নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সমাগম ঘটানোর অভিযোগে বুয়েট শিক্ষার্থীদের একাংশ যে আন্দোলনে নেমেছে, তাতে বাঁকবদল হয়েছে। গতকাল আন্দোলনের তৃতীয় দিনের অবস্থান কর্মসূচি শেষ মুহূর্তে স্থগিত করেছেন শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা না মানার অভিযোগ যাদের কিরুদ্ধে, সেই ছাত্রলীগ গতকাল দলবল নিয়ে বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছে। এছাড়া ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে সমাবেশ করেছে তারা। তাদের এ দাবি মেনে নেয়ার আভাসও দিয়েছেন বুয়েট উপাচার্য। বলেছেন, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা চাইলে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির অনুমতি দেয়া হবে।’
২০১৯ সালে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে হত্যার ঘটনায় বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হয়। এ অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও দপ্তর সম্পাদকসহ কয়েকজন বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে রাজনৈতিক সমাগম ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ তোলে শিক্ষার্থীদের একাংশ। তাদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা লঙ্ঘন করে পুরকৌশল বিভাগের ২১তম ব্যাচের ছাত্র ইমতিয়াজ হোসেন রাহিম এ সমাগম ঘটিয়েছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার বিকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালকের (ডিএসডব্লিউ) কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে রাত পর্যন্ত বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। ওই রাতেই রাহিমের হলের আসন বরাদ্দ বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা বর্জন করে ছয় দফা দাবিতে পরদিনও ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন।
শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবি হলো ইমতিয়াজের স্থায়ী বহিষ্কার; রাজনৈতিক সমাগমে সম্পৃক্ত আরো পাঁচ শিক্ষার্থীর একাডেমিক কার্যক্রম ও হল থেকে স্থায়ী বহিষ্কার; জড়িত অন্যদের অবিলম্বে শনাক্ত করে শাস্তি দেয়া; ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা বহিরাগত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার বিষয়ে প্রশাসনের লিখিত নোটিস ও বাস্তবায়ন; দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ ডিএসডব্লিউর পদত্যাগ ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি।
এসব দাবিতে গতকাল সকালেও বুয়েটের শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার কথা ছিল শিক্ষার্থীদের। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কর্মসূচি স্থগিত করেন তারা। তবে আন্দোলনকারীরা ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নেননি। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা একাধিক শিক্ষার্থী গতকাল সকালে সংবাদমাধ্যমকে জানান, আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। বিকালে বিস্তারিত জানানো হবে। এরপর বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে বুয়েটের ড. এমএ রশীদ প্রশাসনিক ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আন্দোলনকারীরা বলেন, ছাত্ররাজনীতি বিহীন ক্যাম্পাসের পক্ষে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাজনিত কারণে কোনো ধরনের সমাগম করেননি। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, বুয়েট শিক্ষার্থীদের মিথ্যা ট্যাগ দেয়ার পাশাপাশি তাদের ছবি, পরিচয়সহ অপপ্রচার চালানো হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত এসব কারণে বুয়েট শিক্ষার্থীদের আজ ক্যাম্পাসে অবস্থান না নেয়ার মানে এ নয় যে বুয়েট শিক্ষার্থীরা তাদের ছাত্ররাজনীতি বিহীন ক্যাম্পাসের দাবি থেকে সরে এসেছেন।
এদিকে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রায় বিপরীত অবস্থান নিয়ে গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করে ছাত্রলীগ। মৌলবাদী গোষ্ঠীর কালো ছায়া থেকে মুক্ত করে বুয়েটে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতির দাবি এবং বুয়েট কর্তৃক গৃহীত সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার পরিপন্থী শিক্ষাবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এ কর্মসূচি ডাকে সংগঠনটি।
সমাবেশে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলাই কি সমাধান? বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের কালাকানুন বাতিল করতে হবে। আলটিমেটাম দিচ্ছি, বুয়েটে ছাত্র সংসদের নির্বাচন দিতে হবে। ইমতিয়াজকে সসম্মানে হলে বরণ করে নিতে হবে।’
বুয়েট ক্যাম্পাসে ভিসা-পাসপোর্ট নিয়ে প্রবেশ করতে হবে কিনা এমন প্রশ্ন তুলে সাদ্দাম হোসেন জানান, ওই রাতে তিনি এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে বুয়েটের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়েছিলেন। বৃষ্টির কারণে পরে তিনি ক্যাফেটেরিয়ায় যান।
সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘হিযবুত তাহ্রীর, জেএমবি, ছাত্রশিবির বুয়েট ক্যাম্পাসের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের কারিগর হবে, এটা হতে পারে না। গুটিকয় ছদ্ম প্রতারক সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে তাদের আন্দোলনে নামিয়েছে।’
সমাবেশ শেষে সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে সংগঠনের নেতাকর্মীরা বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। তারা বুয়েটের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দেয়ার পর ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যান।
ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে উপাচার্য সত্য প্রসাদ মজুমদার বলেছেন, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা চাইলে ক্যাম্পাসে আবারো ছাত্ররাজনীতি করার অনুমতি দেয়া হবে। তখন যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেই পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটা যদি পরিবর্তন করতে হয় তাহলে তাদের আবার উদ্যোগী হতে হবে।’
উপাচার্য আরো বলেন, ‘রাজনীতি না করলে শিক্ষার্থীদের চোখ খুলবে না, দেশের প্রতি তাদের প্রেম আসবে না। এসব বিষয় তারা চিন্তা করে যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে রাজনীতি ওপেন হতে পারে।’
এদিকে গত শনিবার বিকালে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেন বুয়েটের কয়েক শিক্ষার্থী। তারা অভিযোগ করেন, বুয়েটে কোনো শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে কিংবা আওয়ামী লীগে সম্পৃক্ত হলেই র্যাগিং ও বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। লিখিত বক্তব্যে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘বুয়েটের সংবিধানে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের যে আইন আছে, আমরা তাকে সম্মান করি। তবে এ সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে গোপনে হিযবুত তাহ্রীর, ইসলামী ছাত্রশিবিরের মতো নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো কাজ করছে।’
এ অভিযোগের বিষয়ে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলরত শিক্ষার্থীরা বলেন, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি না চাওয়া মানেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মতাদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। আমরা সব শিক্ষার্থী গর্বের সঙ্গে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার চেতনার চর্চা লালন করি। আমরা হিযবুত তাহ্রীরের সম্পূর্ণ বিপক্ষে এবং কারো শিবিরসংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হলে তাৎক্ষণিকভাবে তার বহিষ্কার চাই।
ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। সংগঠনটির সভাপতি রাগীব নাইম ও সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল রনি এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা বুয়েট শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসকে ছাত্ররাজনীতিমুক্ত রাখার সিদ্ধান্তকে আদতে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখি।’
ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা বুয়েটে জঙ্গিবাদ ও অপরাজনীতির বিস্তার ঘটছে কিনা সে প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। গতকাল তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে এক সভায় তিনি বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। সে রকম কিছু হলে সরকারকে অ্যাকশনে যেতে হবে।’
বুয়েটে আন্দোলনের নামে কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা আছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। গতকাল দুপুরে ডিএমপির ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ এ তথ্য জানিয়েছেন।