চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণা প্রতিবেদন

ঢাকার ৬০% জলাধার কমেছে, তাপমাত্রা বেড়েছে ৫ ডিগ্রি

১৯৮০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বেড়েছে সাত গুণ, ভূমির তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং হারিয়ে গেছে প্রায় ৬০ শতাংশ জলাধার।

১৯৮০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বেড়েছে সাত গুণ, ভূমির তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং হারিয়ে গেছে প্রায় ৬০ শতাংশ জলাধার। গত ৪৪ বছরের স্যাটেলাইট চিত্র ও নগরের ভূমির তাপমাত্রা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি এ গবেষণায় ঢাকার পরিবেশগত অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রধানত অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণই এ সংকটের মূল কারণ।

রাজধানী ঢাকা ভয়াবহ পরিবেশ সংকটের সম্মুখীন—এমন সতর্কতা উঠে এসেছে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ প্রকাশিত ‘প্রকৃতিবিহীন ঢাকা? প্রাকৃতিক অধিকারভিত্তিক টেকসই নগর ভাবনার পুনর্বিচার’ শীর্ষক এক গবেষণায়।

গতকাল ঢাকার এক হোটেলে গবেষণা প্রতিবেদনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান বলেন, ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে প্রকৃতির অধিকারকে আইনগত স্বীকৃতি দিতে হবে এবং প্রাকৃতিক অধিকারভিত্তিক সুশাসন অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার এ দুরবস্থা শুধু নগর পরিকল্পনায় ব্যর্থতা নয়—এটি এক ধরনের পরিবেশগত অবিচার এবং মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। নগর নয়, এবার প্রকৃতির অধিকার নিশ্চিত করাই হোক ঢাকার টেকসই ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি।’

প্রতিবেদনে ঢাকার গাছপালার করুণ অবস্থা তুলে ধরে বলা হয়, ১৯৮০ সাল থেকে ঢাকার অর্ধেক গাছ বিলুপ্ত হয়েছে। সবুজ আচ্ছাদন কমে এসেছে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ) জনপ্রতি সবুজ জায়গার পরিমাণ মাত্র ৩ দশমিক ৪৪ বর্গমিটার। যেখানে ঢাকা উত্তর সিটিতে আছে ৪ দশমিক ২৩ বর্গমিটার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে এটি ২ দশমিক ৩৩ বর্গমিটার। শহরের বেশির ভাগ এলাকাই মাথাপিছু নয় বর্গমিটার সবুজ জায়গার আন্তর্জাতিক মান অর্জনে ব্যর্থ। ‘ট্রি-ডেজার্ট’ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত আদাবর, রামপুরা, কাফরুল, বংশাল ও ওয়ারী—যেখানে গাছ প্রায় নেই বললেই চলে।

জলাধারের ভয়াবহ সংকট নিয়ে বলা হয়, ১৯৮০ থেকে এ পর্যন্ত ঢাকার ৬০ শতাংশ জলাধার বিলুপ্ত হয়েছে—মোট জলাধার এখন শহরের মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এলাকাজুড়ে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ) জনপ্রতি জলাধারের পরিমাণ মাত্র ১ দশমিক ৪৩ বর্গমিটার। যেখানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আছে ১ দশমিক ৭৯ বর্গমিটার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এটি শূন্য দশমিক ৯৭ বর্গমিটার। প্রায় জলশূন্য এলাকা সূত্রাপুর, মিরপুর, গেন্ডারিয়া, কাফরুল। ৫০টির মধ্যে কেবল ছয়টি থানা ন্যূনতম জলাধার মান পূরণ করতে পারছে।

এছাড়া শহরের ভূ-তাপমাত্রা বেড়েছে ৩-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বর্তমানে ঢাকার কোনো এলাকাই ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেই। গরমের হটস্পট শ্যামপুর, হাজারীবাগ, তেজগাঁও, রামপুরা ও দারুসসালাম—সব এলাকায় ৩০ ডিগ্রির ওপর তাপমাত্রা। আগে ঠাণ্ডা থাকা এলাকাগুলোর অবস্থাও এখন বিপজ্জনক। ঢাকায় আর কোনো জলবায়ু আশ্রয়স্থল অবশিষ্ট নেই।’

ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বেড়েছে সাত গুণ, যা এখন শহরের অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে নিয়েছে। ৮৫ শতাংশ বা তার বেশি গঠিত অঞ্চল: আদাবর, বংশাল, সূত্রাপুর, ওয়ারী, কলাবাগান, ধানমন্ডি, শ্যামপুর, কোতোয়ালি, চকবাজার, পল্টন, মিরপুর, রামপুরা। ৫০টি থানার মধ্যে ৩৭টি এরই মধ্যে নিরাপদ নির্মাণসীমা অতিক্রম করেছে।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকায় ২ দশমিক ৫ কোটি মানুষ বসবাস করবে। বর্তমানে গাছপালার হার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, জলাধার ১ থেকে ২ শতাংশ, আর তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে এবং ঢাকার প্রকৃতি ধ্বংসের মুখোমুখি। সিঙ্গাপুর ও সিউলের মতো নগরীগুলোয় গাছপালার পরিমাণ ৩০-৪৭ শতাংশ বজায় রাখে। এমনকি দিল্লি ও জাকার্তাও ঢাকার চেয়ে এগিয়ে। শুধু করাচি ঢাকার নিচে—আর আমরাও সে পথেই এগিয়ে চলেছি।’

আরও