কলাপাড়ায় পানি জাদুঘর

এক কক্ষেই দেখা যাবে দেশের ৮৭ নদ-নদীর পানি

‘যতদূর যাই আমি—হামাগুড়ি দিয়ে তুমি পিছে পিছে আসো, তোমার ঢেউয়ের শব্দ শুনি আমি। কথা কয় কথা কয়—ক্লান্ত হয় নাকো এই নদী।

‘যতদূর যাই আমি—হামাগুড়ি দিয়ে তুমি পিছে পিছে আসো, তোমার ঢেউয়ের শব্দ শুনি আমি। কথা কয় কথা কয়—ক্লান্ত হয় নাকো এই নদী। একপাল মাছরাঙা, নদীর বুকের রামধনু, বকের ডানার সারি সাদা পদ্ম—নিস্তব্ধ পদ্মের দ্বীপ নদীর ভিতরে। মানুষেরা সেই সব দেখে নাই।’ নদী সম্পর্কে জীবনানন্দ দাশের ভাবনাটা ছিল ঠিক এমনি। চিরায়ত বাংলার নদীর সেই রূপ-সৌন্দর্য যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। দূষণ ও দখলে হারিয়ে গেছে এককালের প্রবহমান অনেক নদী। এমনকি নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো হারিয়ে যাওয়া অনেক নদী সম্পর্কে জানেই না। তবে নদীর সেসব ইতিহাস ঐতিহ্য তুলে ধরতে এবং নতুন প্রজন্মকে নদী সম্পর্কে জানাতে পটুয়াখালীতে গড়ে উঠেছে পানি জাদুঘর। যেখানে দেখা যাবে দেশের ৮৭ নদীর পানি। স্বচ্ছ কাচের জারে সংরক্ষণ করা হয়েছে এসব পানি। পাশাপাশি জানা যাবে, ওইসব নদ-নদীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে। 

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইডের সহায়তায় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাখিমারা গ্রামে পানি জাদুঘরটি গড়ে তোলা হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আভাস-এর সহযোগিতায় কলাপাড়া উপকূলীয় জনকল্যাণ সমিতি বর্তমানে পানি জাদুঘরটি পরিচালনা করছে। পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় আগত পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণেও পরিণত হয়েছে এটি। কুয়াকাটার যাত্রাপথে অনেক পর্যটক গাড়ি থামিয়ে এ জাদুঘর ঘুরে দেখেন। মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে জাদুঘরটি।

জাদুঘরের সামনে দেখা যাবে মানবসৃষ্ট কারণে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া নদ-নদীতে নৌকা আটকে থাকার একটি প্রতীকী ছবি। এছাড়া অর্ধ ডুবন্ত নৌকার বুকে বিঁধে আছে দুটি গজাল মাছ। এর মাধ্যমে নদী ও নদীমাতৃক বাংলাদেশকে খুনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রায় ৫০০ বর্গফুটের দোতলা টিনের পানি জাদুঘরের দোতলায় সারি সারি করে সাজানো রয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ও নদীকেন্দ্রিক দক্ষিণাঞ্চলবাসীর জীবিকা অর্জনের নানা উপকরণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মাছ শিকারের ঝাঁকি, জাল, খুচনি জাল, নৌকা, চাঁই, পাল্লা, কাঁকড়া শিকারের চাঁই ইত্যাদি। এছাড়া আবহমান গ্রামবাংলার একসময়ের তাঁত বোনার মেশিন ও কৃষিজমির উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণের জন্য মাটির তৈরি হাঁড়ি, বাঁশের তৈরি ডোলা, মুড়ি ভাজার তলছা এবং ঝাড়রা মাটির তৈরি রান্নার হাঁড়ি, পাতিল, খাবারের থালা, বাসন, পিতলের তৈরি থালা, বাটি, বদনা, মগসহ নানা উপকরণ। জাদুঘরের দেয়ালে শোভা পেয়েছে দেশীয় খাল ও নদ-নদীর ছবি, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, জেলে এবং কুমার, তাঁতিসহ সর্বস্তরের মানুষের জীবনধারণ ও জীবিকা অর্জনের নানা দৃশ্য। এসব দৃশ্য দেখতে ও নদী সম্পর্কে অজানা অনেক তথ্য জানতে প্রতিদিনই দেড় শতাধিক পর্যটক আসে।

পানি জাদুঘর দর্শনে আসা কাজী আল-আমিন জানান, যদি এখানে না আসতাম, তাহলে নদীকেন্দ্রিক বাংলাদেশের এ চিত্র আমাদের অজানা থেকে যেত। নদী ও নদীর নাব্যতা রক্ষায় আজ থেকেই আমাদের সোচ্চার হতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের চিরায়ত নদীর চিত্র দিন দিন পাল্টে যাচ্ছে। নদী অববাহিকায় গড়ে ওঠা শহর, বন্দর ও গ্রামের দূষিত বর্জ্য ফেলে নদীর পানিকে দূষিত করা হচ্ছে। নদীর নাব্যতা নষ্ট করা হচ্ছে। অপরিকল্পিত বাঁধ তৈরি করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করার ফলে নদী দিনে দিনে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। তাই নদী ও পানিসম্পদ রক্ষায় সরকার ও নীতিনির্ধারকদের আরো উদ্যোগী, মানুষকে সচেতন করা এবং নদী ও পানিসম্পদ রক্ষার আন্দোলকে আরো শক্তিশালী করতে এ পানি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সৈকত গুহ পিকলু নামে আরেক পরিদর্শক বলেন, পানির যে জাদুঘর হতে পারে, তা শুনে আমি বিস্মিত। এখানে এসে বুঝলাম আমরা আমাদের নদী ও পানির সঙ্গে যুক্ত উপকরণগুলো জাদুঘরে পাঠানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেছি। যেটা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত।  

পানি জাদুঘর দেখভালের দায়িত্বে থাকা এনজিও আভাসের নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল বলেন, এ জাদুঘর মানুষ, সরকার ও নতুন প্রজন্মকে সচেতন করবে। পানি জাদুঘরে রয়েছে বিভিন্ন গবেষণার বই, নদী ও পানির সঙ্গে সম্পৃক্ত জীবন নিয়ে তৈরি গল্পচিত্র। এক কথায় এ জাদুঘরে আসলে একজন মানুষ, বাংলাদেশের নদী, পানি, নদী পাড়ের মানুষের জীবন, জীবিকা, ইতিহাস, ঐতিহ্য সব জানতে পারবেন।

আরও