অস্থায়ী বা আউটসোর্সিংয়ের জনবল দিয়ে কাজ চলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও এর অধীন ২২টি জাদুঘরে। এসব জাদুঘরের গ্যালারি, নিদর্শন স্টোর, নিরাপত্তা চেকপোস্টসহ প্রায় সব ধরনের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে রয়েছে অস্থায়ী জনবল। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া এসব জনবল প্রত্নবস্তুর নিরাপত্তায় ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে সংসদীয় কমিটি।
জাতীয় জাদুঘরসহ ২২টি জাদুঘর ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহামূল্যবান নিদর্শনগুলো চুরি, হারানো বা নাশকতার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য গ্যালারি, নিদর্শন স্টোর, নিরাপত্তা চেকপোস্টের বিভিন্ন পদে আউটসোর্সিংয়ের বদলে স্থায়ী লোক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এসব পদে ডিজিটাল সিস্টেমের সক্ষমতা গড়ে তুলতে বলেছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সেই সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রতিবেদন সংসদীয় কমিটির গত মার্চের বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বলা হয়, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও এর
আওতাধীন ২২টি জাদুঘরে একাধিক স্টোরে অসংখ্য মূল্যবান বস্তু রক্ষিত আছে। ২২টি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে নির্বাচিত মূল্যবান প্রত্নবস্তু নিয়মিত প্রদর্শিত হচ্ছে। এসব প্র্রত্নবস্তুর নিরাপত্তার জন্য জাদুঘরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ করা হলে তা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কাজেই জাদুঘর বা প্রত্নস্থলগুলোয় রক্ষিত মূল্যবান প্রত্নবস্তুর নিরাপত্তার স্বার্থে আউটসোর্সিং নীতিমালা অনুযায়ী আউটসোর্সিংয়ের পরিবর্তে আগের ধারাবাহিকতায় সরাসরি জনবল নিয়োগের বিষয়ে অর্থ বিভাগের অনুমতির জন্য গত ১৬ মার্চ সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠানো হয়। মূল্যবান প্রত্নবস্তুর নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদে ডিজিটাল সিস্টেমের সক্ষমতা গড়ে তোলার কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে।
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত জনবল অস্থায়ী কর্মচারী বিধায় স্থায়ী কর্মচারীর মতো দায়িত্বে একনিষ্ঠ ও নির্ভরশীল হন না। এজন্য মহামূল্যবান নিদর্শনগুলো চুরি, হারানো কিংবা নাশকতা সৃষ্টির আশঙ্কা থেকে যায়। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মূল্যবান জাতীয় সম্পদের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংরক্ষণ করা কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বা অন্য কোনো মাধ্যমে অস্থায়ীভাবে নিয়োগকৃত জনবলের ওপর নির্ভর করে এ প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম যেমন গ্যালারিতে প্রদর্শিত মূল্যবান নিদর্শনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, স্টোরে নিদর্শন সংরক্ষণকাজে সহায়তা প্রদান, নিরাপত্তা চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন ইত্যাদি পরিচালনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জাদুঘরে রক্ষিত শত শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে একটি নিদর্শনও চুরি বা খোয়া গেলে তা রাষ্ট্রের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
জানা গেছে, জাতীয় জাদুঘর এবং শাখা জাদুঘরগুলোর নিদর্শন গ্যালারি নিদর্শন স্টোর এবং সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য নিরাপত্তা প্রহরী এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী (নিদর্শন স্টোর ও নিদর্শন গ্যালারির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কাজে নিয়োজিত) পদগুলো আউটসোর্সিংয়ের পরিবর্তে আগের ধারাবাহিকতায় সরাসরি জনবল নিয়োগের অনুমতির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত ৯ জানুয়ারি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পত্র দেয়া হয়। পরে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয় গত ৮ ফেব্রুয়ারি। সেই চিঠির উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
আউটসোর্সিংয়ে জনবল নিয়োগের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও। সেই বৈঠকে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবুল মনসুর জানান, জাদুঘরগুলোতে সংরক্ষিত রাষ্ট্রীয় মহামূল্যবান প্রত্নবস্তুর সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের গুরুত্ব বিবেচনায় আউটসোর্সিংয়ের স্থলে স্থায়ী জনবল নিয়োগের সম্মতি চেয়ে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থ সংকুলানের বিভিন্ন নাজুক পরিস্থিতি উল্লেখ করে এ বিষয়ে যৌক্তিকতাসহ পুনরায় প্রস্তাব পাঠানোর অনুরোধ করেছে।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আসাদুজ্জামান নূর এমপি বলেন, ‘কর্মচারী
নিয়োগে অর্থ মন্ত্রণালয় আউটসোর্সিংয়ের বিষয়ে অনড়। অথচ জাদুঘরের মহামূল্যবান জিনিসপত্র সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে আউটসোর্সিং কর্মচারীর মাধ্যমে নিরাপত্তা প্রদান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ—এ বিষয়টি কোনোক্রমেই অর্থ মন্ত্রণালয়কে বোঝানো যাচ্ছে না।’ তাই রাষ্ট্রের এ গুরুত্বপূর্ণ মহামূল্যবান প্রত্নবস্তু যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে ঝুঁকি এড়াতে এসব পদের কর্মচারী স্থায়ীভাবে নিয়োগের জন্য বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে নেয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।
এ বিষয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাপতি সিমিন হোসেন রিমি বলেন, ‘জাতীয়
জাদুঘরের মহামূল্যবান প্রত্নবস্তুর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় স্থায়ী জনবল নিয়োগ করা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয়
গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলো খোয়া যাওয়া, চুরিসহ নিরাপত্তা ঝুঁকির উল্লেখ করে চিঠি দেয়ার পরও আর কী বড় যৌক্তিকতা হতে পারে তা কমিটির কাছে বোধগম্য নয়।’ তাই রাষ্ট্রীয় মহামূল্যবান প্রত্নবস্তুর সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের গুরুত্ব বিবেচনায় এসব পদে স্থায়ী জনবল নিয়োগের বিষয়টি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।