পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলে বাস্তবায়ন হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় ‘ক্যাপিটাল ড্রেজিং’ প্রকল্প। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ঋণ নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সরকার। চ্যানেলটির খননকাজ শেষ করে গতকাল তা পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছে বেলজিয়ামভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘জান ডে নুল’। চুক্তি অনুযায়ী, আরো এক বছর চ্যানেলটির রক্ষণাবেক্ষণকাজ করবে তারা। এসব কাজের বিল বাবদ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গত ফেব্রুয়ারিতে ১৭০ মিলিয়ন ইউরো বা ১৮৩ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণচুক্তি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে আরো প্রায় ২৭৭ মিলিয়ন ইউরো। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এমনিতেই ধারাবাহিকভাবে কমছে। সেই রিজার্ভ থেকে রাবনাবাদ চ্যানেল খননকাজের মতো ‘অলাভজনক’ প্রকল্পের অর্থ পরিশোধ চলমান সংকটকে আরো প্রকট করে তুলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পায়রা বন্দরকে ঘিরে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বড় লজিস্টিক হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল সরকারের। তবে ভৌগোলিক অবস্থান ও রক্ষণাবেক্ষণের বাড়তি ব্যয় বিবেচনায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রকল্পটি থেকে ২০২১ সালে সরে আসে সরকার। এ বন্দর যেখানে অবস্থিত, সেখান দিয়ে প্রতি বছর উজান থেকে আসা বিপুল পরিমাণ পলি প্রবাহিত হয়। এজন্য নিয়মিত ড্রেজিং ছাড়া বন্দরটি চালু রাখা কঠিন। আবার নিয়মিত ড্রেজিংয়ের কাজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এমন প্রেক্ষাপটে পায়রা বন্দরে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কম বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
২০২১ সালের মার্চে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ‘বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল (বিআইডিএফ)’ নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলে সরকার। এখন পর্যন্ত শুধু পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও মেইনটেন্যান্স শীর্ষক প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে এ সংস্থা। এজন্য একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করে সরকারের অর্থ বিভাগ, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সোনালী ব্যাংক। চুক্তি অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে তিন বছরে ৫২৪ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ইউরো ঋণ দেয়া হবে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষকে। ২ শতাংশ সুদে সাত বছরে এ ঋণ পরিশোধ করা হবে। সুদের ১ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাকি ১ শতাংশ সোনালী ব্যাংকের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, রাবনাবাদ চ্যানেল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণকাজের জন্য গত ফেব্রুয়ারিতে ১৭০ মিলিয়ন ইউরোসহ এখন পর্যন্ত মোট ২৪৭ মিলিয়ন ইউরো পরিশোধ করা হয়েছে। পরিশোধ করতে বাকি রয়েছে আরো ২৭৭ মিলিয়ন ইউরো।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের প্রধান অনুষঙ্গ দুটি। এর মধ্যে শুধু রাবনাবাদ চ্যানেল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণকাজের খরচ প্রায় ৫ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। অবশিষ্ট টাকায় একটি হপার ড্রেজার, একটি পাইলট ভেসেল ও একটি সার্ভে ভেসেল কেনাসহ প্রকল্পের আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্বাহ করা হচ্ছে।
চ্যানেল খননের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে পায়রা বন্দর অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে দাবি করেছেন পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল। গতকাল পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, ‘পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং প্রকল্পটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এককভাবে সবচেয়ে বড় প্রকল্প, যা বন্দর কর্তৃপক্ষ সফলভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। এর মাধ্যমে চ্যানেলের গভীরতা ১০ দশমিক ৫ মিটারে উন্নীত হয়েছে। পায়রা বন্দর এখন দেশের গভীরতম সমুদ্রবন্দর। এর ফলে ২২৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩২ মিটার প্রস্থের বড় জাহাজ ৪০-৫০ হাজার টন পণ্য নিয়ে সরাসরি পায়রা বন্দরে ভিড়তে পারবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যাপক প্রসার ঘটানো সম্ভব হবে।’
