আফসানা রাখি, বয়স ৩৫ বছর। একটি বিপনী প্রতিষ্ঠানে ক্যাশিয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন। বছরের অধিকাংশ সময়ই মাথা ঝিমঝিম, দুর্বলতা, খাবারে অরুচি আর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন। ঋতুস্রাব ছাড়াই হঠাৎ একদিন রক্তক্ষরণ, জরুরিভিত্তিতে ভর্তি হন রাজধানীর নামীদামী এক বেসরকারি হাসপাতালে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে তিনি রক্তশূন্যতায় ভুগছেন। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে জানতে পারেন, তিনি এন্ডোমেট্রিওসিস নামের জরায়ুর অতি বেদনাদায়ক ও জটিল রোগে ভুগছেন। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অনিয়মিত ঋতুস্রাবের পাশাপাশি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণজনিত সমস্যায় ভোগেন।
আফসানা রাখির মত শহুরে উচ্চশিক্ষিত নারীর পাশাপাশি গ্রামের সাধারণ নারীরাও এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। পলিমেনোরিয়া, এন্ডোমেট্রিওসিস, ডিইউবির মতো স্ত্রীরোগে রক্তক্ষরণের পরিমাণ বেড়ে যায়। আর এতে দেশে রক্তশূন্যতায় ভোগা নারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া হলো রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যাওয়া। বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।
মূলত প্রতি মাসে ঋতুস্রাব, ল্যাকটেশন বা মাতৃদুগ্ধ উৎপাদন প্রক্রিয়া ও গর্ভধারণের কারণে নারীদের রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, ১৫-৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৩০ শতাংশ এবং ৩৭ শতাংশ গর্ভবতী নারীর রক্তশূন্যতা থাকে।
জাতীয় পুষ্টি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ঋতুকালীন বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হওয়ার হার ২৯ শতাংশ। আর গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে ৩৭ শতাংশ। গ্রাম ও শহরে বসবাসকারী নারীর রক্তশূন্যতার মধ্যেও পার্থক্য আছে। শহুরে নারীর ৩১ শতাংশ এবং গ্রামীণ নারীর ৪৪ শতাংশ রক্তশূন্যতায় ভোগে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, মানুষের শরীরের রক্তে লোহিতকণিকা নামে এক ধরনের কোষ রয়েছে। এ কোষে হিমোগ্লোবিন নামের একটি বিশেষ পদার্থ আছে। হিমোগ্লোবিনের লৌহ ও প্রোটিন দ্বারা তৈরি। রক্তে হিমোগ্লোবিন, বিশেষ করে হিম বা লৌহ কমে যাওয়াকে রক্তস্বল্পতা, রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া বলে। প্রকৃতিগতভাবে পুরুষের তুলনায় নারীর শরীরে হিমোগ্লোবিন কিছুটা কম থাকে।
তিনি বলেন, নারীর রক্তশূন্যতার প্রধান কারণ মাসিক ঋতুস্রাব। প্রতিটি ঋতুস্রাবের সময় সাধারণত ৩৫-৪৫ মিলি রক্ত শরীর থেকে বের হয়। তবে এর পরিমাণ ৮০ মিলি পর্যন্ত হতে পারে। এ ক্ষতিপূরণে নারীকে অতিরিক্ত আয়রনযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত। গর্ভবতী নারীর শরীরে রক্তের পরিমাণ বেড়ে যায় ফলে বাড়তি আয়রনের প্রয়োজন হয়। সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়কালে মায়ের শরীরে অতিরিক্ত আয়রনের দরকার হয়। এছাড়া - থ্যালাসেমিয়ার মতো হিমোগ্লোবিনজনিত অসুখে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। আমাদের পরিবারগুলোয় নারীর পুষ্টির বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। নারীর রক্তশূণ্যতার এটাও একটি অন্যতম কারণ। রক্তশূন্যতা ও এর জটিলতা এড়াতে হলে নারীকে আয়রন সমৃদ্ধ পুষ্টিকর ও সুষম খাবার দিতে হবে। নারীর যেকোন রোগের দ্রুত চিকিৎসা করাতে হবে। মাঝে মাঝে কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়াতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক, মেডিকেল সাব-সেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য প্রকল্পসহ সব ধরণের সাধারণ হাসপাতালে গর্ভবতী নারীকে আয়রন ট্যাবলেট বিনামূল্যে দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
নারীর স্বাস্থ্য বিশেষ করে গর্ভকালীন স্বাস্থ্যের বিষয়ে মানুষের সচেতনতা ক্রমশ বাড়ছে। তবে দারিদ্র্য ও কুসংস্কারের কারণে এখনো অনেক নারী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যায় না। এজন্য জনসচেতনতা জরুরি।
