যশোরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ হাজার ২৮৯টি। এর মধ্যে প্রায় ৮১ শতাংশ বিদ্যালয়ে নেই শহীদ মিনার। কলাগাছ, কাঠ ও মাটি দিয়ে তৈরি অস্থায়ী শহীদ মিনার কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হয় এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন খাতে প্রতি বছর অনুদান দিচ্ছে। যার একটি অংশ লুটপাট হয়ে যায়। অনেক বিদ্যালয়ে এসব খাতের টাকা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আর প্রধান শিক্ষকরা ভাগাভাগি করে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও কোনো কোনো বিদ্যালয়ে বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
গোটা বিশ্বে ভাষার জন্য জীবনদানের নজির একমাত্র বাংলাদেশের। শহীদ মিনার হলো ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতিচিহ্ন। ভাষা আন্দোলনের রক্তেরাঙা পথ ধরে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। মাত্র নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয় তার অনুপ্রেরণা ছিল ভাষা আন্দোলন। সেই ভাষা আন্দোলনের প্রতীক শহীদ মিনার স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্মাণ না হওয়া দুঃখজনক বলেও মনে করেন কয়েকজন শিক্ষাবিদ।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, যশোরের আট উপজেলায় ১ হাজার ২৮৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শহীদ মিনার নেই ১ হাজার ৩৯টিতে। আছে মাত্র ২৫০টিতে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২২৬টিতেই শহীদ মিনার নেই। বাকি ২৪টিতে রয়েছে। চৌগাছার ১৩৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র আটটিতে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকি ১৩১টিতে নেই। ঝিকরগাছার ১৩১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ মিনার রয়েছে মাত্র ১৯টিতে। বাকি ১১২টিতে নেই। কেশবপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৫৮টি। এর মধ্যে ১৭টিতে শহীদ মিনার থাকলেও বাকি ১৪১টিতে নেই। শার্শা উপজেলায় ১২৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৪টিতে শহীদ মিনার আছে। বাকি ১০১টিতে নেই। অভয়নগরে ১১৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ মিনার রয়েছে ৫৩টিতে। বাকি ৬৪টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই। মণিরামপুরে ২৬৭ প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শহীদ মিনার রয়েছে ৮৫টিতে। বাকি ১৮২টিতে নেই। বাঘারপাড়ার ১০২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ২০টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকি ৮২টিতে নেই।
এ ব্যাপারে যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আমিরুল আলম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে চলে। এ কারণে শহীদ মিনার নির্মাণের দায় একেবারেই সরকারের। সরকারি উদ্যোগেই শহীদ মিনার হওয়া উচিত।’
শিক্ষা কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থানীয়ভাবে অনুদান সংগ্রহ করে শহীদ মিনার নির্মাণ করার পরামর্শ দেয়া হয়। এজন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ নেই।
এ প্রসঙ্গে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার থাকা জরুরি। কিন্তু সরকারিভাবে বরাদ্দ না থাকায় তা হচ্ছে না। যেগুলোয় আছে সেগুলো স্থানীয়ভাবে করা হয়েছে। শহীদ মিনারের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ থাকলে ভালো হয়।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, ‘শহীদ মিনার নির্মাণে সরকারিভাবে বরাদ্দ না থাকায় অনেক স্কুলে তা নেই। তার পরও সব স্কুল কর্তৃপক্ষকে স্থানীয়ভাবে অর্থ জোগাড় করে শহীদ মিনার নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করা হবে।’
শিক্ষকরা বলছেন, স্থানীয়ভাবে অনুদান সংগ্রহ করা কঠিন ব্যাপার। তাছাড়া একটি শহীদ মিনার নির্মাণে লাখ টাকা দরকার যা স্থানীয়ভাবে জোগাড় সম্ভব নয়।
যশোর সদর উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের দত্তপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল জব্বার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শহীদ মিনার নির্মাণে কোনো বরাদ্দ নেই। আর স্থানীয়ভাবে টাকা জোগাড় করে শহীদ মিনার নির্মাণ অসম্ভব ব্যাপার। একমাত্র সরকারি অর্থায়ন ছাড়া সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ সম্ভব নয়।’