সংক্রমণের শীর্ষবিন্দুতে কবে পৌঁছবে বাংলাদেশ

কভিড-১৯ এরই মধ্যে বিশ্বের সব প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাণঘাতী ভাইরাসটির সংক্রমণের গতি এখন বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। চীনে শুরু হওয়া এ মারণ ভাইরাসের সংক্রমণের ব্যাপকতা ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আগেই পৌঁছেছে। এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এটির সংক্রমণ ডালপালা ছড়াতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে এক-দেড় মাস সময় লাগে। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে বাংলাদেশে ভাইরাসটির সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি মে মাসের মাঝামাঝি নাগাদ অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো প্রক্ষেপণ দেয়া হয়নি এখন পর্যন্ত।

কভিড-১৯ এরই মধ্যে বিশ্বের সব প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাণঘাতী ভাইরাসটির সংক্রমণের গতি এখন বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। চীনে শুরু হওয়া এ মারণ ভাইরাসের সংক্রমণের ব্যাপকতা ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আগেই পৌঁছেছে। এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এটির সংক্রমণ ডালপালা ছড়াতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে এক-দেড় মাস সময় লাগে। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে বাংলাদেশে ভাইরাসটির সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি মে মাসের মাঝামাঝি নাগাদ অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো প্রক্ষেপণ দেয়া হয়নি এখন পর্যন্ত।

দেশে গবেষণার মাধ্যমে এ ধরনের সংক্রামক ব্যাধির গতিপ্রকৃতি নিরূপণ ও নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর), জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম) ও ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ (আইপিএইচ)। কিন্তু সরকারের এ তিনটি প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশে কভিড-১৯ সংক্রমণের শীর্ষবিন্দুতে (পিক) কখন পৌঁছবে, সে বিষয়ে কোনো পূর্বাভাস দেয়নি এখন পর্যন্ত।

জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইইডিসিআরের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে কবে পৌঁছবে তা নির্ভর করবে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ঘরে অবস্থান করার যে কর্মসূচি রয়েছে সেটার ওপর। আমরা যদি এটি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে পারি, তাহলে কমিউনিটিতে সীমিত সংক্রমণ থাকবে এবং এপ্রিলের শেষ নাগাদ আমরা কম ইনফেকশন পাব। কিন্তু আমরা যদি অনুসরণ করতে না পারি, তাহলে ভারতের মতো মে মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে আমাদেরও হয়তো একটা পিক হয়ে যাবে। এখন দৈনিক ৩০০ নিশ্চিত কেস পাওয়া যাচ্ছে, তখন হয়তো তিন হাজার কেস পাওয়া যাবে। এটা সম্পূর্ণই নির্ভর করছে ঘরে থাকা কর্মসূচি কতটা সফলভাবে কার্যকর করা যাবে তার ওপর। ইনকিউবেশন পিরিয়ড তো ২ থেকে ১৪ দিন, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গড়ে সাতদিনের মতো। আমাদের এখনো সময় আছে, যদি আমরা সবাই মিলে মানি। যত ঘর থেকে কম বের হব ততই আমাদের সবার জন্য মঙ্গলজনক।

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে প্রথম এ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ১১ জানুয়ারিতে। এর দুদিন পর চীনের বাইরে থাইল্যান্ডে প্রথম ভাইরাসটির সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে, ২৩ জানুয়ারি ফ্রান্সে, ২৬ জানুয়ারি জার্মানি, ২৯ জানুয়ারি ইতালি ও ৩০ জানুয়ারি স্পেনে করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়। নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর আক্রান্তের সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছতে সময় লাগে চার মাস। এর পরের ১০ লাখ ছাড়িয়েছে মাত্র দুই সপ্তাহে।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সিস্টেমস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তথ্য বলছে, গতকাল রাত ১০টা পর্যন্ত সারা বিশ্বে ২১ লাখ ৮২ হাজার মানুষ ভাইরাসটিতে সংক্রমিত বলে শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার মানুষের। আর সুস্থ হয়েছে ৫ লাখ ৫৫ হাজার মানুষ।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপালে প্রথম ভাইরাসটির সংক্রমণ শনাক্ত হয় ১৩ জানুয়ারি। এরপর শ্রীলংকায় ২৬ জানুয়ারি, ভারতে ২৯ জানুয়ারি, আফগানিস্তানে ২৩ ফেব্রুয়ারি, পাকিস্তানে ২৫ ফেব্রুয়ারি, ভুটানে ৫ মার্চ ও মালদ্বীপে ৬ মার্চ প্রথম শনাক্ত রোগী পাওয়া যায়। আর বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমিত প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ।