বন্দর চেয়ারম্যান উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে আশার কথা শোনালেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন ভিন্ন কথা। অর্থনৈতিক সংকটের এ সময়ে রাবনাবাদ চ্যানেল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণকাজের জন্য রিজার্ভ থেকে মোটা অংকের অর্থ খরচের পর চ্যানেলটি অর্থনৈতিকভাবে কতটুকু সফলতা বয়ে আনতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা।
সাধারণত এক হাজার টিইইউএস কনটেইনারবাহী একটি জাহাজের জন্য বন্দর চ্যানেলের গড় গভীরতা থাকতে হয় ৮ দশমিক ৭ মিটার। চার হাজার টিইইউএস কনটেইনারবাহী জাহাজের জন্য বন্দর চ্যানেলের ১২ দশমিক ৫ মিটার গড় গভীরতা প্রয়োজন হয়। ‘খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের গড় গভীরতা সাত থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৫ মিটারে উন্নীত করা হয়েছে। তবে পলি জমার কারণে এরই মধ্যে এ গভীরতায় তারতম্য হচ্ছে।
রাবনাবাদ চ্যানেলের গভীরতা নিয়ে কর্তৃপক্ষের জরিপেও চ্যানেলটির গভীরতার অস্থিতিশীলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। ‘রাবনাবাদ চ্যানেলের (মূল) ড্রাফট চার্ট, জুন ২০২৩’-এর তথ্য বলছে, ২৪ মার্চ চ্যানেলটির গভীরতা ছিল ১০ দশমিক শূন্য ২ মিটার। গতকাল তা ৯ দশমিক ৭ মিটারে নেমে এসেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলন বলছে, এ গভীরতা ৩১ মার্চ নাগাদ ৯ দশমিক ২ মিটারে নেমে আসবে। এপ্রিল, মে ও জুনেও চ্যানেলের গভীরতা নয় থেকে সাড়ে ১০ মিটারের মধ্যে ওঠানামা করবে। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, রাবনাবাদ চ্যানেলের এ গভীরতা পাওয়া যাবে কেবল জোয়ারের সময়। ভাটার সময় গভীরতায় তারতম্য হতে পারে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘জান ডে নুল’র সঙ্গে রাবনাবাদ চ্যানেলটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চুক্তি রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষের। এরপর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হলে পলি জমে চ্যানেলের গভীরতা আবার কমে আসার শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত ড্রেজিং ছাড়া বন্দরটি চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বন্দরের নাব্যতা ধরে রাখতেই প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে। এমন প্রেক্ষাপটে বন্দরটি অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেল খনন প্রকল্পটিকে সরকারের অদূরদর্শী প্রকল্পগুলোর একটি বলে উল্লেখ করে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্পগুলো আমাদের অনেকটা শ্রীলংকার মতো পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় করতে হচ্ছে। এ বিশাল ব্যয় বহন করার কোনো দরকারই ছিল না। এ ধরনের কিছু প্রকল্পের কারণে আমাদের চলমান ডলার সংকট আরো দীর্ঘায়িত হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘রাবনাবাদ চ্যানেল খননের জন্য এরই মধ্যে রিজার্ভ থেকে বেশকিছু টাকা বিআইডিএফের মাধ্যমে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেয়া হয়েছে। এখন কিন্তু রিজার্ভ থেকে নতুন করে এ প্রকল্পে টাকা দেয়ার সক্ষমতা সরকারের খুব একটা নেই। কারণ রিজার্ভের পরিমাণ অনেক কমে এসেছে। এখন সরকার হয়তো ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে বা মার্কেট থেকে ডলার কিনে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করবে।’
যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, রিজার্ভ থেকে রাবনাবাদ চ্যানেলের জন্য অর্থছাড়ের সিদ্ধান্তের বিষয়টি সরকারের। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের করার কিছুই নেই। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মালিক সরকার। সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে চাইলে সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার ছাড় করতে বাধ্য। রিজার্ভ থেকে যেসব প্রকল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এর আগে হয়েছে, সেটি সরকারের প্রস্তাবের ভিত্তিতেই হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের খুব বেশি কিছু করার আছে বলে মনে হয় না।’