সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভালো রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও একটি ভালো জনপ্রশাসন অভিন্ন লক্ষ্যে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করলে সাফল্য মেলে।’ শক্তিশালী ও উদ্ভাবনী সরকারি নীতি তৈরি এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণকে উচ্চমানের সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করে দেশটির জনপ্রশাসন। বিভিন্ন বৈশ্বিক ও স্থানীয় সংকট পরিস্থিতিতেও সিঙ্গাপুর যে এগিয়ে গেছে, তার পেছনে দেশটির প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উদ্ভাবনী নেতৃত্বের ভূমিকার কথা স্মরণ করেছেন লি সিয়েন লুং। তিনি মনে করেন, এসব কারণে সিঙ্গাপুরের প্রশাসনিক কাঠামো রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো কিংবা জনপ্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতাহারে ‘মেধাভিত্তিক’ জনপ্রশাসন বা মেরিটোক্রেসি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ ছিল। মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র গড়ে তোলার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় আনুগত্য ও রাজনীতিঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কৃতি গড়ে ওঠায় মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রশাসন সাজাতে বর্তমান বিএনপি সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের দায়িত্বশীলরাও বলছেন, অতীতের দলীয়করণের সংস্কৃতির কারণে তাদের জন্য কাজটি সহজ হচ্ছে না।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবং বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তাদের রদবদল শুরু হয়েছে। তবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের জন্য উপযুক্ত কর্মকর্তা বাছাই নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। জানা গেছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব পদে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে কর্মকর্তাদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করা হলেও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইতিবাচক সাড়া মিলছে না। আবার যেসব কর্মকর্তার এসিআর ইতিবাচক, তাদের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় চূড়ান্ত বিবেচনায় আটকে যাচ্ছেন। ফলে বর্তমান সরকারের সচিব নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেধাভিত্তিক প্রশাসন বলতে শুধু কাগজে ভালো ফল করা মানুষদের খুঁজে এনে বসানো নয়। আমরা আগেও দেখেছি, বিশেষ করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, এ ধরনের কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু মূল বিষয় হলো যোগ্য মানুষকে সঠিক জায়গায় দেয়া এবং তার কাজ করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। শুধু যোগ্য লোক নিয়োগ দিলেই হবে না; নিয়ম-কানুন, সমন্বিত কাজের পরিবেশ এবং পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন—সবকিছু নিশ্চিত করলেই প্রকৃত অর্থে মেরিটোক্রেসি প্রতিষ্ঠা পাবে। এ জায়গায় এখনো শক্তিশালী অগ্রগতি চোখে পড়ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিভিন্ন সেক্টরে দলীয় আনুগত্য এতটাই প্রভাবশালী যে পেশাদারত্ব অনেক সময় চাপা পড়ে যাচ্ছে। এতে যারা সত্যিকার অর্থে পেশাদার মনোভাব নিয়ে এগোতে চান, তারা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। সব মিলিয়ে বিষয়টি এখনো পর্যবেক্ষণের পর্যায়ে আছে। সময় দিলে হয়তো কিছু পরিবর্তন দেখা যাবে। তবে স্পষ্টভাবে বলা যায়, বাংলাদেশকে এগোতে হলে এ জায়গাগুলো অতিক্রম করতেই হবে। দলীয় আনুগত্য নয়, পেশাদারত্বই হতে হবে মূল মানদণ্ড।’
মন্ত্রিপরিষদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট ৮১ কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদমর্যাদায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন। সরকারের সচিব বা সমমর্যাদাসম্পন্ন ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ২০ সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কর্মরত রয়েছেন।
সর্বশেষ গত রোববার খাদ্য, পরিবেশ, কৃষি বিপণন, ট্রেড মার্কস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগ, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোসহ ১১ অধিদপ্তর ও সংস্থায় নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের রেজিস্ট্রার জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ১৯ এপ্রিল সচিব পদমর্যাদায় এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ওয়াক্ফ প্রশাসক পদে তিনজন কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার। তার আগে ১৬ এপ্রিল চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সাবেক সচিব আব্দুন নাসের খানকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব ও দুজন অতিরিক্ত সচিব বণিক বার্তাকে বলেছেন, মেধাবী ও দক্ষ আমলাতন্ত্র গঠনের জন্য পেশাদার কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করতে হবে। এ কাজের জন্যও পেশাদার লোক দরকার। অপেশাদার বা দীর্ঘদিন সিভিল সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত নন এমন কারো দ্বারা কখনো সেটি সম্ভব নয়। তবে খুঁজে বের করার পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।
