দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনহীন বা লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মিল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্টের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রায় ৫০টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ৩৮-৪০টি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি মিল দ্রুত বেসরকারি অংশগ্রহণে পরিচালনার আওতায় আনার প্রস্তুতিও এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমি, অবকাঠামো, বিদ্যমান স্থাপনা ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরতে শুরু করেছে সরকার। যার অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সামনে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন শিল্পসম্পদে বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে উপস্থাপনা পেশ করা হয়েছে। একইভাবে শিগগিরই ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সামনেও রাষ্ট্রীয় মিলে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতাবিষয়ক তথ্য উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো।
বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী আর অর্থনৈতিকভাবে টেকসই অবস্থায় নেই। কয়েক দশক আগে প্রতিষ্ঠিত এসব মিল ও কারখানার বড় অংশ বর্তমানে উৎপাদনহীন অথবা সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে পুরনো কাঠামো ধরে রাখার পরিবর্তে নতুন বিনিয়োগ, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে এসব সম্পদকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনার কৌশল নিয়েছে সরকার।
বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় মিলগুলো যে উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়েছিল, যেসব আইটেম উৎপাদন হতো, ওই আইটেম চলবে না। কারণ এগুলোর ইকোনমিক লাইফ নেই। ৬০-৭০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়েছে। কোনো কোনো কারখানা গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে করা হয়েছে। অধিকাংশই ৬০ অথবা ৫০-এর দশকের মধ্যভাগে করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে এখন আমরা ফ্রেশ ইনভেস্টমেন্ট চাই। যার মাধ্যমে নতুনভাবে নতুন পণ্য উৎপাদন হবে। যে পণ্যই হোক যিনি বিনিয়োগ করতে আসবেন তিনি ঠিক করবেন কোন পণ্য উৎপাদন তার জন্য লাভজনক। দেশী-বিদেশী যেকোনো বিনিয়োগকারীদের জন্যই আমাদের উদ্যোগ। বিনিয়োগ হওয়া এবং সেখানে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, এগুলোই মূল বিবেচ্য বিষয়।’
প্রেজেন্টেশনে সরকারের হাতে যেসব মিল রয়েছে, সবগুলোর চিত্রই দেখিয়েছি উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এর মধ্যে শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা সবগুলোর কথাই বলা হয়েছে। পিপিপিসহ ভিন্ন মডেলে এবং যে প্রকল্পে যে ফরম্যাট প্রযোজ্য সেই অনুযায়ী বিনিয়োগ হতে পারে। আমাদের কাজটা হলো তাদের জানানো যে এই জিনিস আছে, এটাতে আসলে তোমাদের লাভ হবে। গ্রাউন্ডটা তৈরি করছি। এখন সরকারি পর্যায়ে করছি, পরে প্রাইভেট লেভেলে দেশের বাইরের যেসব চেম্বার আছে, ইনভেস্টর বডি আছে, সেগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করব।’
চীনা রাষ্ট্রদূতের সামনে উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, সরকার শুধু সাধারণভাবে বিনিয়োগ আহ্বান করছে না; বরং নির্দিষ্ট শিল্পসম্পদ ও প্রকল্পভিত্তিক বিনিয়োগ সুযোগ তুলে ধরছে। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতাধীন ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিল, করিম জুট মিল এবং চট্টগ্রামের আমিন জুট মিলকে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব মিলে বিদ্যমান অবকাঠামোর পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি এবং সড়ক ও নদীপথ সংযোগকে বড় সুবিধা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
উপস্থাপনায় এসব মিলকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরের সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে। পাটের পাশাপাশি বস্ত্র খাতেও বড় পরিসরে বিনিয়োগ আহ্বান করা হচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) আওতায় ১৬টি মিল পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী নির্বাচন করা হবে।
এছাড়া লিজ, বিক্রি ও যৌথ বিনিয়োগ—বিভিন্ন মডেলে মিল পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে, যেখানে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি, কর সুবিধা এবং নির্দিষ্ট গ্রেস পিরিয়ডের মতো প্রণোদনাও প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারি উপস্থাপনায় শুধু পাট ও বস্ত্রের পাশাপাশি রাসায়নিক, কাগজ, জ্বালানি, ব্যাটারি, গ্লাস ও লেদারসহ বহুমুখী শিল্প খাতেও বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) আওতায় কর্ণফুলী পেপার মিলসহ একাধিক শিল্প ইউনিটে যৌথ বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। এতে নতুন কাগজ, সোডা অ্যাশ, টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে বছরে প্রায় ২৭ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে।
খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস ও হার্ডবোর্ড মিলসের জায়গায় লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন কারখানা স্থাপন, চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে ক্লোর-অ্যালকালি শিল্প এবং আশুগঞ্জে সোলার গ্লাস ও প্যানেল উৎপাদনের মতো নতুন শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
একইভাবে বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) অধীনে বন্ধ ও চালু শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন এবং নতুন প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে পরিবেশবান্ধব স্টিল মিল, জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্প ও যানবাহন সংযোজন কারখানা অন্তর্ভুক্ত।
চিনি খাতেও বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের আওতায় ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ছয়টি বন্ধ রয়েছে এবং এসব মিল পুনরায় চালু করতে বিদেশী বিনিয়োগ আহ্বান করা হচ্ছে।
এছাড়া সিরাজগঞ্জে বিসিক শিল্প পার্কে ১৮০ একর জমিতে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিনোম্যাকের সহযোগী কোম্পানির বিনিয়োগ আগ্রহের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে, যা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের নতুন উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকারের হাতে থাকা মিল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একক কোনো মডেলে নয়, বরং সম্পদের ধরন ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে বিভিন্ন কাঠামোয় বিনিয়োগের আওতায় আনার চিন্তা করা হচ্ছে। কোনো ক্ষেত্রে পিপিপি, কোনো ক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগ, আবার কোনো ক্ষেত্রে জমি ভাগ করে বা খণ্ডভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হতে পারে। এসব বিষয় বাংলাদেশের একাধিক রাষ্ট্রদূতকে পর্যায়ক্রমে জানানো হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘আমার সঙ্গে যত অ্যাম্বাসেডর দেখা করতে এসেছেন, প্রত্যেককেই জানিয়েছি। কয়েকদিন পরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে আনুষ্ঠানিকভাবে আরেকটা প্রেজেন্টেশন দেব।’
মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই দেশে বিনিয়োগের একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে, যেখানে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা নিজেদের সুরক্ষিত ভাবতে পারবেন এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আকৃষ্ট হবেন। এর জন্য ব্যবসা সহজীকরণসহ অন্য প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে সামগ্রিক উদারীকরণ নিশ্চিত করা হবে। আমাদের সরকারি বন্ধ মিলগুলোর মধ্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা প্রকল্পগুলো দ্রুত বেসরকারি খাতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে কোনোটি চালু করার, আবার কোনোটির জন্য নতুন বিনিয়োগ আনার প্রচেষ্টা রয়েছে। বর্তমান পর্যায়ে মোট ৫০টি মিলের মধ্যে চালু করার জন্য আছে ৩৮-৪০টির মতো।’
এর মধ্যে অন্তত ছয়টি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে চলে যাবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘বছরখানেকের মধ্যে বাকি মিলগুলোর সবই বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া যেন শেষ করতে পারি, সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে। আর শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা প্রকল্পগুলো বেশ বড়। সার, চিনি, ইস্টার্ন কেবলের মতো বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোতে আমরা বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য চেষ্টা করছি। এর মধ্যে কিছু মিল নিয়ে চীনা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আছে। আমাদের এখানে সুগার মিল সুগারের ধারণা নিয়ে আর চালানো সম্ভব না। এটা লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ মিলে বিকল্প পন্থায় বেশি উৎপাদনের ধারণা নেয়া হয়েছে। সব মিল নিয়েই কাজ করছি আমরা।’
সরকারের এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে শুধু জমি বা অবকাঠামো প্রদর্শন যথেষ্ট হবে না। বিনিয়োগকারীরা সম্পদের আইনি অবস্থা, লিজের শর্ত, শ্রমিকসংক্রান্ত দায়, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেবেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি মনে করি এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। রাষ্ট্রীয় মিলগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই রক্তক্ষরণ করছে বছরের পর বছর। সাধারণভাবে এগুলো রি-ক্যাপিটালাইজেশন করা হলেও কোনো সুফল পাওয়া যায় না।’
রাষ্ট্রীয় মিলগুলোতে বিনিয়োগের মডেল ভিন্ন হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনোটির ক্ষেত্রে শেয়ার অফলোড করা, কোনোটির পিপিপি, কোনটি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রেখে স্বাধীন ব্যবস্থাপনায়, কোনটি হয়তো প্রাইভেটাইজেশন হতে পারে। কম্প্রিহেনসিভভাবে এগুলো চিন্তাভাবনা করে যে প্রকল্পের জন্য যে মডেল প্রযোজ্য হবে সেভাবেই করতে হবে। সতর্কতার বিষয় হলো এসব প্রকল্পের সঙ্গে অনেক জমি ও সম্পদ আছে। সেসব সম্পদের অপচয় যেন না হয় তাসহ এক খাতে বিনিয়োগের কথা বলে অন্য খাতে বিনিয়োগ যেন না হয়—এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যে মডেলে শিল্প-কারখানা চালু রাখা যাবে, সেটাই যেন করা হয় সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’