জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন খরচ বাড়ায় কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকামে চালের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের অন্যতম বৃহৎ এ চালের মোকামসংশ্লিষ্টরা জানান, ধান উৎপাদনের পর মাঠ থেকে মোকামে আনা, সেখান থেকে মিল পর্যন্ত পরিবহন, আবার প্রক্রিয়াজাত চাল দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ—এ সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপেই জ্বালানিনির্ভরতা রয়েছে। ফলে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো চেইনজুড়েই খরচ বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, দূরপাল্লার ট্রাক ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। আগে নির্দিষ্ট রুটে পরিবহন ব্যয় তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। এখন পরিবহন ব্যয় বাবদ দেড় হাজার থেকে শুরু করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। এ বাড়তি খরচ শুধু একবার নয়—ধান সংগ্রহ, মিল পর্যন্ত পরিবহন এবং পরে চাল সরবরাহ—প্রতিটি ধাপে আলাদাভাবে যুক্ত হচ্ছে। ফলে একটি চালের বস্তা বাজারে পৌঁছাতে যে মোট ব্যয় লাগে, তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন খরচের পাশাপাশি লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনাকেও ব্যাহত করছে। ট্রাকের সংখ্যা কমে যাওয়া, ভাড়ার দরকষাকষি বেড়ে যাওয়া এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহে বিলম্বের কারণে বাজারে সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব হিসেবে অনেক ব্যবসায়ী আগাম বেশি দামে চাল কিনে মজুদ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যাতে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবেলা করা যায়। এতে বাজারে একদিকে কৃত্রিম সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে, অন্যদিকে ভোক্তা পর্যায়ে চালের দাম বাড়ার সম্ভাবনাও জোরালো হচ্ছে।
মোকাম ঘুরে দেখা গেছে, নতুন বোরো ধানের দর তুলনামূলক কম থাকলেও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা বাড়তি খরচের মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে ধান এনে কুষ্টিয়ার মিলগেটে পৌঁছাতে এখন আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে নেত্রকোনা থেকে কুষ্টিয়ার খাজানগরে এক ট্রাক ধান আনতে আগে যেখানে খরচ হতো প্রায় ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা, সেখানে এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকায়।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তাদের হিসাব অনুযায়ী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাবে শুধু পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণেই প্রতি মণে প্রায় ৩৪ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হচ্ছে, যা সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। আগে যেখানে প্রতি মণ চাল উৎপাদনে মোট খরচ ৪০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হতো, বর্তমানে তা বেড়ে ৪৩ থেকে ৪৫ টাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। এ বাড়তি খরচ এককভাবে কোনো একটি ধাপে নয়, বরং ধান সংগ্রহ, মিল পর্যন্ত পরিবহন, প্রক্রিয়াকরণ শেষে বাজারজাত—প্রতিটি স্তরেই পরিবহননির্ভর ব্যয় বৃদ্ধির ফলে যুক্ত হচ্ছে। ফলে মিল মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে এ অতিরিক্ত ব্যয় ধীরে ধীরে বাজারমূল্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সামনে চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে গিয়েই বেশি প্রভাব ফেলবে।
এ অবস্থায় খাজানগর মোকামে নতুন ধানের সরবরাহ শুরু হলেও বাজারে সতর্কতা দেখা যাচ্ছে। মিল মালিকরা বলছেন, বর্তমানে সরু, মাঝারি ও মোটা—সব ধরনের চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও খরচের চাপ ভবিষ্যতে দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
খাজানগরে নতুন মোটা জাতের ধান মণপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকার মধ্যে। মিলগেটে আনতে খরচসহ দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত। পুরনো সরু ধান ১ হাজার ২৮০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর মাঝারি ও মোটা জাতের ধান ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে।
চালের বাজারেও কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে। মিলগেটে সরু চাল প্রতি কেজি প্রায় ৭০ টাকা, মাঝারি জাত ৫৮-৬০ টাকা এবং মোটা চাল ৪৩-৪৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হাসকিং মিল মালিকরা বলছেন, ‘শুধু ডিজেল নয়—বিদ্যুৎ ও শ্রমিক ব্যয়ও বাড়ছে, যা মোট উৎপাদন খরচে চাপ সৃষ্টি করছে। কুষ্টিয়া চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধান জানান, এক ট্রাক চাল ঢাকায় পাঠাতে আগে যে খরচ হতো, এখন তার চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা বেশি লাগছে।
অন্যদিকে মিলাররা আশঙ্কা করছেন, নতুন ধান পুরোপুরি বাজারে এলে এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরো চাপ তৈরি করলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে চালের দামে বাড়তি প্রভাব পড়তে পারে।
দেশ এগ্রো ফার্ম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল খালেক জানান, তারা এখনো চালের দাম বাড়াননি। তবে প্রতি মুহূর্তে চাপ অনুভব করছেন। কারণ ধান ও চালের পরিবহন খরচ বেড়েছে।
খাজানগর মোকাম থেকে প্রতিদিন দেড় থেকে ২০০ ট্রাক চাল দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। একই সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল থেকেও ধান আসে এ বাজারে। ফলে পরিবহন ব্যয়ের যেকোনো পরিবর্তন সরাসরি পুরো জাতীয় চাল সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। খাদ্য বিভাগ এরই মধ্যে তেলের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগে কেউ যেন বাজারে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মজুদ তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে তদারকি জোরদার করেছে বলে জানা গেছে।