ভারত-ইইউ এফটিএ আলোচনা সম্পন্নের ঘোষণা

প্রতিযোগিতার চাপে ইউরোপে বাজার হারানোর শঙ্কায় বাংলাদেশী পোশাক

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ভারতের মধ্যে একটি বৃহৎ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মানুষ একে ‘মাদার অব অল ডিলস’ বলে অভিহিত করছে জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, এ চুক্তি দুই অঞ্চলের জনগণের জন্য বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ভারতের মধ্যে একটি বৃহৎ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মানুষ একে ‘মাদার অব অল ডিলস’ বলে অভিহিত করছে জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, এ চুক্তি দুই অঞ্চলের জনগণের জন্য বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করবে। ভারতের গোয়ায় গতকাল ইন্ডিয়া এনার্জি উইক ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে (এফটিএ) দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে সহযোগিতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।

ইইউ ও ভারতের মধ্যে হতে যাওয়া এফটিএ চুক্তি অবশ্য তৈরি পোশাকভিত্তিক রফতানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইইউর সঙ্গে এফটিএর মাধ্যমে বাংলাদেশও যদি প্রতিযোগিতার সমান ক্ষেত্র তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অবধারিতভাবে ইউরোপে বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের বাজার হারানোর আশঙ্কা করছেন এ খাতের রফতানিকারকরা। তবে ২০২৯ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়া পর্যন্ত ইইউ ও ভারতের মধ্যে হতে যাওয়া এফটিএ চুক্তির তেমন কোনো প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে না বলেও জানিয়েছেন তারা।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত ও ইইউর চুক্তির প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশকে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। কারণ এর গুরুত্বপূর্ণ বা সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে। ওই চুক্তির মাধ্যমে ভারত পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে পারে। সুতা-কাপড়ে ভারতের স্থানীয় শিল্পসক্ষমতা অনেক বড় ও শক্তিশালী। ফলে দেশটি থেকে আমদানিতে পণ্যের উৎপত্তিস্থল বা রুলস অব অরিজিন-সংক্রান্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্ত ভারত সহজেই উতরাতে পারবে।

অন্যদিকে, এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরে ইইউতে বাংলাদেশ কী পাবে সেটা এখনো ঠিক হয়নি। গ্র্যাজুয়েশনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশ করতে গেলে পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো সুবিধা নাও পেতে পারে। যদি তা-ই হয়, তাহলে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর ইইউতে বাংলাদেশকে জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তবে জিএসপি প্লাস পেলেও বাংলাদেশ পোশাক পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। কারণ ওই সুবিধা পেতে ইইউর রুলস অব অরিজিন শর্তের যে সীমা, তার চেয়ে অনেক বেশি পোশাকপণ্য ওই অঞ্চলে রফতানি করে বাংলাদেশ। এ সীমার বিষয়টি যদি অনুকূলে আনা সম্ভব না হয়, তাহলে চরমভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপর। আর জিএসপি প্লাস সুবিধার মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে সমতাসূচক অবস্থান তৈরি হবে। সমান অবস্থান হলেও ভারতের যেহেতু স্থানীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প অনেক শক্তিশালী, কাজেই সেখানে অনেক বেশি প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করতে হবে।

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (আরএপিআইডি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইইউ-ভারত এফটিএ আলোচনা সম্পন্নের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে এখন দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এনগেজ হতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে এলডিসির পর ইইউতে যেন বাংলাদেশও ভালো একটা ডিল পায়। না হলে বাংলাদেশ মারাত্মক প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। আমি মনে করি, ভারত-ইইউ চুক্তি আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের রফতানি পণ্য তেমন কিছু নেই, আর ইউরোপে পোশাক পণ্যই সবচেয়ে বেশি রফতানি করে বাংলাদেশ। কাজেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে আমাদের পোশাক পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা অনেক বাড়বে।

এ চুক্তির ফলে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে আরো বলেন, ‘হ্যাঁ। বিশেষ করে এখন জিএসপি পাওয়ার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের যে শর্ত আছে, সেগুলো যদি একই রকম থাকে, তাহলে অবশ্যই আমাদের ওপর বড় মাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বসতে হবে। নিশ্চিত হতে হবে যে ইইউতে বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস সুবিধা পাবে এবং একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। জিএসপি প্লাসের ক্ষেত্রে রুলস অব অরিজিনে বাংলাদেশকে দুই স্তরের (ডাবল স্টেজ) শর্ত প্রতিপালন করতে হবে, এ বিষয়টিই দরকষাকষির মাধ্যমে এক স্তরের সুবিধায় আনতে হবে।’