সরকারের আরেক অতিরিক্ত সচিব বলেন, জনমুখী প্রশাসনের জন্য মেধা ও দক্ষতার পাশাপাশি দুর্নীতিমুক্ত কর্মকর্তা প্রয়োজন। এজন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা দেশের তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্য নিতে পারেন। সংস্থাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর শুধু মেধা বিবেচনা করলে চাকরিতে প্রবেশের সময় প্রত্যেকের যে ক্রমিক নম্বর সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
ডিসি নিয়োগের ফিটলিস্ট প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ফিটলিস্টের জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয়া এবং মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট বা নোটিস বোর্ডে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাচভিত্তিক প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের চিঠির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় ও প্রস্তুতির সুযোগ দিয়ে সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়। ওয়েবসাইটেও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়। তবে এবার টেলিফোনের মাধ্যমে ডেকে ২৮ ও ২৯তম ব্যাচের প্রায় ৯০ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে অনেক কর্মকর্তা অংশ নেয়ার সুযোগ না পাওয়া এবং পছন্দমতো কর্মকর্তাদের ডাকার অভিযোগ তুলেছেন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউএনও, ডিসি ও সচিব নিয়োগ একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ইউএনও ও ডিসিদের ক্ষেত্রে ফিটলিস্ট প্রণয়ন কমিটি কাজ করে, যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা ও রেকর্ড মূল্যায়ন করে তালিকা তৈরি হয়। এপিডি, একজন যুগ্ম সচিবসহ কয়েকজনের একটি কমিটির মাধ্যমে ইউএনও নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়। ডিসি নিয়োগের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে পৃথক একটি কমিটি রয়েছে, যেখানে চারজন শীর্ষ পর্যায়ের সচিব—ভূমি, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব যুক্ত থাকেন। এ কমিটি ফিটলিস্ট চূড়ান্ত করার পর তা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয় এবং অনুমোদনের পর ধাপে ধাপে পদায়ন কার্যকর হয়। সচিব নিয়োগ তুলনামূলকভাবে নীতিনির্ধারণী ও উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত, যেখানে প্রধানমন্ত্রী, জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং সেখানে যোগ্যতা ও সিনিয়রিটির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশাসনিক বিবেচনাও কাজ করে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রসঙ্গে সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিয়মিত ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। কারণ দীর্ঘদিন বঞ্চিত বা উপেক্ষিত হলেও অনেক দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ পান। একইভাবে বর্তমান প্রশাসনে থাকা কর্মকর্তাদেরও বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে সবকিছু মিলিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়।’
মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ পুরো প্রক্রিয়া একদিনে পরিবর্তনযোগ্য নয়, বরং ধীরে ধীরে সময় নিয়ে গড়ে তোলার একটি প্রশাসনিক বাস্তবতা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের কাঠামোগত সংকট দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও কমিশন গঠন করলেও কার্যকর পরিবর্তন আসেনি।
বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ব্রিটিশ আমলে গঠিত অভিজাত কাঠামোর ধারাবাহিকতা বহন করছে। ১৯৭২ সালের সংস্কার প্রস্তাবে জনমুখী প্রশাসনের কথা থাকলেও সে সময়ের আমলাদের প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতায় তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে জিয়াউর রহমানের সময়ে প্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেয়া হয়। এতে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও তা পরবর্তীকালে স্থায়ী হয়নি। পরবর্তী শাসকের আমলে পুরনো ধারা ফিরে আসে। ক্ষমতা ধরে রাখতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রশাসন ও সামরিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করেন। গণতান্ত্রিক আমলে বিভিন্ন সরকার প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি গঠন করলেও সেগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে জনপ্রশাসন সংস্কারে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনও আসেনি।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসন টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে প্রশাসন—এমন অভিযোগ এসেছে বিভিন্ন মহল থেকেই। একই সঙ্গে বড় প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও ওঠে সে সময়ের প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে বিদেশে সম্পদ গড়া, বিনিয়োগ ও পরিবারের বসবাসসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক খাতে। ফলে জনপ্রশাসনে দক্ষতা ও সেবামুখী সংস্কৃতির ঘাটতি তৈরি হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা দেখায়, ভালো রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও একটি দক্ষ জনপ্রশাসন যখন অভিন্ন লক্ষ্যে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে, তখনই জনগণের জন্য কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যায়। শক্তিশালী নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি