কুড়িগ্রামে শুকনো মৌসুমেও ভাঙছে নদ-নদীর তীর বিলীন শতাধিক স্থাপনা

দেশে নদীভাঙনপ্রবণ জেলার মধ্যে কুড়িগ্রাম অন্যতম। বর্ষা মৌসুমে উজানের ঢল আর টানা বৃষ্টিতে ভাঙন দেখা দেয় জেলার নয়টি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদ-নদীর ৩৩টি পয়েন্টে।

দেশে নদীভাঙনপ্রবণ জেলার মধ্যে কুড়িগ্রাম অন্যতম। বর্ষা মৌসুমে উজানের ঢল আর টানা বৃষ্টিতে ভাঙন দেখা দেয় জেলার নয়টি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদ-নদীর ৩৩টি পয়েন্টে। সাধারণত দুইভাবে ভাঙন দেখা দেয়। বর্ষায় নদ-নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে এবং বর্ষা শেষে যখন পানি নেমে যায় তখন ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। তবে বর্ষা মৌসুম বিদায় নিলেও নাগেশ্বরী উপজেলায় নতুন করে ভাঙনের মুখে পড়েছে গঙ্গাধর নদের পূর্ব তীর কচাকাটা ইউনিয়নের ধনিরামপুর, দুধকুমার নদের রায়গঞ্জ ইউনিয়নের দামালগ্রাম ও কেদার ইউনিয়নের টেপারকুটি এলাকা। এছাড়া দুধকুমার নদের ভাঙনে সদর উপজেলার বানিয়াপাড়া, সবুজপাড়া, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে রৌমারী উপজেলার সোনাপুর এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে।

নদ-নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, এরই মধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে শতাধিক বসতভিটা, আবাদি জমি, গাছপালাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। হুমকির মুখে রয়েছে আরো শতাধিক ঘরবাড়ি, দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাজার, বিদ্যুতের সাবমেরিন কেবল পয়েন্টও। এসব এলাকায় অব্যাহত ভাঙনের কবলে পড়ে কেউ কেউ সড়কে, আবার কেউ কেউ অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন।

নাগেশ্বরী উপজেলার তরীরহাট এলাকার ফারুক হোসেন জানান, কিছুদিন আগে বন্যার পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গাধর নদের ভাঙনও তীব্র আকার ধারণ করেছিল। শুকনো মৌসুমে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তরীরহাট এলাকায় ভাঙনের কবলে রয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাজার, বিদ্যুতের সাবমেরিন কেবল ও বৈদ্যুতিক খুঁটিসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

কচাকাটা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শাহাদৎ হোসেন মণ্ডল জানান, দীর্ঘদিনের অন্ধকার ঘোচাতে তরীরহাট এলাকায় সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের লাইন এলেও তা এখন নদীগর্ভে বিলীনের পথে। সাবমেরিন কেবল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে অন্ধকারে থাকবে ওই এলাকার শত শত পরিবার। ব্যাহত হবে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা। এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়লে কৃষিতেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

অন্যদিকে ভাঙনের কবলে পড়েছে দুধকুমার নদের তীরবর্তী রায়গঞ্জ ইউনিয়নের দামালগ্রাম ও চর দামাল গ্রামের ৬ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড। ওই এলাকার বাসিন্দা আলী (৫৫) জানান, তিনি এর আগে তিনবার বাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন। এখন তার সব জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এবার ভাঙনের মুখে পড়েছে তার বসতভিটা। বাড়ি ভেঙে গেলে কোথায় যাবেন? মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকবে না তার।

একই এলাকার আজিবর রহমান (৫৮) জানান, তার সুপারি বাগান ও বসতভিটাসহ ১২ বিঘা জমি ছিল। সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব তিনি। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

দুধকুমার নদের তীরে বাস করেন সাইফুর রহমান, জয়নাল মিয়া ও জোমের আলী। তারা জানান, গত দুই মাসে দামালগ্রাম এলাকায় অর্ধশতাধিক বসতভিটা বিলীন হয়েছে দুধকুমার নদের ভাঙনে। পাশে চর দামালগ্রাম মসজিদ ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া বড়বাড়ী বাজারসহ অনেক স্থাপনা ভাঙনের মুখে রয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে রাত কাটছে নদীপারের অনেক পরিবারের।

রায়গঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান দ্বীপ মণ্ডল জানান, দুধকুমার নদের ভাঙনে তার ইউনিয়েনের ৬, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বহু মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়েছে। একাধিকবার পানি উন্নয়ন বোর্ডে (পাউবো) যোগাযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি তারা। এমনকি নদীভাঙন রোধে মানববন্ধন করেও কোনো লাভ হয়নি।

জেলার সাড়ে চার শতাধিক চরে প্রতি বছর গড়ে দুই হাজার পরিবার নদীভাঙনে তাদের বসতি হারান। নদীভাঙন এখন এ অঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০১৬-২২ সাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদের ভাঙনে ১৫ হাজার পরিবার তাদের বসতবাড়ি হারিয়েছে। চলতি বছরও ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে সদর, উলিপুর, চিলমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় ৪৪৭টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়া রৌমারী উপজেলার সোনাপুরে শতাধিক পরিবার, রাজারহাটে তিস্তার ভাঙনে ৬৩টি এবং ফুলবাড়ি উপজেলায় ধরলা নদীর ভাঙনে ছয়টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। এসব পরিবার অন্যের জমিতে ও বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় অনেকেই পরিবার নিয়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন।

সার্বিক বিষয়ে কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন করে নদীভাঙনের কবলে পড়া এলাকার তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে রায়গঞ্জ ও কচাকাটা ইউনিয়নের তরীরহাট এলাকায় নদীভাঙনের বিষয়টি আমিও জেনেছি। বরাদ্দ পেলে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আরও