ভরা মৌসুমেও দাম কম গলদা চিংড়ির

আগে থেকেই নানা সংকটে ভুগছিল দেশের চিংড়ি উৎপাদন। করোনাকালে তীব্র আকার ধারণ করেছিল এ সংকট। অন্যদিকে ভরা মৌসুমেও পণ্যটি থেকে ভালো দাম না পাওয়ায় আরো ঘনীভূত হয়েছে চিংড়ি চাষীদের সংকট।

আগে থেকেই নানা সংকটে ভুগছিল দেশের চিংড়ি উৎপাদন। করোনাকালে তীব্র আকার ধারণ করেছিল এ সংকট। অন্যদিকে ভরা মৌসুমেও পণ্যটি থেকে ভালো দাম না পাওয়ায় আরো ঘনীভূত হয়েছে চিংড়ি চাষীদের সংকট। 

দেশের সবচেয়ে বেশি চিংড়ি উৎপাদন হয় বাগেরহাটে। জেলাটিতে উৎপাদিত চিংড়ির ৯০ শতাংশই রফতানি হয় বিদেশে। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ প্রতিকূল নানা কারণে আগে থেকেই বেশ হতাশ অবস্থায় ছিলেন বাগেরহাটের চিংড়ি চাষীরা। বর্তমানে ভরা মৌসুমেও ভালো দাম তুলতে না পেরে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির মধ্যে দিন পার করছেন তারা।

বাগেরহাটে ৬৬ হাজার ৭১৩ হেক্টর জমিতে বাগদা ও গলদা চিংড়ির ঘের রয়েছে ৭৮ হাজার ৬৮৫টি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এসব ঘের থেকে মোট ১৬ হাজার ৫৭৫ টন বাগদা ও ১৫ হাজার ৪১৩ টন গলদা চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে ৩৩ হাজার ৪১৩ টন। সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে চলতি অর্থবছরেও ভালো উৎপাদনের আশা করছিলেন চিংড়ি চাষীরা। কিন্তু বর্তমানে ভরা মৌসুমে হঠাৎ করেই দরপতন হয়েছে পণ্যটির। বিশেষ করে ঘের থেকে বিক্রয়যোগ্য পণ্য আহরণের মুহূর্তেই হঠাৎ করে দাম পড়ে যায় গলদা চিংড়ির।

ফকিরহাট উপজেলার বানিয়াখালী গ্রামের চাষী অভিজিৎ রায় বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে গলদা ও বাগদা চিংড়ির দাম একদম কম ছিল। পরবর্তী সময়ে কিছুদিন দামটা একটু বেড়েছিল। যে সময়টায় দাম বেশি ছিল, তখন বাজারে পণ্যটির সরবরাহ তেমন ছিল না। এখন ভরা মৌসুম, আমরা সবাই আহরণ করছি। এ সময়ে এসে চিংড়ির দাম একেবারেই কমে গিয়েছে। গত এক সপ্তাহে আকারভেদে প্রতি কেজি গলদা চিংড়ির দাম কমেছে ২০০-৩০০ টাকা করে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে জোগান বেশি থাকার কারণেই এখন পণ্যটির দাম কমতির দিকে। তবে একের পর এক দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার পর পতনের এ স্বাভাবিক ধারাও এখন চিংড়ি চাষীদের জন্য অনেক ভারী হয়ে পড়েছে। 

সুবোধ কুমার বালা নামে এক চিংড়ি চাষী বলেন, নানা দুর্যোগের কারণে প্রতি বছরই লোকসান গুনতে হয় আমাদের। এরপর ধারদেনা ও ঋণ নিয়ে চিংড়ি চাষ করে বিক্রির সময় দাম কম পাই। আর দিন দিন চিংড়ির খাবার ও আনুষঙ্গিক সবকিছুর দাম বাড়লেও গলদার দাম কমছে। এর ফলে আমরা লোকসানের মুখে পড়েছি।

এছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীরাও চিংড়ি চাষীদের অনেক দুর্ভোগের কারণ বলে মনে করছেন ফকিরহাট উপজেলার মূলঘর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিটলার গোলদার। তিনি বলেন, আমাদের এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে গলদা চিংড়ি উৎপাদন হয়। কিন্তু যারা উৎপাদন করে, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে তারা লাভের মুখ দেখতে পারেন না। যখন বাজারে চিংড়ির সরবরাহ বেশি থাকে, তখন কোম্পানির মালিকরা দাম কমিয়ে দেন। এ কারণে চাষীরা লোকসানের মুখে পড়েন। সরকার যদি যথাযথভাবে বাজার মনিটরিং ও নতুন বাজার সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়, তাহলে চিংড়ি চাষীরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। 

বাগেরহাট জেলা চিংড়ি চাষী সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম সুমন বলেন, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আমরা চিংড়ি চাষীরা বার বার লোকসানের মুখে পড়ছি। এর পরও জীবিকার তাগিদে ও দেশের স্বার্থে আমরা চিংড়ি চাষ করে যাচ্ছি। কিন্তু চিংড়ি উৎপাদনের ভর মৌসুমে পণ্যটির দাম কমে যায়। আমরা সারা বছর যে টাকা ও শ্রম বিনিয়োগ করি, ভরা মৌসুমে দাম কমার কারণে আশানুরূপ মুনাফা অর্জন করতে পারি না। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারিভাবে বাজার মনিটরিংসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনায় জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। চিংড়ি নীতিমালা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি চাষীদের সহজ শর্তে ঋণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

বাগেরহাট জেলা মত্স্য কর্মকর্তা ড. খালেদ কনক বলেন, নানা দুর্যোগ ও করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও মত্স্য বিভাগের পরামর্শ এবং চাষীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এ বছর গলদা-বাগদার উৎপাদন ভালো হয়েছে। চাষীদের অভিযোগ অমূলক নয়। করোনা পরিস্থিতিতে রফতানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক না হওয়ায় গলদা চিংড়ির দাম কিছুটা কমেছে। তবে রফতানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হলে এ দাম বৃদ্ধি পাবে। মত্স্য অধিদপ্তরও গলদা চিংড়ির জন্য নতুন বাজার সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে।

আরও