টার্নওভার কর বাড়ানোর চাপ আইএমএফের

আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ও কাস্টমস খাতের সব ধরনের কর অব্যাহতি বাতিল; বিলাসপণ্যে সম্পূরক শুল্ক বা সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি (এসডি) বৃদ্ধি এবং ভ্যাট খাতে ভ্যাটের একক হার নির্ধারণের চাপ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ও কাস্টমস খাতের সব ধরনের কর অব্যাহতি বাতিল; বিলাসপণ্যে সম্পূরক শুল্ক বা সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি (এসডি) বৃদ্ধি এবং ভ্যাট খাতে ভ্যাটের একক হার নির্ধারণের চাপ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এছাড়া টার্নওভার কর বাড়ানোর চাপও দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে গতকাল দুই দফা বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধি দল এসব প্রস্তাব উত্থাপন করে। প্রথম দফার বৈঠকে সকালে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, এনবিআরের সব সদস্য, প্রথম সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। বিকালে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে অংশ নেন এনবিআরের দ্বিতীয় সচিবরা।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে টার্নওভার কর বাড়ানোর চাপ দিয়েছে আইএমএফ। বর্তমানে কোম্পানি ও ফার্মের ক্ষেত্রে টার্নওভার যাই হোক দশমিক ৬ শতাংশ হারে টার্নওভার কর দিতে হয়। ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৩ কোটি টাকার বেশি টার্নওভার হলে দশমিক ২৫ শতাংশ হারে কর দিতে হয়। এছাড়া কার্বোনেটেড ও সুইটেনড বেভারেজের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ হারে টার্নওভার কর দিতে হয়। বৈঠকে কোম্পানি ও ব্যক্তির ক্ষেত্রে টার্নওভার করহার ন্যূনতম ১ শতাংশ ও সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ নির্ধারণের চাপ দিয়েছে আইএমএফ প্রতিনিধিরা।

বৈঠকে অংশ নেয়া এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইএমএফ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কর-জিডিপির হার শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বাড়াতে বলেছে। অতিরিক্ত ৫৭ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের রূপরেখাও চেয়েছে। ন্যূনতম করহারও বাড়াতে বলেছে। ভ্যাটের একক হার নির্ধারণ ও বিলাসপণ্যে সম্পূরক শুল্ক বা সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি (এসডি) বৃদ্ধি করতে বলেছে। আমরা বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করতে বলেছি। তারা রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা কমানোর বিষয়ে নমনীয় হয়েছে। আগামীকাল আরেকটি বৈঠক হবে। অর্থ উপদেষ্টার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ওই দিন বিষয়গুলো চূড়ান্ত করব।’

বৈঠকে উপস্থিত এনবিআরের একজন দ্বিতীয় সচিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইএমএফ আগামী ৩০ জুনের পর সব অব্যাহতির এসআরও বাতিলের চাপ দিয়েছে। দীর্ঘদিন চালু থাকা অব্যাহতি বাতিল করার বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। তবে সম্প্রতি দেয়া কর অব্যাহতি এখনই বাতিল না করে ধীরে ধীরে বাতিলের বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছি। সিগারেট, ট্রেড ও প্রকিউরমেন্ট খাত থেকে ভ্যাটের বড় আকারের রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে। সে হিসেবে ভ্যাটের রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব।’

টার্নওভার কর বাড়ানোর চাপের বিষয়ে এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘আয়করের ক্ষেত্রে টার্নওভার কর আয়কর নয় বরং পরোক্ষ কর। এ কর তুলে দিয়ে তার জায়গায় লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে আয়কর আরোপ ও আদায় করা দরকার। আইএমএফের উচিত ছিল, বিকৃত এ কর ব্যবস্থার জরুরি সংস্কার করার জন্য সরকারকে চাপ দেয়া। তা না করে এ খাত থেকে জোর করে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য আইএমএফ এ পরামর্শ দিয়েছে। এতে এ খাত থেকে তেমন রাজস্ব বাড়বে বলে মনে হয় না। কারণ করহার বাড়ালে ব্যবসায়ীরা টার্নওভার কম দেখাতে শুরু করবেন। টেকসই সমাধান হচ্ছে, সব রাজস্বনীতি, পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক ও সমন্বিত সংস্কার অতিজরুরি ভিত্তিতে করা।’

সব ধরনের অব্যাহতি রহিত করা সঠিক হবে না জানিয়ে ফরিদ উদ্দিন আরো বলেন, ‘তাতে আশানুরূপ ফল আসবে না। অব্যাহতি রহিতকরণ যৌক্তিক হতে হবে। বিলাসপণ্যে এসডি বেশিই আছে। আরো বাড়ালে ফাঁকি বাড়বে। রাজস্ব বাড়বে না। ভ্যাট হার একক মানে মূল হার ১০ শতাংশ, বিলাসপণ্যে ১৫-২০ শতাংশ ও অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্যে ৫-৬ শতাংশ করা যায়। সব ক্ষেত্রে একক হার, অর্থাৎ ১৫ শতাংশ করা হলে রাজস্ব বাড়বে না। ব্যবসা, বিশেষ করে এসএমই খাতের, ক্ষতি হবে।’

সার্বিক বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সহজ করার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির জন্য সব কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারী, অর্থনীতিবিদ, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন অংশীদারদের পরামর্শ যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।’

এনবিআরের হালনাগাদ পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসের (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার ৫৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৮১৭ কোটি ৯ লাখ টাকা; অর্থাৎ এ সময়ে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। সে অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম আট মাস শেষে এনবিআরের রাজস্ব আহরণে ঘাটতির হার দাঁড়িয়েছে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশে।

পুরো অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের মাঝপথে এসে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি করা হয়। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২ লাখ ১৭ হাজার ৯৭১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায় ৩ হাজার ৮৪৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বেশি আদায় হয়েছে; যা ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। ফেব্রুয়ারিতে ২৬ হাজার ৯৯১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ছিল। এর মধ্যে আহরণ হয়েছে ২৬ হাজার ৭৫১ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

ঋণ কর্মসূচির আওতায় ৪৭০ কোটি ডলার অর্থছাড়ের আগে বিভিন্ন শর্ত পর্যালোচনা করতে গত শনিবার বাংলাদেশে আসে আইএমএফ প্রতিনিধি দল। এ ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থছাড়ের আগে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সিরিজ বৈঠকে বসছে। যার অংশ হিসেবে এনবিআরের সঙ্গে এ বৈঠক। আন্তর্জাতিক এ সংস্থার অন্যতম শর্ত ছিল করছাড় তুলে দেয়া এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানো। সেই হিসাবে আগামী অর্থবছরে বাড়তি প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের শর্ত রয়েছে। এ শর্ত বর্তমান বাস্তবতায় পূরণ করা প্রায় অসম্ভব বলে জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এ বিশাল অংকের রাজস্ব আহরণ খুবই কঠিন বলে জানিয়েছেন এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ভ্যাটের ১২ হাজার কোটি টাকা বাড়তি আদায় করতে গিয়ে দেশে তীব্র চরম সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। পরে অনেক পণ্যের ভ্যাটের হার কমাতে হয়েছে। আর নতুন করে ভ্যাট আরোপ করার তেমন একটা সুযোগ নেই। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্কারোপের কারণে বাড়তি শুল্ক আদায় খুবই কঠিন হবে। এরই মধ্যে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

আরও