জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ

নাহিদ-আখতারের নেতৃত্বে ১৭১ জনের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা

সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করল তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’। নতুন এ দলের আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন সদ্য উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করা নাহিদ ইসলাম।

সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করল তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’। নতুন এ দলের আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন সদ্য উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করা নাহিদ ইসলাম। সদস্য সচিব পদে রয়েছেন আখতার হোসেন। কমিটিতে মোট ১৭১টি পদ রয়েছে। গতকাল রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ দলের নামের ইংরেজি রূপ হবে ‘ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি’ (এনসিপি)।

বিকাল সোয়া ৪টার দিকে অনুষ্ঠান শুরু হয়। ৪টা ২০ মিনিটে প্রথমে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াত করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা তারেকুল ইসলাম (তারেক রেজা)। এরপর পবিত্র গীতা থেকে পাঠ করেন জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতা অর্পিতা শ্যামা দেব। পরে পবিত্র ত্রিপিটক থেকে আবির বড়ুয়া এবং পবিত্র বাইবেল থেকে পাঠ করেন অলিক মৃ। তারাও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতা। পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এরপর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। বিভিন্ন জেলা ও ঢাকার বিভিন্ন থানা থেকে জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও সমর্থকসহ ছাত্র-জনতা মিছিল নিয়ে আসেন। তাদের মুখে ছিল স্লোগান আর হাতে পতাকা। এ সময় সেখানে দেখা যায় তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চ থেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মিছিলগুলোকে স্বাগত জানানো হয়।

সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে দলের কমিটি ঘোষণা শুরু হয়। আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের নাম ঘোষণা করেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ইসমাঈল হোসেন রাব্বির বোন মীম আক্তার। পরে দলের আংশিক অর্গানোগ্রাম পড়ে শোনান নতুন দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন। এরপর আংশিক আহ্বায়ক কমিটির পুরোটা ঘোষণা করেন তিনি।

আহ্বায়ক পদে নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব পদে আখতার হোসেনকে রেখে দলের কমিটির শীর্ষ পদে আছেন ১০ জন। অন্য ৮ জন হলেন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব নাহিদা সারোয়ার নিভা, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ। এরপর ঘোষণা করা হয় ১৬ জন যুগ্ম আহ্বায়কের নাম। তারা হলেন নুসরাত তাবাসসুম, মুনিরা শারমীন, মাহবুব আলম, সারোয়ার তুষার, অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন, তাসনুভা জাবিন, সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া, আতিক মুজাহিদ, আশরাফ উদ্দিন, অর্পিতা সাহা দেব, তানজিল মাহমুদ, অনিক রায়, খালেদ সাইফুল্লাহ, জাবেদ রাসিন, এহতেশাম হক ও হাসান আলী।

পরে দলের যুগ্ম সদস্য সচিব ও যুগ্ম মুখ্য সংগঠকদের নাম ঘোষণা করা হয়।

পরে নতুন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যের পর নতুন দলের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘জুলাই ২০২৪ গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের সূচনা করেছে। একটি গণতান্ত্রিক নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সব সম্ভাবনার অবসান ঘটাতে হবে। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন আমাদের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষ্য। সেকেন্ড রিপাবলিকে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ভেঙে পড়া রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় গড়ে তোলা ও তাদের গণতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষা করা হবে আমাদের রাজনীতির অগ্রাধিকার। এর মধ্য দিয়েই কেবল আমরা একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারব।’

এছাড়া বক্তব্য দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক ও নতুন দলে মুখ্য সংগঠকের (দক্ষিণাঞ্চল) দায়িত্ব পাওয়া হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ, জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের বাবা নওশের আলী প্রমুখ।

আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘আর কোনো নির্বাচনের আগে দলে দলে সংঘাত হয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে দেবে না তরুণরা। আগামীর বাংলাদেশে দল-মত নির্বিশেষে সবাই বসবাস করবে। তরুণদের নেতৃত্বে সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে এ দেশ পুনর্গঠন করা হবে, এটা দেশবাসীর কাছে আমাদের প্রতিশ্রুতি।’

শহীদ জাবির ইব্রাহিমের বাবা নওশের আলী বলেন, ‘আমি চাই, আমার দেশ যেন এ দলের কাছে নিরাপদ থাকে। আমাদের, বিশেষ করে এই শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে এ দলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানাই।’

এদিকে অনুষ্ঠানে যোগ দেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। মঞ্চের সামনে রাজনৈতিক নেতাদের সারিতে বসেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী (এ্যানি), নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, জেএসডির সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রব ও মহাসচিব শহীদ উদ্দিন মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা আকবর খান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন, হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বিকল্প ধারা বাংলাদেশের নির্বাহী সভাপতি মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমেদ আবদুল কাদের, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব সাখাওয়াত হোসেন রাজী, ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান একেএম আজহারুল ইসলাম, এবি পার্টির মহাসচিব আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ও দিদারুল আলম, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের সামনের সারিতে কূটনীতিকদের জন্যও আসন রাখা হয়। অনুষ্ঠানে যোগ দেন ঢাকার পাকিস্তান হাইকমিশনের পলিটিক্যাল কাউন্সিলর কামরান দাঙ্গাল ও ঢাকায় ভ্যাটিকান সিটির রাষ্ট্রদূত।

আরও