সীমান্তে মিয়ানমারের গোলা, বর্মি সামরিক জান্তার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের প্রয়াস?

বান্দরবান সীমান্তে গত কয়েক দিনে মিয়ানমার থেকে নিক্ষিপ্ত বেশকিছু গোলা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। লঙ্ঘন হয়েছে আকাশসীমাও। সীমান্তের ওপর থেকে এখন সারা দিনই থেমে থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রিত এক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

বান্দরবান সীমান্তে গত কয়েক দিনে মিয়ানমার থেকে নিক্ষিপ্ত বেশকিছু গোলা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। লঙ্ঘন হয়েছে আকাশসীমাও। সীমান্তের ওপর থেকে এখন সারা দিনই থেমে থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রিত এক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে সতর্ক করা হলেও তাতে কোনো লাভ হয়নি। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসব ঘটনাকে এখন মিয়ানমারের উসকানিমূলক আচরণ হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও।

বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী প্রদেশ রাখাইনসহ (আরাকান) মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে দেশটির সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় নৃগোষ্ঠীগুলোর তুমুল লড়াই চলছে। এসব নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টেরও (এনইউজি) সমর্থন রয়েছে। এরই মধ্যে এনইউজির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চলমান গৃহযুদ্ধে দেশটির প্রায় অর্ধেক এলাকার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আবার মিয়ানমারের সামরিক জান্তার প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংও স্বীকার করেছেন, সামরিক অভ্যুত্থানবিরোধীদের সঙ্গে লড়াইয়ে তাতমাদোর (বর্মি সামরিক বাহিনীর আনুষ্ঠানিক নাম) প্রচুর সদস্য হতাহত হয়েছেন। গণতন্ত্রপন্থীদের আক্রমণে দেশটির সামরিক বাহিনী এখন বেশ নাজুক অবস্থায় পড়ে গিয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো কোনো পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বহু জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত মিয়ানমারের ওপর দেশটির সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ এখন বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বেশ শোচনীয়। রাজনৈতিকভাবে হতবল হয়ে তাতমাদো এখন গায়ের জোরেই ক্ষমতা ধরে রেখেছে। গোটা মিয়ানমারেই যেকোনোভাবে হোক নিজেদের হারানো রাজনৈতিক ক্ষমতা ফিরে পেতে চাইছে তারা। এজন্যই সীমান্তে যুদ্ধংদেহী অবস্থান দেখিয়ে মিয়ানমারে জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণা উসকে দেয়ার প্রয়াস চালাচ্ছে তারা, যাতে তাদের হারানো জনসমর্থন আবারো ফিরে আসে।

তবে এর ভিন্ন পর্যবেক্ষণও রয়েছে। সীমান্তের ওপর থেকে বাংলাদেশে গোলা এসে পড়ার বিষয়টিকে দেশটির গৃহযুদ্ধের অভিঘাত হিসেবেই মনে করছেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ। তাদের ভাষ্যমতে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নিজেই এখন বেশ বিপদের মধ্য রয়েছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালাতে হয়েছে তাদের। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্রীদের প্রতি তাদের নিপীড়ন এনইউজিকে সশস্ত্র প্রতিরোধের দিকে ঠেলে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে লড়াইগুলো বেশ তীব্রতা পেয়েছে। কৌশলগতভাবে এখন অনেকটাই অসুবিধার মধ্যে পড়ে গিয়েছে তাতমাদো। এখন পর্যন্ত মিয়ানমারজুড়ে বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত লড়াইয়ে প্রচুর সেনাসদস্যের মৃত্যু হয়েছে।