গতকাল প্রকাশিত এফটিএ আলোচনা সম্পন্নবিষয়ক ইইউর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত আজ একটি ঐতিহাসিক, উচ্চাভিলাষী এবং বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আলোচনা সম্পন্ন করেছে। এটি উভয় পক্ষের জন্যই এখন পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় এফটিএ। এ চুক্তি এমন এক সময়ে বিশ্বের দ্বিতীয় ও চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরো গভীর করবে, যখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। একই সঙ্গে এটি অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা ও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যের প্রতি উভয় পক্ষের যৌথ অঙ্গীকারকে তুলে ধরছে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেন, ‘আজ ইইউ ও ভারত ইতিহাস সৃষ্টি করল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই গণতন্ত্রের অংশীদারত্ব আরো গভীর হলো। আমরা ২০০ কোটি মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করেছি, যেখানে উভয় পক্ষই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। আমরা বিশ্বকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছি যে নিয়মভিত্তিক সহযোগিতা এখনো বড় সাফল্য এনে দিতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কেবল শুরু, এ সাফল্যের ওপর ভর করে আমরা সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করব।’

বর্তমানে ইইউ ও ভারতের মধ্যে বছরে ১৮০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি পণ্য ও সেবার বাণিজ্য হয়, যা ইইউর প্রায় আট লাখ কর্মসংস্থানকে সমর্থন করে। এ চুক্তির ফলে ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতে ইইউর পণ্য রফতানি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ভারতে ইইউর ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশ পণ্য রফতানির ওপর শুল্ক সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বাতিল বা কমানো হবে। সামগ্রিকভাবে এ শুল্ক হ্রাসের ফলে ইউরোপীয় পণ্যের ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ইউরো শুল্ক সাশ্রয় হবে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ইইউ ও ভারতের মধ্যে এফটিএ আলোচনা প্রথম শুরু হয় ২০০৭ সালে। ২০১৩ সালে আলোচনা স্থগিত হয় এবং ২০২২ সালে পুনরায় শুরু হয়। শেষ (১৪তম) আনুষ্ঠানিক আলোচনার রাউন্ড হয় ২০২৫ সালের অক্টোবরে। একই সঙ্গে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে।

এফটিএ আলোচনা সম্পন্নের ঘোষণায় ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকদের। কারণ বাংলাদেশী পোশাক রফতানির সবচেয়ে বড় অঞ্চল ইইউ। অর্থমূল্য বিবেচনায় বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানির ৮১ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক। পণ্যটির মোট রফতানির ৫০ শতাংশই হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয়। ফলে সুতা ও কাপড় উৎপাদনে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের টিকে থাকা নিয়ে সংশয় আরো বেড়ে গেছে।

ভারত-ইইউ এফটিএর প্রভাব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেই। সরকারের প্রস্তুতি নেয়ার কথা কিন্তু নিচ্ছে না। বরং সরকার মনে করছে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশের কিছু হবে না। যেহেতু ভারত এফটিএ করছে, আর এ মুহূর্তে আমরা যেহেতু পারছি না, উচিত ছিল ফেব্রুয়ারিতেই আবেদনের মাধ্যমে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রক্রিয়াটি অন্তত তিন বছরের জন্য পিছিয়ে দেয়া। এতে করে আমরা অন্তত ছয় বছর সময় পেতে পারতাম ইইউর সঙ্গে এফটিএ করার জন্য। ভারত কমপক্ষে ৯-১০ বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় এফটিএ আলোচনা সম্পন্ন করেছে। আমাদেরও অন্তত নয় বছর সময় লাগবে। এফটিএ কার্যকর হলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ২৪ শতাংশের গ্যাপ তৈরি হবে। বাংলাদেশ শূন্য শুল্ক পরিশোধ করত। গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশকে ১২ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। ভারত বর্তমানে ১২ শতাংশ দিলেও এফটিএ কার্যকর হওয়ায় কোনো শুল্ক দেবে না। এভাবে পণ্যের মূল্য নির্ধারণে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ২৪ শতাংশের গ্যাপ তৈরি হবে। ফলে প্রভাব কী ধরনের হবে তা সহজেই অনুমেয়। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পরে ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কোনো সুযোগই বাংলাদেশের থাকবে না।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইইউর সঙ্গে এফটিএ করার বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে। তাদের দিক থেকে সম্মতি পেলে আলোচনা শুরু হবে। বেশি দেরি হবে না। ভারতের সঙ্গে আলোচনায় ইইউর যে সময় লেগেছে সেটা স্বাভাবিক না।’

ভারত-ইইউ চুক্তি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকে প্রভাব ফেলতে পারে কিনা, এ বিষয়ে বাণিজ্য সচিব বলেন, ‘আমরা এ রকমটা মনে করছি না। আমরা ইইউতে জিএসপি প্লাস এবং এফটিএ—দুই ধরনের চেষ্টাই করছি। আশা করি দ্রুত আলোচনা সম্পন্ন করতে পারব। বাংলাদেশে ইইউর রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনায় তাদের আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে।’

ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে ইইউর পোশাক আমদানির অর্থমূল্য ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ৮২৭ কোটি ও ৪১৮ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের ১১ মাসে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে ইইউ পোশাক আমদানি করেছে যথাক্রমে ১ হাজার ৮০৫ কোটি ও ৪২৪ কোটি ডলারের। দুই দেশের প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬৫ ও ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ।

পোশাক রফতানিকারকরা বলছেন দুই দেশের রফতানিতে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের ওপর ভারত-ইইউর এফটিএর কোনো প্রভাব না পড়লেও অঞ্চলটির সঙ্গে এফটিএ করতে বাংলাদেশ ব্যর্থ হলে দীর্ঘমেয়াদে বাজার হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বণিক বার্তাকে বলেন, আপাতত কোনো ক্ষতি হবে না, কারণ আমরা শূন্য শুল্কে রয়েছি। এটা অব্যাহত থাকবে ২০২৯ সাল পর্যন্ত। ওই পর্যন্ত আমাদের কোনো সমস্যা নেই। এ সময়ের মধ্যে দ্রুতগতিতে আমাদের প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট এবং এফটিএ করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে ইইউর সঙ্গে পিটিএ ও এফটিএ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় করে ফেলবে বলে আজই আশ্বাস দেয়া হয়েছে। আমরা বলেছি, ভারতের এফটিএ করতে ১৯ বছর সময় লেগেছে, আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কনফিডেন্সের সঙ্গে বলা হয়েছে যে হাতে চার বছর সময় আছে, এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ চুক্তি করে ফেলবে। এ প্রক্রিয়া অনেক আগেই শুরু করা উচিত ছিল। আপাতত আমরা ২০২৯ সাল পর্যন্ত টিকে থাকতে পারব। কিন্তু তারপর আমরা বাজার হারাব, যদি না এ সময়ের মধ্যে আমরা পিটিএ, এফটিএর মতো কিছু করতে না পারি।

শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক কালে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বস্ত্র খাতে আগ্রাসী শিল্পনীতি সহায়তা যেমন কম দামে জমি, বিক্রয়ের ওপর আয়করের অব্যাহতি, দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ আর্থিক সুবিধা প্রদান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে দেশটির মিলগুলো প্রায় ৪০ সেন্টের সমপরিমাণ সহায়তা পেয়ে প্রতি কেজি সুতা রফতানিতে উৎপাদন খরচের চেয়ে ৪০-৫০ সেন্ট মূল্য কমিয়ে বাংলাদেশে রফতানি করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্থানীয় দেশীয় মিলগুলো প্রতিযোগী দেশগুলোর প্রণোদনা প্রদত্ত মূল্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলে এ খাতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে এবং তাদের বিনিয়োগ হুমকির মধ্যে পড়েছে। তৈরি পোশাকের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের এ ভঙ্গুরতা ভারত-ইইউ এফটিএ কার্যকর-পরবর্তী বাংলাদেশের শঙ্কাকে আরো ঘনীভূত করবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরএপিআইডি চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে হলে বাংলাদেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প শক্তিশালী করার পাশাপাশি এর ব্যাপ্তি অনেক বাড়াতে হবে। অতি সম্প্রতি যুক্তরাজ্য বাংলাদেশকে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল স্টেজ সুবিধা বহাল রেখেছে। ফলে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এফটিএ হওয়ার পরও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটিতে সমতা থাকবে। প্রচেষ্টা চালিয়ে ইইউ থেকেও একই ধরণের সুবিধা আদায় করে প্রতিযোগীতায় সমতার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও যথাযথ নীতি কার্যকর করতে হবে, যাতে করে মূল্য কমানোর অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা এড়ানো যায়।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশে ইইউ ডেলিগেশন সূত্রে জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়েছে ইইউ বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের কার্যালয়। এ চিঠিতে বাংলাদেশ-ইইউ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি তালিকা সংযুক্ত করা হয়েছে। চিহ্নিত নন-ট্যারিফ, নিয়ন্ত্রক, অন্যান্যসহ মোট ১৩টি চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ-ইইউর দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠি অনুযায়ী, ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক উন্নয়নে চিহ্নিত ১৩টি চ্যালেঞ্জের মধ্যে প্রথম পাঁচটি অশুল্ক বাধা-বিষয়ক। পরবর্তী আটটি নিয়ন্ত্রক বা নীতিগত ও অন্যান্য সমস্যা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে।

ইইউ-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চিঠিতে উল্লেখ করা উদ্বেগগুলো বিবেচনায় নিলে ইইউ ধরে নেবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে যে উদ্যোগ বাংলাদেশ নিয়েছে তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে এবং বিষয়টিকে বাংলাদেশ যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। ইইউর উত্থাপন করা বিষয়গুলোয় বাংলাদেশ যথাযথ গুরুত্ব দিলে তা এফটিএ সহায়ক হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানের পথে অগ্রসর হলে এফটিএর জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি সহজ হবে।’

আরও