চট্টগ্রাম টার্মিনালে ইজারা বন্ধের দাবিতে প্রতীকী গণঅনশন

২২ জুলাই মশাল মিছিল

গণঅনশন ভঙ্গের আগে আবুল মোমেন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের আমদানি-রফতানির বড় অংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে জনগণের মতামত, বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও সংসদীয় আলোচনা প্রয়োজন ছিল। জনগণকে অন্ধকারে রেখে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি। আজ শনিবার এ দাবিতে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব চত্বরে প্রতীকী গণঅনশন কর্মসূচি পালন করা হয়। একই সঙ্গে আগামী ২২ জুলাই সন্ধ্যা ৬টায় চেরাগী পাহাড় মোড় থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত মশাল মিছিলের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

আজ সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত গণঅনশনে বিভিন্ন রাজনৈতিক, শ্রমিক, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা সংহতি জানিয়ে অংশ নেন। কর্মসূচি উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার। সঞ্চালনা করেন সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু।

পরে বিকাল ৩টায় কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন অংশগ্রহণকারীদের শরবত পান করিয়ে প্রতীকী গণঅনশন ভঙ্গ করান।

সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সিবিএর সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, জাতীয়তাবাদী ডক শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, সিপিবি চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অশোক সাহা, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, কলামিস্ট কানাই দাস, ন্যাপ নেতা মিতুল দাসগুপ্ত, অ্যাডভোকেট জহির উদ্দিন মাহমুদ, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শ ম জামাল উদ্দিন, টিইউসি নেতা ইফতেখার কামাল খান, শ্রমিক দল নেতা শাহনেওয়াজ চৌধুরী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক সীতারা শামীম, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ইব্রাহীম ফরাজী ও আজিজ উদ্দিন মিন্টু, যুব ইউনিয়নের নেতা মেহেদী হাসান মিন্টু, বন্দর শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম বাবু, বন্দর লেসিং-আনলেসিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. ইকবাল, হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. হানিফ, বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. আব্দুর রহিমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, শ্রমিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতারা।

গণঅনশন ভঙ্গের আগে আবুল মোমেন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের আমদানি-রফতানির বড় অংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে জনগণের মতামত, বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও সংসদীয় আলোচনা প্রয়োজন ছিল। জনগণকে অন্ধকারে রেখে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয় গৌরবের প্রতীক। বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নিজস্ব জনবল, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ভবিষ্যতে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। তিনি সরকারের প্রতি এনসিটি ও সিসিটি ইজারার প্রক্রিয়া বন্ধের সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়ার আহ্বান জানান।

মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, রাষ্ট্রের কৌশলগত ও লাভজনক সম্পদ জনগণের সম্পদ। এসব সম্পদ বিদেশী করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রবণতা দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য শুভ নয়। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তির বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হয়।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। দক্ষ জনবল ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সরকার জনগণের মতামত উপেক্ষা করে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে এগোলে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন আরো বিস্তৃত হবে। জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তপন দত্ত বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা এবং দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। অথচ বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বন্দরকে আরো আধুনিক করা সম্ভব। বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ গেলে কর্মসংস্থান, শ্রমিক অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তিনি সরকারের প্রতি ইজারার প্রক্রিয়া বন্ধের আহ্বান জানান। অন্যথায় শ্রমিক সংগঠনগুলো বৃহত্তর আন্দোলনে যাবে বলে জানান।

কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর এ দেশের শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জনগণের দীর্ঘদিনের শ্রম, দক্ষতা ও ত্যাগের ফসল। অতীতে নানা সংকটেও নিজস্ব জনবল দিয়েই বন্দর সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে। তাই লাভজনক দুটি টার্মিনাল বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

তিনি বলেন, বন্দরের উন্নয়ন প্রয়োজন হলে সরকার আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও জনবল উন্নয়নে বিনিয়োগ করুক। কিন্তু জাতীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ বিদেশীদের হাতে তুলে দিয়ে উন্নয়নের কথা বলা যায় না। বন্দর রক্ষার আন্দোলনে শ্রমিকরা অতীতের মতো এবারো অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

অন্যান্য বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার এবং জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। জনগণের মতামত উপেক্ষা করে লাভজনক টার্মিনাল বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেয়া হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা এনসিটি ও সিসিটি ইজারার সব ধরনের উদ্যোগ বাতিলের সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়ার আহ্বান জানান।

বক্তারা আরো বলেন, বন্দর রক্ষা কমিটির এ আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়। এটি দেশের স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন। তারা সরকারের প্রতি জনগণের দাবি মেনে ইজারার প্রক্রিয়া বন্ধের আহ্বান জানান। অন্যথায় চট্টগ্রামসহ সারা দেশে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে সতর্ক করেন।

গণঅনশন শেষে প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার আগামী ২২ জুলাই সন্ধ্যা ৬টায় চেরাগী পাহাড় মোড় থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত মশাল মিছিলের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের কাছে জাতীয় সম্পদ রক্ষার দাবিতে জনগণের দৃঢ় অবস্থান আবারো তুলে ধরা হবে।

সমাবেশ শেষে বন্দর রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে চলবে। একই সঙ্গে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হবে।

আরও