ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আগামীকাল শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী জি২০ সম্মেলন। বিশ্বের শিল্পোন্নত ও বিকাশমান অর্থনীতির জোটের এ সম্মেলনে যোগ দিতে আজ ঢাকা ছাড়ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিন বিকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তিনি। নির্বাচনের আগ মুহূর্ত এবং চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। তবে বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল প্রধানমন্ত্রীর এ সফর নিয়ে বাড়তি আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
আওয়ামী লীগ ও শরিক দলগুলোর দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনাকে জি২০ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো দেশের জন্য সম্মানের। বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠককে উল্লেখযোগ্য বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এ সফরের বিষয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না বিএনপি, এমনটাই বলছেন দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা। তাদের প্রত্যাশা, একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশীদারত্বমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ভারতের অবস্থান ইতিবাচক থাকবে।
সফর প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যে ভারত সফর করছেন এটা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। জি২০ সম্মেলনে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে তারা দাওয়াত দিয়েছেন বিশেষ অতিথি হিসেবে। দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র শেখ হাসিনাকেই বিশেষ অতিথি হিসেবে এবার আমন্ত্রণ জানানো হলো। এটা অবশ্যই সম্মানের বিষয়।’
তিনি বলেন, ‘এ সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে নির্বাচন নিয়ে আলাপ-আলোচনা হবে। যেহেতু চার মাস পর আমাদের জাতীয় নির্বাচন আর ভারতের নির্বাচনেরও বাকি ছয় মাসের মতো। সুতরাং দুই প্রধানমন্ত্রী যখন আলোচনা করবেন তখন এটা নিশ্চয়ই রিভিউ হবে। তবে নির্বাচনকেন্দ্রিক ইস্যুতে কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, কোন কোন বিষয় প্রাধান্য পাবে সেটি বলা যাবে না। এছাড়া বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাঁটা হয়ে আছে তিস্তা ইস্যু। সে বিষয়েও এবার আলাপ হবে।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন আওয়ামী লীগের এ জ্যেষ্ঠ নেতা।
কাজী জাফরুল্লাহ বলেন, ‘আমরা ভারতকে আগেই অনুরোধ জানিয়েছি চাল, ডাল, চিনি এমন কিছু নিত্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা বরাদ্দ দিতে। ভারত আমাদের সবচেয়ে কাছের দেশ। আমরা সেখান থেকে খুব দ্রুত নিয়ে এসে আমাদের বাজারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। এছাড়া ভারত কয়েকটি ক্ষেত্রে আর্থিক বিশেষ অনুদান দিয়েছে। কিন্তু আমরা যেভাবে কাজ করতে চেয়েছি সেভাবে না হওয়ার কারণ ভারতের দেয়া শর্তগুলো খুব শক্ত। আমরা আশা করছি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির এবারের বৈঠকে এসব ইস্যু সহজ করার বিষয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি নতুন যেসব ক্ষেত্রে তারা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেবে সেগুলো যাতে স্বল্প সময়ে পাওয়া যায় এবং দ্রুত ব্যবহার করতে পারি সে বিষয়টিও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় প্রাধান্য পাবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে যখন উচ্ছ্বাস ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হচ্ছে, ঠিক তার বিপরীত চিত্র বিরোধী দল বিএনপির। আলোচনায় থাকা এ সফরের বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই বলে জানিয়েছেন দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। বিএনপির বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে বিএনপির কোনো মাথাব্যথা নেই।’
বাংলাদেশের আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভারতের অবস্থান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশ ও সংস্থাগুলো বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও অংশীদারত্বমূলক নির্বাচন চাচ্ছে। ভারতও একই অবস্থানে থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’
তবে এ সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ও উঠে আসতে পারে বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীন দলটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ বৈঠকে কয়েকটি ব্যাপারে আলোচনা হবে। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কী করে এগোনো যেতে পারে এবং যদি কোনো বাধা বা বিপত্তি থাকে, সেটা কীভাবে মোকাবেলা করা যায়। এছাড়া আমাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত হতে পারে আলোচনায়।’
সফর নিয়ে সরকারের অস্বস্তি রয়েছে বলে জানিয়েছেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে তারা সোনালি অধ্যায় বললেও সর্বশেষ ব্রিকস সম্মেলনে ঠিক তার উল্টোটা দেখা গেছে। আমরা চাই ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক পারস্পরিক উন্নয়ন ও বন্ধুত্বের হোক। এমনটি হলে ভালো। পাশাপাশি কিছুদিন আগে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা হবে কিনা সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন। উনি সফরের এজেন্ডা জানেন না, এটা তো বিস্ময়কর। এর অর্থ হলো তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে স্বস্তি বোধ করছেন না। এর পেছনে কারণ হলো ভারত, আমেরিকা ও পশ্চিমা অন্যান্য রাষ্ট্রের বার্তা তিনি খুব ভালোভাবেই পেয়েছেন। অর্থাৎ সব দেশই বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন চাচ্ছে। এছাড়া তিনিও খুব ভালোভাবে জানেন সুষ্ঠু নির্বাচন দেয়া ছাড়া কোনো গতি নেই।’
ভারত সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা রাখতে চান জোটের শরিক দলের নেতারা। তবে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠককে আলাদাভাবে ভাবছেন না তারা।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের অন্যতম শরিক দল ও জাসদের একাংশের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে জি২০ সম্মেলনে যেটুকু ভূমিকা রাখা প্রয়োজন সেটুকু রাখবেন। দেশের জন্য, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তিনি কথা বলবেন। আশা করি, জি২০-তে দেশের স্বার্থ নিয়ে সঠিকভাবেই ভূমিকা রাখবেন। এটুকু আস্থা ও বিশ্বাস আমাদের রয়েছে।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেকোনো আন্তর্জাতিক মিটিংয়ে গেলে বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় এ বৈঠক। এটাকে আলাদাভাবে দেখার কোনো কারণ আছে বলে মনে করি না। এখানে বন্ধুত্বসুলভ আলোচনা হবে। বিশেষ করে দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।’