কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে বিভিন্ন আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে এসব অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির জন্য কম্পিউটার, পানি শোধন যন্ত্র, ডিজিটাল ডুপ্লিকেট যন্ত্র, ইলেকট্রিক ড্রিল সিস্টেম, স্পাইনাল অ্যান্ড পিটুইটারি সেট, থ্রিডি ভিজুয়ালাইজেশন মাইক্রোস্কোপ সিস্টেম, মিনিমালি ইনভেসিভ স্পাইন সার্জারি, প্রিকিটেনিয়াস ভার্টিব্রাল লাম্বার পেডিকল স্ক্রু ও এসিডিএফ স্পাইন সার্জারি ইনস্ট্রুমেন্ট সেট কেনার ক্ষেত্রে অর্থের অপব্যবহার, অতিরিক্ত মূল্য দেখানো এবং প্রয়োজনের তুলনায় সরঞ্জামের পরিমাণ ও মানে অসংগতির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, যেসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে তার অনেকগুলোর প্রকৃত দর বাজারমূল্যের তুলনায় বহু গুণ বেশি দেখানো হয়েছে। কিছু যন্ত্রপাতি ব্যবহারের উপযোগী নয়। কিছু যন্ত্রপাতির অর্ডার, ডেলিভারি ও বিল পরিশোধের সময়সীমাতেও অসংগতি দেখা গেছে।
কম্পিউটার কেনায় অনিয়ম: জানা গেছে, দরপত্র অনুযায়ী, কলেজে টুয়েলভ জেনারেশনের এইচপি ব্র্যান্ডের ২০০টি ডেস্কটপ কম্পিউটার সরবরাহ করার কথা ছিল। প্রতিটির দাম ধরা হয়েছিল প্রায় ১ লাখ টাকা। কম্পিউটারগুলোয় থাকার কথা ছিল কোর আই-থ্রি প্রসেসর, ৪ জিবি র্যাম, ১০০০ জিবি হার্ড ডিস্ক, ২১.৫ ইঞ্চির ফুল এইচডি এলইডি মনিটর এবং ৪৫০ ওয়াট পাওয়ার সাপ্লাই। কিন্তু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এর পরিবর্তে দিয়েছে সিক্সথ জেনারেশনের পুরনো ও নিম্নমানের কম্পিউটার। যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক একেবারেই অকেজো। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব কম্পিউটার চালু করাই যাচ্ছে না, ফলে সংকটে পড়েছেন চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিতরা। সূত্র জানায়, কোনো ব্র্যান্ডের লোগো নেই এমন কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়েছে। দরপত্রের কোনো শর্ত মানা হয়নি। এতে সরকারের প্রায় ২ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক ডা. সরোয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, ‘নিম্নমানের কম্পিউটার ফেরত দেয়ার চেষ্টা করছি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলেছে, তারা ফেরত নেবে। তবে আমরা যন্ত্রপাতি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য বারবার চিঠি দিয়েও পরিচালকের দপ্তর থেকে সাড়া পাইনি।’
পানি শোধন যন্ত্র ও ফটোকপি যন্ত্র কেনায় অনিয়ম: জানা গেছে, ৬ হাজার জিপিডি (গ্যালন পার ডে) ক্ষমতাসম্পন্ন পানি শোধন যন্ত্র কেনার কথা থাকলেও সেখানে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১২০০ জিপিডির। এটি এখন পর্যন্ত স্থাপনও করা হয়নি। এটি যদি স্থাপন করা হয় তাহলে সরকার প্রায় ৫০ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়বে।
এছাড়া উচ্চ রেজল্যুশনের ডিজিটাল ডুপ্লিকেট যন্ত্রের পরিবর্তে সরবরাহ করা হয়েছে নিম্নমানের সাধারণ ফটোকপি যন্ত্র, যার কারণে আরো ৪ লাখ টাকার অপচয় হয়েছে।
এসব যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে ঢাকার প্রতিষ্ঠান এশিয়া ট্রেডিং করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির মালিক সজিব আল হাসান। তবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যন্ত্রপাতি সরবরাহে বিল ছাড়ে অনিয়ম: ২০২৩ সালের ৭ মে নিউরোসার্জারি বিভাগের জন্য ১৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকার ১৯টি যন্ত্রপাতি কেনার দরপত্র ডাকা হয়। সুপারিশের ভিত্তিতে কাজ পায় ঢাকার এমএস এসপি ট্রেডিং হাউজ। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও বিল পরিশোধ করা হয় ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর অথচ যন্ত্রপাতি সরবরাহ সম্পূর্ণ হয়নি এবং সার্ভে কমিটির প্রতিবেদনও তখনো আসেনি। মেডিকেল কলেজের স্টোর রেজিস্টারে যন্ত্রপাতির তথ্য তোলার আগেই বিল প্রদান করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের মার্চে সার্ভে প্রতিবেদন দেয়া হয়।
ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ইমেজ গাইডেড নিউরো নেভিগেশন সিস্টেম, ৪১ লাখ টাকার ইলেকট্রিক ড্রিল সিস্টেম, ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকার স্পাইনাল, পিটুইটারি সেট ও থ্রিডি ভিজুয়ালাইজেশন মাইক্রোস্কোপ, ৮৫ লাখ ৯১ হাজার টাকার মিনিমালি ইনভেসিভ স্পাইন সার্জারি সিস্টেম, ৩০ লাখ ৩৭ হাজার টাকার পেডিকল স্ক্রু সেট, ৪৮ লাখ ৭১ হাজার টাকার এসিডিএফ ইনস্ট্রুমেন্ট সেট।
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক যন্ত্রপাতি পড়ে আছে। বুঝে নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। কিছু নিম্নমানের যন্ত্র আমরা নিইনি।’ তবে এ বিষয়ে এসপি ট্রেডিং হাউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাফিজুর রহমান পুলক দাবি করেন, ‘আমরা শুধু ১৯টি যন্ত্র সরবরাহ করেছি। সব নিয়ম মেনেই কাজ করেছি। কোনো অনিয়ম হয়নি।’
ভবন নির্মাণেও দুর্নীতি: ২০১২ সালে শুরু হওয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভবন নির্মাণ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ৬১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভবন নির্মাণে ব্যয় হয় ৪৮৫ কোটি টাকা, আর যন্ত্রপাতি ও আসবাব কিনতে ব্যয় হয় ১২৯ কোটি টাকা। একাডেমিক ভবনের নির্মাণে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বেজমেন্ট নির্মাণ, টাইলস লাগানো এবং অন্যান্য কাজে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এ অনিয়মে কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদ মো. কবিরসহ কয়েকজন প্রকৌশলীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ভবন নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও বিল প্রদানে অনিয়মের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কুষ্টিয়া কার্যালয়ের উপপরিচালক মাঈনুল হাসান রওশনী জানান, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের নির্মাণসংক্রান্ত অনিয়মের একটি তদন্ত আগে থেকেই চলমান। যন্ত্রপাতি ক্রয়সংক্রান্ত নতুন একটি অভিযোগ অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। এটিরও তদন্ত চলছে।
সম্মিলিত সামাজিক জোট, কুষ্টিয়ার চেয়ারম্যান ড. আমানুর আমান বলেন, ‘শুরু থেকেই এ মেডিকেল কলেজ নির্মাণে দুর্নীতি-অনিয়ম হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত করা উচিত।’ সরকারি অর্থে কেনাকাটা ও নির্মাণকাজে এমন দুর্নীতির ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।