বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও স্বার্থের সংঘাতমুক্ত ভূমিকা নিশ্চিত করতে নবনিযুক্ত গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ বাতিল করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রাজধানীতে আজ নিজস্ব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ কথা বলেন। সেখানে সরকারের সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ কৌশলগত অগ্রাধিকার শীর্ষক সুপারিশ তুলে ধরে সংস্থাটি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হয়। বিশেষ করে স্বার্থের সংঘাতমুক্ত অবস্থান বজায় রাখা জরুরি। এ কারণে নবনিযুক্ত গভর্নরের নিয়োগ বাতিল করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, গভর্নরের দায়িত্ব পালনে এমন একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে, যিনি সংশ্লিষ্ট খাতে পরীক্ষিত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ এবং সব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম।
বর্তমান গভর্নরের ক্ষেত্রে ‘স্বার্থের সংঘাতের’ বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে এসেছে বলেও উল্লেখ করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তার মতে, গভর্নর নিয়োগের পর বিভিন্ন মাধ্যমে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের বিষয় সামনে এসেছে। ফলে এ নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাই বর্তমান গভর্নর সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না বলে টিআইবি মনে করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালনও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই নিয়োগটি বাতিল করে উপযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রে সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের জন্য বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরে টিআইবি। সংস্থাটি মনে করে, সরকার গঠনকারী দল বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামত রূপরেখা, নির্বাচনী ইশতেহার ও জুলাই সনদের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত কৌশল ও পথরেখা তৈরি করা প্রয়োজন।
এ সময় সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কৌশলগত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বিষয়ে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। সেখানে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহার ও জুলাই সনদ অনুযায়ী নির্ধারিত সমন্বিত কৌশল ও পথরেখার ভিত্তিতে বাস্তবায়নযোগ্য সব কর্মপরিকল্পনায় সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী উপাদান সক্রিয় ও বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করতে হবে।’
তার মতে, দুর্নীতির কার্যকর ও দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ ছাড়া সরকারের অন্য কোনো উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, ‘দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সরকারকে প্রথমে নিজেদের দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, কর্মী ও সমর্থক, আমলাতন্ত্র এবং ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার মানুষের মধ্যে যে “এবার আমাদের পালা” ধরনের সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে, তা বন্ধে দল ও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।’
একইসঙ্গে দল ও অঙ্গসংগঠনসহ সব ক্ষেত্রে শুদ্ধতার চর্চা নিশ্চিত করতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নির্দেশনা জারি করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়ার আহ্বান জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
সুপারিশে বলা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, দলবাজি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিকে স্বাভাবিক করে তোলার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশনা দিতে হবে। অতীতে অর্থ পাচার, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যবহার হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এ কারণে এসব সংস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে সংস্থাটি। একই সঙ্গে র্যাব বিলুপ্ত করার আগের দাবির কথাও পুনরায় উল্লেখ করা হয়।
জ্বালানি খাত নিয়েও সুপারিশ তুলে ধরে টিআইবি। সংস্থাটি মনে করে, জ্বালানি মহাপরিকল্পনা নতুন করে প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এজন্য ২০২৩ সালের জ্বালানি মহাপরিকল্পনা বাতিল করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন পরিকল্পনা তৈরি করার কথা বলা হয়।