জনমুখী প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব, যা সংকটকালেও দ্রুত ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম। রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যকর আমলাতন্ত্র অপরিহার্য। এজন্য কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা, বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অর্থনীতি-ভূরাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। এ কমিশন ২০৮টি সুপারিশসহ সরকারের কাছে প্রতিবেদন পেশ করে। এর মধ্যে আশু বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল ১৮টি সুপারিশ। পরে তার মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত সহজে বাস্তবায়নযোগ্য আটটি প্রস্তাব বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন করা হয়েছে মাত্র তিনটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদিক হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার বারবার আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগই কার্যকর হয়নি। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র নিজস্ব একটি শক্তিশালী কাঠামো ও স্বার্থ নিয়ে পরিচালিত হয়। এ কাঠামো স্বাভাবিকভাবেই এমন কোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করে, যা তাদের বিদ্যমান ক্ষমতা, প্রভাব বা সুবিধা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে রাজনৈতিকভাবে চাপ প্রয়োগ করে বা আমলাতন্ত্রকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে সংস্কার আনার চেষ্টা করলে তা সাধারণত সফল হয় না। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক সরকারকে শেষ পর্যন্ত আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই সংস্কার সফল করতে হলে তাদের অংশীদার করে, সঙ্গে নিয়েই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চালাতে হয়।’
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে আমলাতন্ত্র কেবল প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবেই থাকেনি; বরং তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি নির্ধারক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে মনে করেন গবেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। নীতিনির্ধারণ থেকে বাস্তবায়ন—সব ক্ষেত্রেই প্রশাসনের ভূমিকা ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এ কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে একটি শক্তিশালী কিন্তু একই সঙ্গে অতিকেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক বলয় তৈরি হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের এ অবস্থা ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য সহজ হবে না। কারণ চ্যালেঞ্জটি শুধু প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে আনা নয়, বরং সেটিকে পুনর্গঠন করা, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনা আরো গতিশীল ও সেবামুখী করা যায়। প্রশাসন যদি নাগরিক সেবার বদলে নিয়ন্ত্রণের কাঠামো হিসেবেই কাজ করে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনও মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারে না। ফলে বর্তমান সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জটি দ্বিমুখী—একদিকে শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে পরিবর্তন আনা, অন্যদিকে সেই কাঠামোকে এমনভাবে রূপ দেয়া, যাতে তা রাষ্ট্রের গতিশীলতা ও নাগরিক সেবাকে অগ্রাধিকার দেয়।
জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমলাতন্ত্রকে পুরোপুরি রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছিল। সেখানে মেধাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, যার প্রভাব আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’
মেরিটোক্রেসিকে প্রাধান্য দেয়া নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পোস্টিং, প্রমোশন বা নিয়োগ—কোনোটাই যেন প্রভাবান্বিত না হয়, সেটাই আমাদের মূল পরিকল্পনা। নিয়োগের সময় থেকেই মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। মেরিটোক্রেসি অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা তা বোঝারও উপায় আছে। যেমন যদি তালিকায় যোগ্য কাউকে বাদ দিয়ে কম যোগ্য কাউকে নেয়া হয়, তাহলে বোঝা যাবে যে মেধার নীতি মানা হচ্ছে না। অর্থাৎ যাচাইয়ের জন্য একটি স্পষ্ট মানদণ্ড থাকতে হবে।’
জনপ্রশাসন উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘আগের সময়ে প্রশাসনে যে অবস্থা ছিল, তা মূলত দলীয়করণ—সবকিছুই রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে ছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রশাসন গড়ে তোলা সহজ নয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করাও কঠিন। এটা এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে সমস্যা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে গেলে পুরো কাঠামোটাই নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তার পরও আমাদের এগোতে হচ্ছে। কারণ সবাই খারাপ নয়; এ ব্যবস্থার ভেতরে থেকেই কাজ করতে হবে। আমরা সবাই এ দেশেরই মানুষ। অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এটি খুবই কঠিন কাজ, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য একটাই—জনগণের কল্যাণ। সবশেষে জনগণের স্বার্থই আমাদের মূল ফোকাস।’