পর্যটকশূন্য সিলেট, দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা সিলেটে রয়েছে চা বাগান, জলাবন, পাথুরে নদী, হাওরসহ বেশকিছু পর্যটন কেন্দ্র।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা সিলেটে রয়েছে চা বাগান, জলাবন, পাথুরে নদী, হাওরসহ বেশকিছু পর্যটন কেন্দ্র। দেশের পর্যটন খাত থেকে আহরিত রাজস্বের বড় একটি অংশ আসে এখান থেকে। তবে ভরা মৌসুমে দফায় দফায় বন্যায় ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হয় পর্যটন কেন্দ্র। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আবারো ধস নেমেছে পর্যটন খাতে। কারফিউর কারণে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে পর্যটন কেন্দ্রগুলো। এ অবস্থা চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির আশঙ্কা করছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দফায় দফায় ধাক্কা আর সামলে উঠতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। পর্যটন শিল্পে ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা কঠিন। হোটেল মোটেল রিসোর্ট ব্যবসায় রীতিমতো ধস।

সিলেট হোটেল মোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলায় পাঁচ শতাধিক হোটেল মোটেল রয়েছে। যার বেশির ভাগ এখনো ফাঁকা। ঈদের দিন থেকে বন্যা শুরু হওয়ায় প্রশাসন পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপর থেকে দফায় দফায় বন্যার কারণে সিলেটমুখী হননি পর্যটকরা। এবার কারফিউর কারণে বন্ধ রয়েছে সবকিছু।

জাফলংয়ের পর্যটন ব্যবসায়ী মো. হোসেন মিয়া জানান, জাফলং এলাকায় পর্যটনসংশ্লিষ্ট রেস্তোরাঁ, হোটেল ও রিসোর্টসহ পাঁচ শতাধিক দোকান রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। সবাই এখন বেকার। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ভেবেছিলেন মোটামুটি ভালো কিছু হবে। কিন্তু কোটা আন্দোলনের কারণে সংঘাত-সংঘর্ষ ও কারফিউ চলমান থাকায় পর্যটকদের আগমনের হার এখন শূন্যের কোটায় চলে এসেছে। তাদের দৈনিক কয়েক লাখ টাকার বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। জাফলংয়ে তিন শতাধিক ফটোগ্রাফার রয়েছেন। পর্যটক না আসায় তারাও বেকার হয়ে পড়েছেন।

জাফলং গ্রিন রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাবলু বখত জানান, ঈদের দিন থেকে এখন পর্যন্ত রুম বুকিং নেই বললেই চলে। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর কয়েক দিন পর্যটক আসা শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎ কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে পর্যটকরা আসার সুযোগই পাচ্ছেন না। তাদের এখন টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পর্যটকদের অপেক্ষায় সারিবদ্ধভাবে শত শত নৌকা নদীর ঘাটে বাঁধা রয়েছে। ঘাটের পাশে শত শত দোকানের মাঝে হাতে গোনা কয়েকটি খোলা থাকলেও বেশির ভাগ বন্ধ। এর মধ্যে কয়েকটি রেস্তোরাঁ খোলা থাকলেও খালি পড়ে আছে চেয়ারগুলো। পর্যটক না থাকায় দোকান বন্ধ করে অনেকে কর্মহীন।

সাদা পাথর পর্যটন ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সফাত উল্লাহ জানান, পর্যটন এলাকার শতাধিক কসমেটিকসের দোকান, ১০টি রেস্তোরাঁ, কয়েকটি হোটেল, রিসোর্ট, শতাধিক ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শত শত নৌকা রয়েছে। এসব ব্যবসায়ী পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। ঈদে কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা হয় এখানে। কিন্তু বন্যা ও চলমান অস্থিরতার কারণে গত এক মাসে তাদের ৯০ শতাংশ ব্যবসা কমে গেছে।

স্টাফদের বেতনসহ আনুষঙ্গিক খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে জানান সাদা পাথর রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জুয়েল রানা। তিনি বলেন, ‘ঈদের আগেই আমাদের রিসোর্টে অগ্রিম কিছু বুকিং ছিল। ঈদের দিন থেকে বন্যা শুরু হলে সব বুকিং বাতিল হয়ে যায়। বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর আরো কিছু বুকিং হয়েছিল। তবে দেশের চলমান পরিস্থিতির কারণে সেগুলোও বাতিল হয়েছে। গত কয়েক দিন কোনো পর্যটকের মুখও দেখছি না আমরা।’

সিলেট নগরীঘেঁষা পর্যটন কেন্দ্র রাতারগুল। ভরা মৌসুম হলেও এখনো পর্যটকের আনাগোনা বাড়েনি। শুধু রাতারগুলো নয় বন্যার কারণে পুরো পর্যটন খাতে স্থবিরতা দেখা দেয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চলমান অস্থিরতা।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি তাহমিন আহমদ বলেন, ‘পর্যটনের সঙ্গে কেবল হোটেল নয়, অনেক বিষয় জড়িত। এর সঙ্গে পরিবহন, রেস্তোরাঁ, শপিংমল ও নৌকার বিষয়টিও জড়িত। অর্থাৎ পর্যটকরা যেদিকে যাবেন, সেদিকে আর্থিক বিষয় সম্পৃক্ত। পর্যটক না আসায় সব খাতেই এর প্রভাব পড়েছে। এ কয়দিনে নিশ্চয়ই পর্যটন খাতে ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।’

তাহমিন আহমদ আরো বলেন, ‘২০২০-২১ সাল গেছে কভিডের মধ্য দিয়ে। ২০২৩ সালে ঘুরে দাঁড়ানোর একটু চেষ্টা ছিল, কিন্তু ২০২৪ সালের দফায় দফায় বন্যা ও আন্দোলনে সব শেষ হয়ে গেছে। ঈদের পর থেকে সিলেটের পর্যটন খাত খুব কঠিন সময় পার করছে। এ খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারি প্রণোদনা প্রয়োজন।’

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্যার কারণে শিল্প বাণিজ্যের সব খাতে কোনো না কোনোভাবে ক্ষতি হয়েছে। দেশের চলমান পরিস্থিতিতে শুধু পর্যটন খাত নয়, সব খাতের ক্ষতি হয়েছে।’

আরও