এ বিষয়ে গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. ইসরাত জাবীন বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরির কাঁচামাল আয়রন কমে গেলে আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতা হতে পারে। এছাড়া ভিটামিন বি ও ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি, দীর্ঘমেয়াদি রোগ, ক্যান্সার, অস্থিমজ্জার সমস্যা, থাইরয়েডের সমস্যা, সময়ের আগে রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়া বা থ্যালাসেমিয়া ইত্যাদি কারণে রক্তশূন্যতা হয়ে থাকে।’
তিনি বলেন, যদি এ অতিরিক্ত পুষ্টির চাহিদা পূরণ না হয়, তাহলে মা ও শিশু দুজনের জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। এ ছাড়া অপুষ্টি, কৃমি সংক্রমণ, দীর্ঘ মেয়াদে ব্যথার ওষুধ সেবনে পাকস্থলীতে ক্ষত, জরায়ুর টিউমার, কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে পায়খানার সঙ্গে রক্তক্ষরণ, পাইলসসহ নানা কারণে আয়রনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
গর্ভাবস্থায় ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি হয় এবং তা সাপ্লিমেন্ট হিসেবে খাওয়া উচিত। ফলিক অ্যাসিড পাওয়া যায় সবুজ ও রঙিন শাকসবজিতে। আমাদের দেশের অনেক নারী জানেন না যে তাদের মৃদু ধরনের জিনগত রক্তরোগ যেমন থ্যালাসেমিয়া বা হিমোগ্লোবিন ই ট্রেইট আছে কিনা। নারীদের হিমোগ্লোবিন একটু কম থাকে।
হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস নামে পরীক্ষা করলে রক্তশূন্যতা শনাক্ত করা যায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তিবোধ, ত্বক ও ঠোঁট ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা বা শ্বাসকষ্ট হওয়া ইত্যাদি রক্তশূন্যতার লক্ষণ। রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হলে প্রথমে জানতে হবে এটি কতটা তীব্র। এরপর নেপথ্য কারণ খুঁজে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
রক্তশূন্যতা এড়াতে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। কচু ও কচুশাক, পালংশাক, কলিজা, কাঁচা কলা ও খেজুরে প্রচুর পরিমাণ আয়রন থাকে। তবে অনেক সময় খাবারের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ না হলে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্লাড ট্রান্সফিউশন বা রক্ত সঞ্চালন করাও লাগতে পারে।
‘বাংলাদেশে পুষ্টি খাতে বিনিয়োগ : প্রয়োজনীয়তা, চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ’ শিরোনামে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভার আলোচনায় উঠে আসে, দেশে শৈশবকালীন অপুষ্টি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে। গত এক দশকে পুষ্টি খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও খর্বকায় ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পঞ্চম স্থানে বাংলাদেশ। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত আর নেপালের পর বাংলাদেশ। কিশোরী মেয়েদের গর্ভধারণের হারের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। প্রতি হাজারে ১১৩ জন কিশোরী ১৯ বছর বয়সের আগে মা হচ্ছে। এসব বিষয় দেশে অপুষ্টিজনিত বড় বোঝা তৈরি করছে।
নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিশু, কিশোরী ও নারীদের মধ্যে খর্বকায় ও রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে বিনিয়োগ বাড়ালে বাংলাদেশ কমপক্ষে ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বাঁচাতে পারে, যা দেশের মোট দেশজ আয়ের (জিএনআই) ২ দশমিক ৮ শতাংশ। পুষ্টি শুধু স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে না, এটা অর্থনৈতিক উৎপাদন, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নেও প্রভাব ফেলে। তাই পুষ্টির বিষয়টি অন্যান্য খাতের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কৈশোরকালীন পুষ্টি কার্যক্রমের আওতায় স্কুলপর্যায়ে ছাত্রীদের আয়রন ফলিক অ্যাসিড (আইএফএ) ট্যাবলেট বিতরণের লক্ষ্যে এ খাতে আলাদা বরাদ্দ রাখার ওপর জোর দেয়া হয়।