পূর্বাপর

ধনীরাই অর্থনীতির প্রধান সুবিধাভোগী

পাকিস্তানকেন্দ্রিক রাজনীতি-অর্থনীতি পাঠের বড় এক অধ্যায় গড়ে উঠেছে দেশটির বিশেষ রাষ্ট্রীয় সুবিধাপ্রাপ্ত অভিজাতদের নিয়ে। দেশটির করপোরেট খাতের রথী-মহারথী থেকে শুরু করে এ এলিটদের তালিকায় রয়েছেন সামন্তীয় ভূস্বামী, রাজনীতিবিদ ও সামরিক কর্মকর্তারাও। জাতিসংঘের গত বছর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দেশটির মোট জিডিপির ৬ শতাংশই রাষ্ট্রীয় সুবিধাপ্রাপ্ত অতিধনাঢ্যদের দখলে, যার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৪০ কোটি ডলারে।

১৯৪৭। ব্রিটিশ শাসনোত্তর পাকিস্তান। পূর্ব ও পশ্চিমাংশের মানুষের মধ্যে আশা-নিরাশার দোলাচল। ক্রমেই প্রকট হতে থাকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য। তারই অনিবার্য পরিণতি পাকিস্তানের ভাঙন। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তারপর পেরিয়েছে ৫০ বছর। স্বাধীনতা-উত্তর দুই দেশের বাস্তবতা বা পূর্বাপর বৃত্তান্ত। পর্ব-৪ 

পাকিস্তানকেন্দ্রিক রাজনীতি-অর্থনীতি পাঠের বড় এক অধ্যায় গড়ে উঠেছে দেশটির বিশেষ রাষ্ট্রীয় সুবিধাপ্রাপ্ত অভিজাতদের নিয়ে। দেশটির করপোরেট খাতের রথী-মহারথী থেকে শুরু করে এ এলিটদের তালিকায় রয়েছেন সামন্তীয় ভূস্বামী, রাজনীতিবিদ ও সামরিক কর্মকর্তারাও। জাতিসংঘের গত বছর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দেশটির মোট জিডিপির ৬ শতাংশই রাষ্ট্রীয় সুবিধাপ্রাপ্ত অতিধনাঢ্যদের দখলে, যার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৪০ কোটি ডলারে।

২২ কোটি জনসংখ্যার দেশ পাকিস্তানের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা ধরা হয় ক্রমবর্ধমান বৈষম্যকে। এর প্রধান কারণ হিসেবে এ রাষ্ট্রীয় সুবিধাপ্রাপ্ত এলিটদেরই দায়ী করছেন অর্থনীতিবদরা। জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের ক্ষমতাবানরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তাদের প্রাপ্যের চেয়েও বেশি আদায় করে নিচ্ছেন। এর বিপরীতে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য মোকাবেলায় দেশটিতে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো নীতি নেয়া যায়নি। উল্টো এসব নীতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ানোয় ভূমিকা রেখেছে।

বৈষম্যই পাকিস্তানকে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতাগুলোর মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছিল। একসময় দেশটিতে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় অর্থনীতি কুক্ষিগত হয়েছিল বহুল আলোচিত ২২ পরিবারের হাতে। অর্থনীতিতে তাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তত্কালীন পাকিস্তানের উভয় অংশে মারাত্মক বৈষম্যের জন্ম দিয়েছিল, যার সবচেয়ে বড় শিকার ছিল পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশের বাসিন্দারা।

একসময় পাকিস্তানের জন্মে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দারা। আবার ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের কারণে এ পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দারাই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়। অর্থনীতিতে বৈষম্যের কুফলগুলো স্পষ্ট করে তুলেছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দুই দেশই বৈষম্য মোকাবেলায় সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পথ বেছে নিয়েছিল। জাতীয়করণ করা হয়েছিল শিল্প-কারখানা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। অর্থনীতির প্রভাবক-নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা থেকে বিদায় নিয়েছিল সাবেকি অভিজাতরা। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল তাদের উত্থানের পথ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসন দুই দেশের রাজনীতি-অর্থনীতিতে অভিজাতদের নতুন করে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দেয়। নীতিনির্ধারণী জায়গায় থেকে রাষ্ট্রীয় নানা সুযোগ-সুবিধা কুক্ষিগত করে নেয় তারা। হয়ে ওঠে ধনী থেকে অতিধনী।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের শিল্প খাত সচল করার পাশাপাশি বৈষম্যের পথ রুদ্ধ করতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনে তার সে উদ্যোগ সফল হতে পারেনি। সামরিক শাসনামলে বিশেষ করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে একদল নতুন অভিজাত ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা শ্রেণীর উত্থান ঘটে। ক্ষমতা কাঠামোর অংশীদার হয়ে তারা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। দরিদ্রের পরিবর্তে অতিধনীরা রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হওয়ায় দিনে দিনে প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠতে থাকে বৈষম্য।

একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি দেখা যায় পাকিস্তানে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিপদ বুঝে দেশটির অর্থনীতিতে বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। শিল্প ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক জাতীয়করণের মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন তিনি। যদিও পরবর্তী সময়ে জেনারেল জিয়া-উল-হকের শাসনামলে আবারো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন একদল এলিট দেশটির রাজনীতি ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নেয়। এরপর পাকিস্তানে ক্ষমতার বারবার পালাবদল ঘটলেও এ অভিজাতরা বরাবরই সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেছে। তাদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে সম্পদ। এর বিপরীতে বৈষম্যের মাত্রাও ক্রমেই বেড়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাকিস্তানের মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ যায় দেশটির সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশের পকেটে। অন্যদিকে দেশটির সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশের মোট জাতীয় আয়ে ভাগ মাত্র ৭ শতাংশ।

দেশটিতে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পায় করপোরেট এলিটরা। কর থেকে শুরু করে সরকারের আমদানীকৃত কাঁচামাল সস্তায় সরবরাহ, উৎপাদিত পণ্যের বাড়তি মূল্য আদায়ের সুবিধা, ভূমি ও নানা সরকারি সেবায় অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকারসহ নানাভাবে সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে তারা। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) হিসাব অনুযায়ী, শুধু করপোরেট এলিটদের বছরে প্রায় ৪৭০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ পৃষ্ঠপোষকতা করছে পাকিস্তান সরকার। দেশটির মোট জাতীয় আয়ে সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের অংশ ৯ শতাংশ। দেশটির মোট জনসংখ্যায় সামন্ত ভূস্বামী পরিবারগুলোর অংশ মোটে ১ দশমিক ১ শতাংশ। ক্ষুদ্র এ অংশই আবার দেশটির মোট আবাদযোগ্য ভূমির ২২ শতাংশের মালিক। এ করপোরেট এলিট ও ভূস্বামীরাই এখন দেশটির আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণী জায়গা দখল করে রেখেছে। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে উভয় শ্রেণীরই শক্তিশালী উপস্থিতি দেখা যায়। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশই নির্বাচনে তাদের প্রার্থী বেছে নেয় সামন্ত ভূস্বামী বা করপোরেট এলিটদের মধ্য থেকে।

তবে দেশটির সুবিধাপ্রাপ্ত এলিটদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ধরা হয় সামরিক বাহিনীকে। পাকিস্তানের ৭৪ বছরের ইতিহাসে অর্ধেকেরও বেশি সময় দেশটি শাসন করেছে সেনাবাহিনী। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ভূমি, অর্থ ও অবকাঠামো খাতে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধার আকারে বছরে ১৭০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়। এর বাইরেও এলিট করপোরেট ও ভূস্বামীদের দেয়া সুযোগ-সুবিধারও বৃহদংশই যায় দেশটির সামরিক বাহিনীর পকেটে। এ বিষয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন হলো এলিট করপোরেট ও ভূস্বামীদের থেকে সামরিক বাহিনীকে আলাদা করা মুশকিল। কারণ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে বলা চলে দেশটির বৃহত্তম কনগ্লোমারেট। একই সঙ্গে পাকিস্তানের আবাসন খাতের সবচেয়ে বড় নির্মাতা, ঠিকাদার ও ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানও হলো সেনাবাহিনী। দেশটির বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প ও মেগা প্রজেক্টের সঙ্গেও সামরিক বাহিনী জড়িত।

পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রমেই বেড়ে চলা বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার এক দশক পার হতে না হতেই দেশের রাজনীতি-অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট অভিজাতদের প্রত্যাবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়। আশির দশকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যাপক বিরাষ্ট্রীয়করণ কর্মসূচি দেশে নতুন এক ধনাঢ্য ক্ষমতাশালী শ্রেণীর জন্ম দেয়।

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ দাতাগোষ্ঠীর উৎসাহে অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণহীন উদারীকরণের পথে নিয়ে গিয়েছিলেন এরশাদ। তার গৃহীত বিরাষ্ট্রীয়করণ কর্মসূচিও ছিল অবাধ, ব্যাপক ও নিয়ন্ত্রণহীন। ব্যক্তি খাতে ঋণের প্রবাহ হয়ে ওঠে অবাধ থেকে অবাধতর। নামমাত্র মূল্যে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা বাগিয়ে নেন ব্যবসায়ীরা। রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ আনুকূল্যকে কাজে লাগিয়ে উদ্ভব ঘটে নতুন এক ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তা অভিজাত সম্প্রদায়ের। এ অভিজাত শিল্পোদ্যোক্তা শ্রেণীর নেতৃস্থানীয়দের আবার নিজেদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল বেশি। বিভিন্ন ব্যবসা সংগঠনের শীর্ষ পদে উঠে আসার পাশাপাশি একপর্যায়ে সরকার, আইন ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে থাকেন তারা।

বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত পর্যবেক্ষণেও বলা হয়েছে, দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে অর্থের রাজনীতির উত্থান ঘটে আশির দশকের মাঝামাঝিতে এসে। দলীয় নীতিমালা এবং স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে অর্থ। টাকার বিনিময়ে দলীয় কমিটি ও জাতীয় সংসদে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখলের সুযোগ পায় নব্য ধনীরা। এ টাকার রাজনীতিকে কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী জায়গায় আধিপত্যশীল অবস্থান গড়ে তোলেন ব্যবসায়ীরা।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়ার সুফল ও কুফল দুটোই রয়েছে। এর সুফল হলো বিষয়টি পুঁজিবাদী উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। কুফল হলো এর ফলে ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও নানা সুবিধা নিতে পারেন, যা তাদের দ্রুত ফুলেফেঁপে ওঠার ক্ষেত্রে বড় সহায়ক ভূমিকা রাখে। এর বিপরীতে সমাজে প্রকট হয়ে উঠতে থাকে বৈষম্য।

বেসরকারি বিভিন্ন উৎসের তথ্য অনুযায়ী, এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ই রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই সময়ে সংসদে নির্বাচিত এমপিদের ৫৯ শতাংশেরও বেশি ছিলেন ব্যবসায়ী। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ হার কমে এলেও পরের নির্বাচনগুলোয় তা আবার বাড়তে থাকে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত এমপিদের মধ্যে ব্যবসায়ী ছিলেন সাড়ে ৫৩ শতাংশ। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ শতাংশে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নির্বাচিত এমপিদের মধ্যেও প্রায় ৬২ শতাংশই ব্যবসায়ী।

এরশাদের পতন হলে দীর্ঘদিন পর প্রথম কোনো সরকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা নেয় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। এর কিছুদিনের মধ্যেই সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের বিরোধিতামূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়। দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দুর্বলতা ও অদক্ষতার অভিযোগ তোলে সরকার। বলা হয়, এ দুর্বলতা ও অদক্ষতার কারণেই সরকারের দেয়া সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগাতে পারছে না ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে সরকারের বিরুদ্ধে শ্লথতা ও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তোলেন ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে আরো সক্রিয় করে তোলায় উদ্যোগী হন ব্যবসায়ী নেতারা। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ওই সময়েই প্রথম দেশের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের প্রভাবশালী হয়ে ওঠার বিষয়টি প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তাদের এ প্রভাব দিনে দিনে বেড়েছে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে বেড়েছে বৈষম্যের মাত্রাও।

প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসের ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাবের বৈশ্বিক অসমতা প্রতিবেদন ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত বছরেও দেশের মোট জাতীয় আয়ের ৪৪ শতাংশই ছিল শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনীর দখলে। এর মধ্যে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর আয় ছিল মোট জাতীয় আয়ের ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে মোট জাতীয় আয়ে পিছিয়ে থাকা ৫০ শতাংশ মানুষের অংশ ছিল ১৭ দশমিক ১ শতাংশ।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন আধিপত্য করছে ব্যবসায়ী সমাজ। বাংলাদেশে কয়েক হাজার অত্যন্ত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী তৈরি হয়েছে। সারা বিশ্বের মধ্যে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে গিয়েছে। ২০১২-১৭ সাল পর্যন্ত ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে এখানে ধনাঢ্য ব্যক্তি বেড়েছে। এখানে সরকারি সুযোগ-সুবিধা সব ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক কুক্ষিগত করেছেন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরাই বাংলাদেশের সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণী হয়ে গিয়েছেন, যার জন্য জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেও আমাদের আয়বৈষম্য অনেক বেড়ে গিয়েছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সুফল কয়েক হাজার ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদই কুক্ষিগত করে নিয়েছেন, যার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির যে সুফল পাওয়ার কথা ছিল, সেটি তারা পাচ্ছে না।

অন্যদিকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকেই দেশটিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা এলিটদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে দেখছেন তিনি। পাকিস্তান প্রসঙ্গে আলোচনায় ড. মইনুল ইসলাম বলেন, দেশটির জেনারেলরা কেবল সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায় নয়, অন্য সময়েও সেখানকার অর্থনীতির নানা জায়গায় ব্যবসা-বাণিজ্যে তারা প্রভাব বিস্তার করেছে। বলতে গেলে পাকিস্তানের পুরো রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকে অজগর সাপের মতো গিলে খাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী ও তাদের অফিসাররা।

এছাড়া সামরিক বাহিনীর পেছনে ক্রমবর্ধমান ব্যয় পাকিস্তানকে ক্রমেই পিছিয়ে দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে প্রতিরক্ষা খাতে মোট ব্যয় সরকারি ব্যয়ের দুই-আড়াই শতাংশ। পাকিস্তানে সেটি ৫-৬ শতাংশ। যে কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অন্য যেসব প্রয়োজনীয় খাত রয়েছে, সেখানে পাকিস্তান খুব একটা বিনিয়োগ করতে পারেনি। কারণ তাদের বাজেটের বড় অংশই সেনাবাহিনীর পেছনে ব্যয় করতে হয়। এখানেই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের একটা বড় ধরনের পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। গত ৩০ বছর পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পেছনে ইসলামাবাদের অসহনীয় ব্যয়ের বোঝা। এজন্য পাকিস্তানের অর্থনীতি ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরো পেছাবে।

আরও