এনইউজির দাবি, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত এক বছরে সংঘর্ষে জান্তা বাহিনীর প্রায় ২০ হাজার সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে এর বিপরীতে এনইউজির প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্য মারা গেছে দেড় হাজার। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা তথ্যসেবা সংস্থা আইএইচএস-জেনের নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয়ক বিশ্লেষক অ্যান্থনি ডেভিস সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক প্যানেল আলোচনায় বলেন, তাতমাদোর সৈন্যদের প্রতিরক্ষা লাইন মিয়ানমারজুড়ে বেশ দুর্বলভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এভাবে প্রতিরক্ষা লাইন সাজাতে যে পরিমাণ লোকবল দরকার, সেটিও তাদের নেই। তাতমাদোর এ নাজুক অবস্থার সুযোগ নিয়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো শুধু তাদের সমর অভিজ্ঞতা বাড়ায়নি, একই সঙ্গে মিয়ানমারের বিভিন্ন স্থানে তাদের দখলও সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।

বিপাকে পড়া এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের পক্ষে এখন বড় কোনো যুদ্ধে জড়ানো অসম্ভব বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। বাংলাদেশ সীমান্তে গোলা এসে পড়ার ঘটনাগুলোকে মিয়ানমারের উসকানি নয়, বরং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখছেন তারা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, তাদের ওখানে এখন বড় ধরনের যুদ্ধ হচ্ছে। আরাকান আর্মি ওখানে তাতমাদোর অনেক ঘাঁটি দখল করে নিয়েছে। সেই ঘাঁটিগুলোকে পুনরুদ্ধারের জন্য তারা জানপ্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করছে। রাখাইন থেকে তারা যদি আরাকান আর্মিকে সরাতে না পারে তাহলে তা জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সে লড়াইয়েরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমাদের এখানে এসে পড়ছে। আমি এটাকে উসকানি হিসেবে দেখব না, তবে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ হিসেবে দেখব।

তিনি আরো বলেন, তারা যখন আমাদের সীমানা লঙ্ঘন করে, তখন সেটি বেশ গুরুতর বিষয়। আর তাদের এ সীমা লঙ্ঘনের কারণে যদি আমাদের এখানে জানমালের ক্ষতি হয়, তাহলে তা আরো গুরুতর বিষয়। কাজেই এটিকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আমরা এখন কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছি। সেটা ঠিক আছে। তবে এ ধরনের ঘটনা আরো ঘটতে থাকলে আমাদের কূটনৈতিক তত্পরতা আরো জোরালো করে তুলতে হবে। আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চেষ্টা করতে হবে, যাতে তারা আমাদের পাশে দাঁড়ায় এবং মিয়ানমারকে যেন কড়া বার্তা দেয় যে বাংলাদেশ বিষয়টিকে বরদাশত করবে না। তার পরও যদি তা চলতে থাকে, তাহলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ সরকার আমাদের জানমালের ক্ষতি কোনোভাবেই চাইবে না এবং এটা গ্রহণযোগ্যও নয়। কাজেই সে জায়গায় আমাদের আরেকটু ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হতে পারে।

বর্তমানে রাখাইন ও চিন প্রদেশে আরাকান আর্মি (এএ) নামে রোহিঙ্গাদের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তুমুল লড়াই চলছে বলে মিয়ানমারের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে উঠে এসেছে। বর্মি সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি ঘাঁটিতে আরাকান আর্মি হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে আরাকান আর্মির অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে তুমুল গোলাবর্ষণ করছে সেনাবাহিনী। আরাকান আর্মি এরই মধ্যে পালেতওয়া শহরে পাঁচটি ও রাখাইনের মংডুতে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্রসহ দুটি সেনাচৌকি দখল করে নিয়েছে বলে ইরাওয়াদ্দি নিউজ জানিয়েছে।

আরাকান আর্মির বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটির প্রকাশিত খবরে বলা হয়, এ মুহূর্তে রাখাইন প্রদেশজুড়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য সামরিক নৌযান, ট্রাক ও হেলিকপ্টারের পাশাপাশি বেসরকারি ফেরি ও বাসে করেও অতিরিক্ত লোকবল ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসছে। যেকোনো মুহূর্তে দুই পক্ষের লড়াই আরো তীব্রতর হয়ে উঠবে।

