অর্থনৈতিকভাবে যে দেশ যত সমৃদ্ধ সে দেশের ভাষাও তত শক্তিশালী। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার মধ্যে নিজ ভাষাকে শক্তিশালী করতে প্রথমে নিজ দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে হবে। বিশ্বব্যাপী পণ্য এবং সেবা ছড়িয়ে দিতে হবে নিজ ভাষায়। তাই বাংলা ভাষাকেও শক্তিশালী করতে চাই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।
গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সম্প্রীতি বাংলাদেশ আয়োজিত ‘আমার ভাষা আমার শক্তি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। এ সময় বক্তারা নিজ ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে এর পরিধি ও চর্চা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সম্প্রীতি বাংলাদেশের আহ্বায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীলের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ও কবি ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য পবিত্র সরকার।
বৈঠকে আলোচক ছিলেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ড. রতন সিদ্দিকি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য ড. বিশ্বজিৎ চন্দ, মহিলা পরিষদের সভাপতি ফৌজিয়া আহমেদ, সাবেক সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, ড. হামিদা আক্তারসহ বিশিষ্টজনরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, ‘বাংলা ভাষা বেঁচে আছে মেহনতি শ্রমিক মানুষের কাছে। বড়লোক ও উচ্চ বর্ণের লোকদের কাছে বাংলা ভাষা নেই। বড়লোকদের বিয়ের কার্ডে কেউ আর বাংলা লেখে না, লেখে ইংরেজিতে। তাই দেশের ভাষা যাদের হাতে প্রাণ পেয়েছে তাদের জন্য কাজ করতে হবে। ভাষা বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, প্রতি ১৫ দিন পরপর একটি ভাষার মৃত্যু হয়। একটি ভাষা শুধু একটি ভাষা নয়, সেই ভাষায় গড়ে ওঠে সভ্যতা, তাদের দেখা স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা। তাই একটি ভাষার মৃত্যু মানে একটি সভ্যতার মৃত্যু। আমরা একটি সভ্যতার মৃত্যু হতে দিতে পারি না।’
তিনি আরো বলেন, ‘পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী ভাষায় প্রাথমিক পর্যায়ে পড়ানো হয়। তবে সব ক্ষেত্রে শিক্ষক পাওয়া যায় না। অনেক ভাষা আছে যাদের নিজস্ব লিপি নেই। সরকারের পক্ষ থেকে এগুলো নিয়ে কাজ হচ্ছে। আরো ভালোভাবে কীভাবে এসব বিষয়ে কাজ করা যায় সে প্রস্তাব আমার পক্ষ থেকে করব।’
ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, ‘আজকে যখন ভাষা রক্ষার জন্য সংগ্রাম চলছে, তখন বলতেই হচ্ছে বাংলা ভাষাকে জীবিকার ভাষা করতে না পারলে আমাদের ভাষা পিছিয়ে যাবে। যদি বাংলাকে জীবিকার ভাষা করা যায় তাহলেই বাংলা ভাষা হাজার বছর ধরে টিকে থাকবে। আরবি ভাষা জীবিকার ভাষা হয়েছে বলেই বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ আজ আরবি শিখছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ভাষা পর্যন্ত শিখছে, জাপানি ভাষা শিখছে। আমাদের ভাষাকেও জীবিকার ভাষা হতে হবে। একটা সময় আমাদের ভাষা জীবিকার ভাষা ছিল বলেই ফোর্ট উইলিয়াম বাংলা ভাষার শিক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন। সেটা যতটা না আমাদের প্রয়োজনে তার চেয়ে বেশি তাদের স্বার্থে। তাই ভাষার যে শক্তি সেই ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।’