২৬টি খাল। আগে ছিল ঢাকা ওয়াসার অধীনে। তিন বছর আগে দায়িত্ব নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। কিন্তু মালিকানা বদলেই শেষ। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখন পর্যন্ত একটি খালের পূর্ণাঙ্গ সীমানা নির্ধারণ কিংবা দখলমুক্ত করা যায়নি।
জলাবদ্ধতা নিরসনের অংশ হিসেবে ঢাকা ওয়াসা ২৬টি খাল (প্রায় ৮০ কিলোমিটার) এবং প্রায় ৩৮৫ কিলোমিটার বড় আকারের নালা ও চারটি পাম্প স্টেশন পরিচালনা করত। দুই সিটি করপোরেশন দেখভাল করে প্রায় ২ হাজার ২১১ কিলোমিটার নালা। ২০২০ সালে ওয়াসার অধীনে থাকা সব নালা ও খাল দুই সিটি করপোরেশনের হাতে যায়। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলামের উপস্থিতিতে ওয়াসার ২৬ খাল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই সময় ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম ও ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান উপস্থিত ছিলেন।
খালের দায়িত্ব পেয়ে সিটি জরিপ অনুসারে দ্রুত খালের সীমানা চিহ্নিত করার ঘোষণা দেন মেয়র আতিকুল ইসলাম। এছাড়া খালের দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পুনঃখনন করে পানি ধারণের ক্ষমতা বৃদ্ধি, পাড় বাঁধাই করে সবুজায়ন, ওয়াকওয়ে (হাঁটার পথ) ও সাইকেল লেন তৈরি করার কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে আতিকুল ইসলাম ‘খাল তুমি কার?’ এমন প্রশ্ন রেখে বলেছিলেন, ‘আজ খাল ঠিকানা পেল। আজ থেকে খাল সিটি করপোরেশনের হয়ে যাচ্ছে।’
ওই দিন খাল নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছিলেন ডিএসসিসির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসও। তিনি বলেন, ‘ঢাকার জিরানী, মান্ডাসহ তিনটি খাল ও দুটি বক্স কালভার্ট (পান্থপথ ও সেগুনবাগিচা) পরিষ্কার করার কাজ শুরু করা হবে। আগামী তিন মাসে এ কাজ করা হবে। কালুনগর খাল আংশিক পরিষ্কার করা হয়েছে। এরপর ধোলাই খাল ও বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেল নিয়ে কাজ করা হবে।’
খালের দায়িত্ব পাওয়ার পরপর দুই মেয়র জোর দিয়ে কাজ শুরু করেন। তবে শুরুর দিকে পরিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তাদের কাজ। গত তিন বছরে একটি খালের পূর্ণাঙ্গ সীমানা নির্ধারণ করতে পারেনি দুই সিটির কেউ। অবশ্য আংশিক সীমানা নির্ধারণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ঢাকার খালে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার খালগুলো শুধু হাতবদল হয়েছে। প্রকৃত অর্থে কোনো কাজই হয়নি। মালিকানা পাওয়ার পর প্রথম কাজ ছিল সীমানা নির্ধারণ করা। ডিএসসিসি কিংবা ডিএনসিসি পরিপূর্ণভাবে একটি খালের সীমানা নির্ধারণ করতে পারেনি। দুই সিটি করপোরেশন এখনো এমন একটি আদর্শ খাল তৈরি করতে পারেনি, যেখানে দখল-দূষণের কোনো অস্তিত্ব নেই। বিপরীতে খাল পরিষ্কার ও বিশেষ অভিযানের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে।’
দুই সিটি করপোরেশনের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াসা ২৬টি খাল হস্তান্তরের পর আরো বেশ কয়েকটি খালও দুই সিটিকে বুঝিয়ে দেয় ওয়াসা। এর মধ্যে ডিএসসিসির তালিকাভুক্ত খালগুলো হলো জিরানী, বাসাবো, কদমতলা, খিলগাঁও বাগিচা, মান্ডা, কাজলাপাড়, শ্যামপুর, তিতাস, উত্তর কুতুবখালী, মৃধাবাড়ী, মাতুয়াইল, ডিএনডি এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক খাল। একইভাবে ডিএনসিসির তালিকাভুক্ত খালগুলো হলো কাটাসুর, রামচন্দ্রপুর, কল্যাণপুর, রূপনগর, মিরপুর দিয়াবাড়ি, ইব্রাহিমপুর, বাউনিয়া, বাইশটেকী, সাংবাদিক কলোনি, আবদুল্লাহপুর, দ্বিগুণ, বেগুনবাড়ী, শাহজাদপুর, সুতিভোলা, কসাইবাড়ি, মহাখালী, ডুমনি, উত্তরা দিয়াবাড়ী, বোয়ালিয়া, গোবিন্দপুর ও নরাইল খাল। খাল নিয়ে দুই সিটির কার্যক্রম হতাশাজনক বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে যখনই খাল-নদীর দখল উচ্ছেদের কথা বলি, পুনরুদ্ধারের কথা বলি, তখনই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হয়ে যায়। আমরা তো প্রকল্পের আশায় এসব দাবি তুলি না। খাল-জলাশয়গুলো আমরা আগের অবস্থায় ফেরত চাই। যতই এ কাজগুলো দেরি হবে ততই কিন্তু আমাদের খাল ও জলাশয়গুলো পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে যাবে। সিটি করপোরেশনকে যে আশায় খালগুলো হস্তান্তর করে দিয়েছিল ওয়াসা, তা পূরণ হয়নি। কোনো কোনো জায়গায় কিছু উদ্যোগ জনসমাদৃত হলেও বাস্তবিক অর্থে খালগুলো এখনো বেহাল। ঢাকা সিটি করপোরেশন তো নিজে দখলদারদের উচ্ছেদ করতে পারবে না। সে দখলদারকে নোটিস করবে, এত তারিখের মধ্যে আপনারা সরে যান। যদি আপনারা সরে না যান এবং আপনাদের স্থাপনা অপসারণ না করেন, তাহলে আপনাদের আমরা উচ্ছেদ তো করবই পাশপাশি এর যাবতীয় খরচ আপনাদের কাছ থেকে আদায় করব। এই প্রক্রিয়াটাই শুরু করা হয়নি। সীমানাগুলো চিহ্নিত করা হয়নি। যদি এই কাজগুলো অন্তত শুরু হতো তাহলে আমরা বুঝতে পারতাম, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কিছু একটা হবে। যেহেতু প্রাথমিক কাজই শুরু হয়নি, দুই-একটা স্পেসিফিক খালে তারা অল্পবিস্তর কাজ করেছে, সেক্ষেত্রে আমি বলব যে পারফরম্যান্সটা আসলে হতাশাব্যঞ্জক।’
খালের দায়িত্ব পাওয়ার পর এখন পর্যন্ত মৌলিক কোনো কাজ হয়নি কেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) মীর খায়রুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা খাল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছি। দখলমুক্ত, পার সংরক্ষণ, সাইকেল লেন নির্মাণ, সৌন্দর্য বর্ধনসহ আরো ব্যাপক কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে খাল সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি।’