রাজধানীর সড়কগুলোয় ব্যাপক হারে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপন শুরু হয় ২০০৪ সালের পর। পরবর্তী দুই দশকে সিগন্যাল বাতি, ট্রাফিক কাউন্টডাউন টাইমার, অটো বা স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা, ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেম বা আইটিএসের মতো প্রযুক্তি স্থাপনে প্রায় ২০০ কোটি টাকা খরচ করেছে সরকার। যানজট কমাতে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনায় বিপুল অর্থ খরচ হলেও কোনো সুফল পায়নি রাজধানীবাসী। ঢাকার প্রত্যেকটি ইন্টারসেকশনে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ‘হাতের ইশারা’ পদ্ধতিই ব্যবহার করতে হচ্ছে পুলিশকে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই না করে পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিকভাবে ঢাকায় একের পর এক সিগন্যাল বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর জন্য যেসব পূর্বশর্ত পালন জরুরি ছিল, তা বিবেচনায় না আনায় প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে সিগন্যাল বাতিগুলো।
ঢাকার সিগন্যাল ব্যবস্থা আধুনিকায়ন খাতে অপচয়ের সর্বশেষ উদাহরণ নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্প। এ কাজের মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত হয় স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সেটি সচল রাখতে বসানো হয় সোলার প্যানেল। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে স্থাপিত এ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কোনো কাজেই আসেনি। এ খাতে ব্যয় হওয়া অর্থ পুরোটাই অপচয় হয়েছে।
আইএমইডির তথ্য বলছে, প্রকল্পটিতে খরচ হওয়া ১০০ কোটি টাকার মধ্যে ট্রাফিক সিগন্যাল সরবরাহ ও স্থাপন এবং টিসিডি উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, রিমোট কন্ট্রোল সরবরাহ ও চালু, মেটাল বক্স সরবরাহ ও চালু করতে খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ২১ কোটি টাকা। ২৩টি ইন্টারসেকশনের উন্নতি করতে খরচ হয়েছে ২৭ কোটি টাকার বেশি। ৭৩টি ইন্টারসেকশনের অবকাঠামো উন্নয়ন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচর্যায় ব্যয় হয় ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সিটি ট্রাফিক ব্যবস্থার জন্য ওয়্যারহাউজ নির্মাণের জন্য খরচ হয় ৫ কোটি টাকা। ১৮ ইউনিট সোলার প্যানেল কিনতে ২ কোটি টাকা খরচ হয়। ট্রাফিক সিগন্যালে সোলার প্যানেল, টিসিডি সরবরাহ ও স্থাপন করতে ব্যয় হয়েছে ১৬ কোটি টাকা। ট্রাফিক সিগন্যালগুলো উন্নয়নের জন্য পরামর্শক বাবদ খরচ হয় ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ৫ কোটি টাকা খরচ হয়।
প্রকল্পটির আওতায় স্থাপন করা হয় ১০০টি স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেত ব্যবস্থা। তবে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এসব সিগন্যাল বাতি কোনো কাজেই আসেনি। বাতির ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভিজ্ঞতা, অর্থ ও দক্ষতার অভাবে এসবের সুফল পায়নি রাজধানীবাসী। ২০১৫ সালের ১৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর কাকলী থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ১১টি পয়েন্টে অটোসিগন্যাল চালু করা হয়েছিল। তবে এটি চালুর পর থেকেই তীব্র যানজটের শঙ্কা তৈরি হওয়ায় এর ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়।
প্রকল্পটি শেষ হয়েছে ২০১৯ সালে। আইএমইডির তথ্য বলছে, গুলশান-২ নম্বর ইন্টারসেকশন ছাড়া আর কোথাও এসব সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকর নেই। ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা আইএমইডিকে জানিয়েছেন, বর্তমানে কোনো স্থানে ইন্টারসেকশন রিমোট কন্ট্রোল সিগন্যালিং ব্যবস্থা কার্যকর অবস্থায় নেই। এ ব্যবস্থা চালুর ফলে তেমন কোনো সুবিধা হয়নি বলেও অভিমত প্রকাশ করেন তারা। গুলশান-২ নম্বরে স্থাপিত সিগন্যাল ব্যবস্থাটি সচল থাকলেও গতকাল সরজমিনে সেখানে হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের।
রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে এর আগে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেগুলোও কোনো কাজে আসেনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের আওতায় (২০০৪-২০১২) প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয় ৫৯টি ইন্টারসেকশনে সিগন্যাল ব্যবস্থা। একই সময়ে প্রায় ১৬ কোটি টাকা খরচ করে ঢাকার ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনে বসানো হয় কাউন্টডাউন টাইমার, যার একটিও বর্তমানে আর কার্যকর নেই।
২০১৮ সালের শুরুতে নতুন করে আরো একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক ব্যবস্থা (আইটিএস) নামে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। প্রকল্পটির মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকার মহাখালী, গুলশান-১,৬ পল্টন ও ফুলবাড়িয়ায় আইটিএস স্থাপন করা হয়েছে। যদিও প্রায় ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ের এ ব্যবস্থা বর্তমানে কোনো কাজে লাগছে না।
দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে রাজধানীতে সিগন্যাল বাতি রয়েছে ১০০ পয়েন্টে। এর মধ্যে উত্তরে (ডিএনসিসি) পড়েছে ৬০টি। বাকি ৪০টি রয়েছে দক্ষিণে (ডিএসসিসি)। স্থাপন করার পর থেকে বাতিগুলো সচল রাখতে প্রতি মাসে একটা মোটা অংকের টাকা খরচ করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। প্রতিটি পয়েন্টে সিগন্যাল বাতির বিদ্যুৎ বিল, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে মাসে ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ঢাকার সিগন্যাল বাতিগুলোর পেছনে মাসে ১ কোটি ও বছরে ১২ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে।
সিগন্যাল বাতি স্থাপনের প্রকল্পগুলোয় অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও ঢাকা শহরের মানুষের কোনো লাভ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এক যুগের বেশি সময় ধরে ঢাকা শহরের সিগন্যালগুলো স্থাপন করা হয়েছে। এর কোনোটিই বিদ্যমান যানবাহনের পরিমাণ ও যানবাহনের গতি বিবেচনায় নেয়া হয়নি। যারা এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে পরামর্শক ছিল, যারা বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত ছিল, এ সম্পর্কে তাদের ধারণা আছে কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ তারা যানবাহনের গতি ও ট্রাফিকের পরিমাণ বিবেচনা না করেই এগুলোর নকশা ও বাস্তবায়ন করেছে।’
তিনি বলেন, ‘সিগন্যাল বাতি কিংবা সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকরের জন্য কিছু পূর্বশর্ত রয়েছে। প্রথমত, যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন একসঙ্গে চলাচল বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, পথচারীদের জন্য অবশ্যই ইন্টারসেকশনের চার কোনায় পর্যাপ্ত জায়গা রাখা। তৃতীয়ত, ইন্টারসেকশন ঘেঁষে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন না রাখা। একটা শহরের ট্রাফিকের পরিমাণ যখন তার সক্ষমতার বেশি চলে যায়, তখন সিগন্যাল সেখানে কার্যকর হবে না। সিগন্যাল বাতি স্থাপনের আগে যদি ছোট করে হলেও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হতো, প্রথমেই বের হয়ে আসত—এখানে সিগন্যাল কার্যকর হবে না।’
অন্যদিকে রাজধানীতে স্থাপিত সিগন্যাল ব্যবস্থা অকার্যকর থাকার জন্য সিগন্যাল বাতিগুলো যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করাকে দায়ী করছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও ট্রাফিক বিভাগের প্রধান মুনিবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও সিগন্যাল ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ট্রাফিক বিভাগের সক্ষমতার কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু আমরা যে সিগন্যাল বাতিগুলো ব্যবহার করব তার জন্য সেগুলো কার্যকর থাকতে হবে। এসব বাতি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।’
তিনি আরো বলেন, ‘একটি সংস্থা সিগন্যাল বাতি রক্ষণাবেক্ষণ করবে, আরেকটি সংস্থা সেগুলো পরিচালনা করবে—এমন হলে কিন্তু সেগুলো যথাযথভাবে কার্যকর রাখার কাজটি কঠিন হয়ে যায়। এসব দায়িত্ব একটি সংস্থার হাতে থাকলে সিগন্যাল ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা সহজ হয়ে যেত।’