শুধু আরাকান আর্মি নয়, মিয়ানমারের জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক সশস্ত্র প্রায় সব দলের সঙ্গেই তাতমাদোর যুদ্ধ চলছে। গৃহযুদ্ধে দলগুলোর প্রতিটির সঙ্গেই গণতন্ত্রপন্থী এনইউজির সমর্থন রয়েছে। এনইউজির সঙ্গে বিবাদ তাতমাদোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকেও এখন সামনে নিয়ে এসেছে। অনেক সৈনিক ও কর্মকর্তা এখন পক্ষত্যাগ করছেন। সামরিক অভ্যুত্থানের পর এখন পর্যন্ত তাতমাদোর তিন হাজার ও পুলিশ বাহিনীর ছয় হাজার সদস্য বাহিনী ত্যাগ করে এনইউজির পক্ষে যোগ দিয়েছেন। এমনই এক পক্ষত্যাগী সেনা কর্মকর্তা সম্প্রতি মিয়ানমার নাউকে বলেন, তাতমাদোর ঊর্ধ্বতনরা এখন অন্যদের কাছে অনেক বেশি কিছু দাবি করছেন। কিন্তু যেভাবে সৈন্যদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করা হচ্ছে, তা লোকবলের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ নয়। সৈন্যরা একবার ঊর্ধ্বতনদের ওপর থেকে ভরসা হারিয়ে ফেললে তাদের মধ্যে আর লড়াই করার মানসিকতাও থাকে না। এছাড়া তারা এটাও জানে, তাদের প্রতি কোনো জনসমর্থন নেই। সুতরাং তাদের নৈতিক মনোবলও নেই। মনোবল ছাড়া লড়াই করা যায় না।

রাখাইন ও চিন প্রদেশের পাশাপাশি মিয়ানমারের অন্যান্য স্থানেও একের পর এক ঘাঁটি হাতছাড়া হচ্ছে তাতমাদোর। নিয়মিতভাবেই সামরিক বাহিনীর প্রচুর লোকক্ষয়ের খবর প্রকাশ হচ্ছে দেশটির সংবাদমাধ্যমে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থান থেকে ঘাঁটি বেদখল বা ফেলে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে অনেক। কারেন জনগোষ্ঠীর জান্তাবিরোধী বাহিনী কারেনি ন্যাশনালিটিজ ডিফেন্স ফোর্স (কেএনডিএফ) জানিয়েছে, সামরিক অভ্যুত্থানের পর এখন পর্যন্ত তাদের আক্রমণের মুখে বর্মি সেনাবাহিনীর ১৩টি ঘাঁটি হাতছাড়া হয়েছে।

তাতমাদো প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংও স্বীকার করেছেন, দেশটির সেনাবাহিনী এখন পুরোপুরি বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। ঊর্ধ্বতন বর্মি সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক সাম্প্রতিক বৈঠকের একটি ফাঁস হওয়া দলিলের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মিয়ানমারজুড়ে এনইউজিসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে লড়াইয়ে প্রচুর সৈন্যক্ষয় হওয়ার পর তাতমাদো এখন বেশ বিপাকে পড়েছে বলে মিন অং হ্লাইংয়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বর্মি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অভিযান ও পরের মাসের নানা ঘটনা নিয়ে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, মূলত চারটি কারণে তাতমাদোর লোকক্ষয় ঘটছে। প্রথমত, সৈন্য ও ঘাঁটি মোতায়েনে কৌশলগত চিন্তার অভাব, ঘাঁটির স্থান সম্পর্কে সেখানকার নেতৃত্বদানকারী অফিসারদের ভুল তথ্য প্রদান, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়াই ক্লিয়ারেন্স অপারেশন পরিচালনা ও সৈন্যদের কৌশলগত লড়াইয়ে যুক্ত হওয়ার অক্ষমতা। এমনকি সৈন্যরা তাদের প্রশিক্ষণকেও লড়াইয়ের ময়দানে কাজে লাগাতে পারছে না বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

আরও