আইইডিসিআরের তথ্যমতে, গতকাল পর্যন্ত দেশে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৮৩৮ জন কভিড-১৯ রোগী। মার্চে শনাক্তের সংখ্যা কম থাকলেও তা বাড়তে শুরু করে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে। এর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগী শনাক্তের সংখ্যা। ৮ এপ্রিল একদিনে শনাক্তের সংখ্যা অর্ধশত ছুঁয়ে যায়, ৫৪ জন। এরপর ৯ এপ্রিল ১১২ জন, ১০ এপ্রিল ৯৪, ১১ এপ্রিল ৫৮, ১২ এপ্রিল ১৩৯, ১৩ এপ্রিল ১৮২, ১৪ এপ্রিল ২০৯, ১৫ এপ্রিল ২৬৮, ১৬ এপ্রিল ২৯২ ও গতকাল ২৬৬ জন শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে সংক্রমণের হার কবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে তার যথাযথ প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছি। এই মুহূর্তে এতটুকু বলতে পারি যে সংক্রমণের হার এখনই কমবে না।

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন দেশ লকডাউন বা অবরুদ্ধ অবস্থা কার্যকর করেছে। এতে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার আগে লকডাউন কার্যকর করেছে নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপ। এ তিনটি দেশে সংক্রমণের হারও তুলনামূলক কম। এখন পর্যন্ত দেশ তিনটিতে কভিড-১৯-এ মৃত্যু ঘটেনি। তবে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশে লকডাউনের বিষয়ে সিদ্ধান্তের বিলম্বে ভাইরাসটির সংক্রমণ ক্রমেই বাড়ছে।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, গতকাল পর্যন্ত ভারতে সংক্রমিতের সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৮৩৫, পাকিস্তানে ৭ হাজার ২৫ ও আফগানিস্তানে ৯০৬ জন।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজিস্ট ও সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, যে হারে সংক্রমণ হচ্ছে, তাতে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংক্রমণের পর্যায় আসেনি আমাদের। সামনে আরো সংক্রমণ হতে পারে। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা যেতে পারে, মে মাসের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে সংক্রমণের সর্বোচ্চ পরিস্থিতিতে পৌঁছতে পারি আমরা। তবে সংক্রমণের বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করে নিয়ন্ত্রণের ওপর।

তিনি বলেন, মূলত নিজ নিজ দেশের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি প্রক্ষেপণের ভিত্তিতে কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। তবে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রক্ষেপণ দিতে পারেননি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এ ধরনের প্রক্ষেপণের প্রয়োজনের বিষয়ে সরকারের কাছে বলছি আমরা। পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমণ শনাক্ত করার বিকল্প নেই।

বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে করোনা সংক্রমণ মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। এখনো পুরোপুরি লকডাউন শুরু না হলেও স্বল্পমেয়াদে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে এবং দীর্ঘমেয়াদে জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত দেশটিতে লকডাউন থাকতে পারে। জার্মানিতে সংক্রমণ মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। দেশটিতে স্বল্পমেয়াদে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ আর দীর্ঘমেয়াদে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত লকডাউন স্থায়ী হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিসিজি। আর যুক্তরাজ্যে করোনা সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে। দেশটিতে স্বল্পমেয়াদে লকডাউন থাকতে পারে জুনের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত, যা দীর্ঘমেয়াদে জুলাইয়ের চতুর্থ সপ্তাহে গড়াতে পারে। ফ্রান্সে মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে সংক্রমণ। স্বল্পমেয়াদে লকডাউন থাকতে পারে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ আর দীর্ঘমেয়াদে জুলাইয়ের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত। স্পেনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে এপ্রিলের চতুর্থ সপ্তাহে। আর স্বল্পমেয়াদে লকডাউন থাকতে পারে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত, যা দীর্ঘমেয়াদে জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে গড়াতে পারে। ইতালিতে এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। দেশটিতে স্বল্পমেয়াদে লকডাউন থাকতে পারে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। দীর্ঘমেয়াদে দেশটিতে লকডাউন অব্যাহত থাকতে পারে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। কানাডায় মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। দেশটিতে স্বল্পমেয়াদে জুনের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত লকডাউন থাকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে যা থাকতে পারে জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। বেলজিয়ামে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। দেশটিতে স্বল্পমেয়াদে লকডাউন বলবৎ থাকতে পারে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত, আর দীর্ঘমেয়াদে জুলাইয়ের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত। ভারতে জুনের তৃতীয় সপ্তাহে সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। স্বল্পমেয়াদে লকডাউন থাকতে পারে জুনের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত, দীর্ঘমেয়াদে যা সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সংক্রমণ রোধে বিধিনিষেধগুলো মেনে চলা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে চলতি মাসের শেষ নাগাদ ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বলে মত তাদের।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। তারা এ ধরনের প্রক্ষেপণ তৈরিতে যথেষ্ট অভিজ্ঞ। এখনো প্রক্ষেপণ করা না হলেও শিগগিরই তা করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

আরও