে পারে। মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে, সবকিছুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে। যেন সুন্দর মানুষ হয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে।
গতকাল শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মায়ের ফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে শালবন বিহারে ছবি তুলতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতীম। সন্ধ্যার পরও বাসায় না ফেরায় তার মা কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
আজ শনিবার দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পেছনের একটি টিলায় অপ্রতীমের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের জিলানী। পরে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে।