এর অংশ হিসেবে দেশের কয়েকটি পোশাক কারখানার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তত আটটি কারখানাকে এ বিষয়ে নোটিস বা ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন খাতে ধীরগতির চাহিদা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তা ব্যয় সংকোচনের প্রভাব নিয়ে গত এক বছরে একাধিক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে রয়টার্স, ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও ম্যাককিনজি। এসব বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ভোক্তারা তুলনামূলক কম দামের পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। একই সঙ্গে বড় ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় দক্ষতা ও নমনীয়তা বাড়ানোর কৌশল নিচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে এইচঅ্যান্ডএমও তাদের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা আরো ‘রেজিলিয়েন্ট, ফ্লেক্সিবল ও অ্যাজাইল’ করার কৌশলের কথা জানিয়েছে। সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল ভোক্তা চাহিদা, মুনাফার ওপর চাপ এবং বাজার পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের বিষয় উল্লেখ করেছে।
এ বিষয়ে এইচঅ্যান্ডএমের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট কারখানার বিষয়ে মন্তব্য করা হয়নি। এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপ মিডিয়া রিলেশনস বিভাগের পারনিলে স্কানভিগ স্কোনাউ বণিক বার্তাকে জানান, বাণিজ্যিকভাবে সংবেদনশীল তথ্য এবং বাজারভিত্তিক ব্যবসার পরিমাণ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ক্রয়নীতি ও সোর্সিং কৌশল সম্পর্কে যতটা সম্ভব স্বচ্ছ থাকার চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, ‘পণ্য ও গ্রাহককে কেন্দ্র করে আমরা বছরের পর বছর ধরে আমাদের সোর্সিং কৌশল পরিবর্তন ও উন্নত করেছি। দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি এবং গ্রাহকের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম, এমন একটি স্থিতিশীল, নমনীয় ও কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমরা বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছি। বাংলাদেশসহ অন্যান্য সোর্সিং মার্কেটেও এ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’ বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তন বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে পারনিলে স্কানভিগ স্কোনাউ বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও গ্রাহক চাহিদা বলতে আমরা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চলমান পরিবর্তনকে বোঝাচ্ছি। এটি কোনো একক বাজারের জন্য প্রযোজ্য নয়; বরং বৃহত্তর বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ।’
এইচঅ্যান্ডএম জানায়, তারা আশির দশকের শুরু থেকে বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করছে এবং দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় উৎপাদকদের সঙ্গে অংশীদারত্ব বজায় রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্যমতে, বাংলাদেশ তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সোর্সিং মার্কেট। প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ প্রকাশিত সরবরাহকারী তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে তাদের সঙ্গে কাজ করছে ১৮৮টি উৎপাদন ইউনিট বা কারখানা। ইউনিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০৭।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০২০ সালের প্রকাশিত সাপ্লায়ার তালিকায় বাংলাদেশে এইচঅ্যান্ডএমের সঙ্গে যুক্ত কারখানার সংখ্যা ছিল অন্তত ২৩৫। গত কয়েক বছরে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে তাদের সরবরাহ নেটওয়ার্ক আরো সংক্ষিপ্ত ও দক্ষ করার কৌশল নিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে বছরে আনুমানিক ৩ থেকে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য সংগ্রহ করে থাকে এইচঅ্যান্ডএম, যা দেশটিকে প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বৃহৎ সোর্সিং হাবে পরিণত করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এইচঅ্যান্ডএমের নোটিস পাওয়া এক কারখানা মালিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্লোবালি তাদের ডিমান্ড কমে যাচ্ছে, মার্কেট সিচুয়েশন ভালো না, সেটাই আমাদের বলেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা রেগুলার সাপ্লায়ার ছিলাম। দেখা যাক, আমরা চেষ্টা করছি সম্পর্কটা রাখা যায় কিনা।’
সংশ্লিষ্ট আরেক কারখানা মালিক জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। তাই হঠাৎ করে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বন্ধ হয়ে গেলে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। তিনি বলেন, ‘কারখানাটির আন্তর্জাতিক টেকসই মানদণ্ডে উচ্চ স্কোর রয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরেই তারা এইচঅ্যান্ডএমের সঙ্গে কাজ করছে।’
ভালুকাভিত্তিক একটি রফতানিমুখী কম্পোজিট নিট টেক্সটাইল কারখানা সূত্র জানিয়েছে, প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে এইচঅ্যান্ডএমে পণ্য সরবরাহ করে আসা প্রতিষ্ঠানটি এক সপ্তাহ আগে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একটি ই-মেইল পায়, যেখানে ভবিষ্যতে সোর্সিং কমিয়ে আনার ইঙ্গিত দেয়া হয়। তবে চলতি মৌসুমের পণ্য গ্রহণ এবং পরবর্তী মৌসুমের কিছু অর্ডার এখনো বহাল রয়েছে।
কারখানা সূত্রে আরো জানা গেছে, এইচঅ্যান্ডএমের পক্ষ থেকে সম্পর্ক ছিন্নের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার বিষয়টি মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে এরই মধ্যে এইচঅ্যান্ডএমকে ই-মেইল করেছে। এদিকে শিল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, বাংলাদেশ থেকে সোর্সিং বৈচিত্র্য আনার কৌশলের অংশ হিসেবেও এইচঅ্যান্ডএম আরো কিছু কারখানার সঙ্গে ব্যবসা কমিয়ে আনতে পারে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। তবে প্রত্যেক ক্রেতাই তাদের নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়। ধরেন, কোনো ক্রেতার এখন ৫০টি কারখানায় সোর্সিং বেজ আছে। তারা যদি মনে করে একই পরিমাণ ব্যবসা ৪০টি কারখানার মাধ্যমেই করা সম্ভব, তাহলে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও কমে যাবে। সে ক্ষেত্রে কার সঙ্গে সম্পর্ক কমাবে বা নতুন করে কার সঙ্গে কাজ করবে, সেটি পুরোপুরি তাদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত।’
তিনি বলেন, ‘অনেক সময় কিছু কারখানার সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে অন্য কারখানার সঙ্গে যুক্ত হয়, কারণ নতুন প্রতিষ্ঠান হয়তো ভিন্ন ধরনের পণ্য বা নতুন কোনো প্রডাক্ট গ্রুপ দিতে পারছে। তবে রাতারাতি বাংলাদেশ থেকে তারা পুরোপুরি সোর্সিং বন্ধ করে দেবে বা আর কিনবে না, এটা আমি বিশ্বাস করি না।’
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের ‘ফেইড আউট’ বা ধাপে ধাপে অর্ডার কমানোর প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে নতুন নয়। ছয় মাস বা এক বছর পরপর কিছু কারখানাকে তালিকা থেকে বাদ দেয়া কিংবা নতুন কারখানা যুক্ত করার ঘটনা নিয়মিত ঘটে থাকে। ফলে বিষয়টি নিয়ে অযথা আতঙ্ক তৈরির প্রয়োজন নেই বলেও মত দিয়েছেন কেউ কেউ।