বিআইবিএমের গবেষণা

ঋণবঞ্চিত সিএমএসএমই খাতের ক্লাস্টার, থমকে আছে গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ

ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায় মোল্লারহাট ও সুবিদপুর ইউনিয়নে শীতলপাটি তৈরি শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৭০টি পরিবার। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন সময় তারা ব্যাংক ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করেও পাননি।

ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায় মোল্লারহাট ও সুবিদপুর ইউনিয়নে শীতলপাটি তৈরি শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৭০টি পরিবার। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন সময় তারা ব্যাংক ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করেও পাননি। এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে ঋণসহায়তার আশ্বাস দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত মেলেনি। ফলে ব্যবসার পরিধি তারা বাড়াতে পারেননি। জীবনমান ও আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হয়নি গুচ্ছভুক্ত (ক্লাস্টার) এ সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের।

গুচ্ছভুক্ত আরেকটি সিএমএসএমই খাত বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার তাঁত শিল্প। উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়নের শাঁওইল বাজারকে কেন্দ্র করে প্রায় চার দশক আগে গড়ে ওঠে এ শিল্প। ঝুট কাপড় থেকে সুতা তৈরি করে সেই সুতা দিয়ে সোয়েটার, মাফলার, চাদর, তোশকের কভারসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেন এ শিল্পসংশ্লিষ্টরা। তবে ঋণ না পাওয়ায় শিল্পের অনেকেই এখন ভিন্ন পেশায় রুটি-রুজি খুঁজছেন।

শুধু ঝালকাঠির শীতলপাটি কিংবা বগুড়ার তাঁত শিল্পই নয়। ঋণ না পাওয়ায় সিএমএসএমই খাতের গুচ্ছভিত্তিক অনেক প্রতিষ্ঠানই দাঁড়াতে পারছে না। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সিএমএসএমই খাতের মোট ঋণের অন্তত ১০ শতাংশ গুচ্ছভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিতে হবে। প্রতি বছর অন্তত ১ শতাংশ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের মধ্যে এ ঋণের আকার ১২ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সিএমএসএমই খাতের মাত্র ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ ঋণ গুচ্ছভুক্ত প্রতিষ্ঠানে দিয়েছে। ক্লাস্টারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ঋণবঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যও দিন দিন কমছে। যদিও সরকার রফতানি পণ্য বৈচিত্র্যকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ খাতের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বৃহৎ অংশই কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগনির্ভর (সিএমএসএমই)। এ উদ্যোগগুলোর মধ্যে কিছু পণ্য নির্দিষ্ট এলাকায় উৎপাদন হয়, যা সিএমএসএমই ক্লাস্টার বা গুচ্ছভুক্ত হিসেবে পরিচিত। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণকৃত ঋণের কত শতাংশ ক্লাস্টারভিত্তিক সিএমএসএমই খাত পাচ্ছে, সেটি নিয়ে একটি গবেষণাপত্র তৈরি করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক দেওয়ান আবদুল কাদের জিলানি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করা হয়।

‘‌ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন অব সিলেক্টেড এসএমই ক্লাস্টার: আ কেস স্টাডি অব লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং’ শিরোনামের ওই গবেষণায় দেখা যায়, দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ২ লাখ ৮৯ হাজার ৩৩টি সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ হাজার ৮৭৫টি প্রতিষ্ঠান ক্লাস্টারভিত্তিক, যা মোট সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠানের ১৬ দশমিক ২২ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুনে সিএমএসএমই খাতের মোট ঋণ স্থিতি ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ঋণ পেয়েছে ক্লাস্টারভিত্তিক শিল্প, যা মোট সিএমএসএমই ঋণের মাত্র ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ ক্লাস্টারভিত্তিক শিল্প সিএমএসএমই খাতের মোট প্রতিষ্ঠানের ১৬ শতাংশের বেশি হলেও ঋণ পেয়েছে ৬ শতাংশেরও কম।

ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, ক্লাস্টারভিত্তিক সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণের সক্ষমতা দেশের ব্যাংক খাতের নেই। ফলে এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এনজিও বা ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়। ক্লাস্টারভিত্তিক সিএমএসএমই খাত ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ পেলে সুদ কম হতো। এতে দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে সে ঋণ কাজে লাগত।

এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এনজিওগুলো ক্লাস্টারভিত্তিক সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বয় করে একজনকে দায়িত্ব দেয়। তারা ঋণ দেয়ার পর প্রতি সপ্তাহেই তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং ঋণের কিস্তি আদায়ে তাগাদা দেন। এ কারণে এনজিওগুলোর ঋণ আদায় পরিস্থিতিও ভালো হয়। কিন্তু ব্যাংকের পক্ষে ক্লাস্টারে ঋণ দেয়া খুবই কঠিন। কারণ দেশের অর্থঋণ আদালতে মামলা করতে হয় ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ক্লাস্টারের গ্রাহকদের বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ নেই। আবার ব্যাংক কর্মকর্তাদের পক্ষে এনজিওর মতো ঋণের তত্ত্বাবধান করাও বেশ কঠিন।’

তবে ক্লাস্টারভিত্তিক উদ্যোগের অনেক গ্রাহক এককভাবে ঋণ নিচ্ছেন বলে জানান মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, ‘আমি ভৈরবের জুতাসহ কিছু ক্লাস্টারে ঋণ বিতরণের জন্য কর্মকর্তাদের পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারা ফিরে এসে জানান, ওই ক্লাস্টারে থাকা ভালো উদ্যোক্তারা এরই মধ্যে কোনো না কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ পেয়েছেন। ক্লাস্টারভিত্তিক না হলেও ব্যাংকগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণ দিচ্ছে।’

২০২২ সালের আগস্টে জারীকৃত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সিএমএসএমই খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। গুরুত্বপূর্ণ এ খাতকে এগিয়ে নিতে গুচ্ছভিত্তিক অর্থায়ন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় একটি ধারণা। বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় গুচ্ছগুলো যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। এজন্য সিএমএসএমই খাতে গুচ্ছ ভিত্তিতে সহজে ব্যাংক ঋণ নিশ্চিত করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সিএমএসএমই খাতে যে ঋণ দেবে, প্রাথমিকভাবে তার ১০ শতাংশ গুচ্ছভিত্তিক হতে হবে। পরবর্তী সময়ে এ লক্ষ্যমাত্রার পরিমাণ প্রতি বছর কমপক্ষে ১ শতাংশ হারে বাড়িয়ে ২০২৪ সালের মধ্যে কমপক্ষে ১২ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।

বিআইবিএমের ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সিএমএসএমই খাতে মোট ঋণ বিতরণ করেছে ২ লাখ ৮৩ হাজার ২৩৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। যদিও এ সংখ্যা ২৫ শতাংশে উন্নীত করার নির্দেশনা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সিএমএসএমই খাতের ঋণ বিতরণের লক্ষ্য অর্জনেও দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। ২০২০ সালে এ খাতে ঋণ বিতরণের ৯০ দশমিক ২৫ শতাংশ অর্জন করতে পেরেছিল ব্যাংকগুলো। ২০২১ সালে এ হার ৮৫ দশমিক ৩৭ শতাংশে নেমে আসে। ২০২২ সালে আরো কমে তা ৮৪ দশমিক ৮৮ শতাংশে ঠেকে। ২০২৩ সালে এ অর্জন কিছুটা বাড়লেও তা ৮৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে আটকে যায়। এরপর ২০২৪ সালে এসে সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণ আবারো উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। গত বছর লক্ষ্যের ৭৯ শতাংশ ঋণও এ খাতে বিতরণ করতে পারেনি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

আরও