এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে আশংকার কথা উঠে এসেছে এক আলোচনায়। এজন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের স্বার্থে মেধাসত্ত্ব আইন গ্রহণের জন্য দেশের বেসরকারি খাতকে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং সেই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে ওষুধ শিল্প দেশের রফতানিতে তৈরি পোশাক খাতের মত ভূমিকা রাখতে পারবে।
আজ শনিবার ঢাকা চেম্বার আয়োজিত ‘এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সময়ে ঔষধ খাতের রফতানি: কৌশল নির্ধারণ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, আভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ উৎপাদন করতে সক্ষম ওষুধ খাত। যার মূল্য প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরে দেশের ঔষধ খাত প্রায় ১ হাজার ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করছে। এজন্য স্থানীয়ভাবে এপিআই উৎপাদনে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর আরো মনোযোগী হতে হবে। প্যাটেন্ট আইন এবং ঔষধ নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ট্রিপস চুক্তি অনুসারে লাইসেন্সিং বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়ে ঔষধ শিল্প সুবিধা ভোগ করতে পারে। এছাড়াও তিনি গবেষণা ও উন্নয়নের উপর জোরারোপ, মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং এফডিআই সম্প্রসারণে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে যৌথ বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বারোপ করেন।
বিশ্বে যত ধরনের ওষুধ আছে তার বেশিরভাগই দেশে উৎপাদনের চেষ্টা করা হয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান বলেন, ওষুধ খাতে বাংলাদেশের অর্জন অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং দক্ষ মানব সম্পদের উপস্থিতির কারণে এ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। এ শিল্পে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার শুরু হয়েছে তাই আমাদেরকে আরো বেশি হারে গবেষণা ও উন্নয়ন কাজে মনোনিবেশ করতে হবে। বিশ্বের সেরা ২০টি ঔষধের মধ্যে ১৬টিই বায়োলজিক্যাল।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী বেশি হারে বায়োলজিক্যাল ড্রাগ উৎপাদনের প্রবণতা আগামীতে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। বর্তমানে দেশের ব্যবহৃত মোট এপিআই এর ১৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়ে থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশে তৈরি ঔষধের প্রবেশাধিকার পেলে এ খাতের বৈশ্বিক ইমেজ তৈরিতে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এ খাতে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রফতানি সম্ভব। তৈরি পোশাক খাতের মতো অন্যান্য খাতগুলোতেও সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে সার্বিক রফতানি অনেক বাড়বে।
এলডিসি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ হতে বেসরকারিখাতকে সার্বিক সহায়তা প্রদান করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি গ্রাজুয়েশনের সময় করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মত বেশকিছু বৈশ্বিক সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে সবাইকে আরো সচেতন থাকতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ৮ থেকে ১৫ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হতে পারে। ফলে দেশের মোট রফতানি ১৪ দশমিক ২৮ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যার মূল্য প্রায় ৫দশমিক ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশী পণ্যের মেধাসত্ত্ব সুবিধা অব্যাহত থাকবে। তবে এ সময়ের পর আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির ক্ষেত্রে দেশের ওষুধ খাতকে প্রবল প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। সেই সঙ্গে কমবে রফতানিও। দেশীয় ঔষধ শিল্পের গবেষণা খাতের উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রদানের জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সেমিনারের নির্ধারিত আলোচনায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ.এইচ.এম. সফিকুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. এবিএম ফারুক এবং ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম মোসাদ্দেক হোসেন অংশগ্রহণ করেন। এসময় ডিসিসিআই সহ-সভাপতি মনোয়ার হোসেন এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।