বছর না ঘুরতেই ফের তীব্র ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী এলাকা। যুগের পর যুগ ধরে এ নদী নিঃস্ব করেছে হাজারো পরিবারকে। এবারো সেই পুরনো দুঃসহ স্মৃতি কঠিন বাস্তবতা হয়ে আবার কড়া নাড়ছে পদ্মা তীরবর্তী মানুষের দরজায়। ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও চলমান বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে পদ্মার পানিপ্রবাহ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় স্রোত আরো প্রবল হয়েছে। এতে ভাঙনের তীব্রতাও বেড়েছে। আগে থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল, এবারের বর্ষায় লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ি উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিতে পারে। সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
গত শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হওয়া ভারি বৃষ্টি, প্রচণ্ড বাতাস ও প্রবল স্রোতের কারণে লৌহজংয়ের সিংহেরহাটি ও বড় নওপাড়া এলাকায় নদীতীরের বিভিন্ন অংশে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। শনিবার সকালে সরজমিনে দেখা যায়, অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে ফেলে রাখা জিও ব্যাগগুলো উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে একাধিক স্থানে সরে গেছে। এতে নদীর পাড়ের মাটি ধসে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ ধীরগতির হওয়ায় কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে। অনেকের সাজানো সংসার মুহূর্তেই চোখের সামনে নদীতে বিলীন হচ্ছে। পদ্মার প্রবল স্রোত ও উঁচু ঢেউয়ে এবারের ভাঙনের মাত্রা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
সিংহেরহাটি গ্রামের দেলোয়ার দেওয়ান বলেন, ‘ভাইবোন মিলে পানিতে নেমে বাঁশ, কচুরিপানা ও খড়কুটো দিয়ে নিজের বাড়ি রক্ষার চেষ্টা করেছি। গতকালই আমার বাবার দাফন দিয়েছি। শোকের মধ্যেই নদীভাঙনের হাত থেকে বাড়ি রক্ষায় নামতে হলো।’
বড় নওপাড়া গ্রামের পুতুল আক্তার বলেন, ‘শনিবার সকাল থেকে জিও ব্যাগগুলো সরে যেতে শুরু করেছে। মাটি ধসে বসতভিটার সঙ্গে নদীর দূরত্ব কমে এসেছে এক ফুটের মতো।’
স্থানীয়রা জানান, আকস্মিক ভাঙনে প্রায় অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি এখন সরাসরি ঝুঁকির মুখে। একদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, অন্যদিকে শ্রমিক সংকটে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেকে।
সিংহেরহাটি গ্রামের মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমার বাড়ির পূর্বদিকে ব্লক ফেলে বাঁধ নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু পশ্চিম পাশের ৫০০ মিটার জায়গা প্রকল্পের বাইরে রয়ে গেছে। যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে, আজ রাতটাই টিকে থাকতে পারব কিনা জানি না।’
ভাঙনের খবর পেয়ে লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নেছার উদ্দিন সরজমিনে পরিদর্শন করেছেন। তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুর ভাটিতে বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের ১৩ দশমিক ৭২ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে ৯ দশমিক ১০ কিমি এলাকায় স্থায়ী বাঁধ এবং ৪ দশমিক ৬২ কিমি এলাকায় সতর্কতামূলক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২১ সালের অক্টোবরে। প্রথম দফায় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৪৬ কোটি টাকা। পরে প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ও বরাদ্দ বাড়িয়ে তা দাঁড়ায় ৫২৭ কোটি টাকায়। প্রকল্পের মেয়াদও বাড়িয়ে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
তবে বর্ষার আগে প্রকল্পের কাজ ধীরগতির হওয়ায় উদ্বিগ্ন পদ্মাপাড়ের মানুষ। গত আড়াই দশকে লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ি উপজেলার অন্তত ৪০টি গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভূমিহীন হয়েছেন অর্ধলক্ষাধিক পরিবার।
গাঁওদিয়া গ্রামের কাজী বাবুল বলেন, ‘দুই দশক আগে বাড়িঘর হারিয়ে এখনকার স্থানে বসবাস করছি। এখান থেকে নদী মাত্র ১০০ মিটার দূরে। বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ হলে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতাম।’
কনকসার খালের মুখে থাকা গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমার বাড়ির পশ্চিম পাশের ৫০০ মিটার জায়গা এখনো প্রকল্পের বাইরে। গত বছর ঢেউয়ে অনেক ক্ষতি হয়েছিল। স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত নিরাপদে থাকতাম।’
মুন্সিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৪৮ শতাংশ। ২৬টি প্যাকেজের আওতায় কাজ চলছে। সংস্থার উপসহকারী প্রকৌশলী এনামুল হক জানান, প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য ১৬ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১ দশমিক ৩০ কিমি এলাকায় আগে থেকেই স্থায়ী বাঁধ রয়েছে। তবে প্রকল্পের আওতার বাইরে রয়েছে আরো ১ দশমিক ৮৫ কিমি এলাকা। তিনি বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা মনিটরিং করা হচ্ছে। স্থায়ী বাঁধ বা জিও ব্যাগ স্থাপিত এলাকায় ভাঙন দেখা দিলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’