আগামী জুন পর্যন্ত চাহিদা ও মজুদের প্রাক্কলন রয়েছে ছয় লাখ টনের। সে হিসাবে প্রাক্কলিত মজুদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি দুই-তৃতীয়াংশ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বাংলাদেশে সারের এ সংকট তৈরি হয়েছে। তবে দুই সপ্তাহ যুদ্ধবিরতির মধ্যে আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থেকে ৪০ হাজার টন করে ইউরিয়া আসার কথা রয়েছে। যদিও এ সময়ের মধ্যে সার আনা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন দায়িত্বশীলরা।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, আগামী অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা রয়েছে ২৬ লাখ ২২ হাজার টন। চাহিদা মিটিয়েও ন্যূনতম চার থেকে পাঁচ লাখ টনের মজুদকে নিরাপদ ধরা হয়। এ মুহূর্তে ইউরিয়ার মজুদ আছে মাত্র ২ লাখ ১৭ হাজার টন। জুন পর্যন্ত এ পরিমাণ সারের চাহিদাই রয়েছে। ফলে এর মধ্যে উৎপাদন ও আমদানি বাড়াতে না পারলে মজুদ ফুরিয়ে আসতে পারে। এরপর জুলাই-আগস্টে শুরু হবে আমন মৌসুম। সে সময় আরো ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পুরনো উৎস সৌদি আরব, আরব আমিরাত, চীনের পাশাপাশি ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে সরকার। এছাড়া রাশিয়া ও বাহরাইন থেকে পাওয়া প্রস্তাবও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
দেশে ইউরিয়া সার আমদানি ও উৎপাদনের কাজটি করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। সংস্থাটি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। বিষয়টি নিয়ে শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমানের মন্তব্য জানতে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে গত বৃহস্পতিবার জ্বালানি সংকট নিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক সেমিনারে শিল্প সচিব বলেন, ‘প্রতি বছর আমাদের একটা টার্গেট থাকে, আগামী জুন পর্যন্ত ছয় লাখ টন সার স্টক থাকবে। কিন্তু আমাদের হিসাবে এখন পর্যন্ত আছে ২ দশমিক ১৭ লাখ টন। তার মানে চার লাখ টনের ওপরে আমাদের ক্রাইসিস (ঘাটতি) এখনো আছে। জ্বালানি সংকট আমাদের দেশে অনেক আগে থেকেই আছে। ইরান, ইসরায়েল ও আমেরিকা যুদ্ধের কারণে সেটা আরো তীব্র হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকটি সেক্টর রয়েছে, যেগুলোর জ্বালানি বিশেষ করে গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আমাদের পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে একটি চলছে। একটি চলছে বলতে—ঘুরেফিরে তারা একটিতেই গ্যাস দিতে পারছে। গ্যাসের জন্য আমরা ১৬ টাকা করে সরকারকে পরিশোধ করতাম। তারা বাইরে থেকে এনার্জি এনে সেগুলো গ্যাসের সঙ্গে মিক্সার করে সার কারখানায় দেয়ার কথা হয়েছিল। সারা বছর যেন সার কারখানায় গ্যাস দিতে পারে সেজন্য সারে গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়। কিন্তু সারা বছর কেন, আমরা তিন-চার মাসও গ্যাস পাচ্ছি না।’ হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট ইস্যুতে সচিব আরো বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে এখন যেটা হচ্ছে কোনো কিছু আমদানি করতে গেলে যে সমস্যাগুলো হচ্ছে, নিষেধাজ্ঞা বা ইরানের হুমকির পাশাপাশি সবকিছু মিলিয়ে আমরা একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থায় আছি। সামনে পিক সিজন (আমন) আসছে, ওখানে সাড়ে ছয় লাখ টনের মতো সার (ইউরিয়া) লাগবে। কিন্তু আমাদের হাতে এখন মজুদ নেই।’
বিসিআইসির একটি সূত্র জানিয়েছে, অর্থবছরের শেষ মাস জুনে অন্তত চার লাখ টন ইউরিয়া মজুদ রাখা হয়। পাশাপাশি মে ও জুনেও ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে। সেজন্য এ সময়ের চাহিদা এবং নিরাপদ মজুদ মিলিয়ে জুন পর্যন্ত অন্তত ছয় লাখ টন ইউরিয়া প্রয়োজন। এছাড়া সামনে আমন মৌসুমে বড় চাহিদা রয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত দেশে ইউরিয়ার মজুদে বড় ঘাটতি রয়েছে।
জানতে চাইলে বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী, জুন শেষে আমাদের চার লাখ টন মজুদ থাকার কথা। জুনের পর আমন মৌসুমে চাহিদা রয়েছে সাড়ে ছয় লাখ টন। আমন মৌসুমকে লক্ষ্য রেখে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে তিন লাখ টন ইউরিয়া আমদানির লক্ষ্য রয়েছে। চলতি মাসে দেশ দুটির ৪০ হাজার টন করে ইউরিয়া দেয়ার কথা।
যদিও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সৌদি আরব ও আমিরাত থেকে সার আনা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে বিসিআইসি কর্মকর্তারাও শঙ্কিত। এ বিষয়ে মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বিকল্প উৎস নিয়ে সরকার কাজ করছে। রাশিয়া ও বাহরাইন থেকে প্রস্তাব এসেছে। সেগুলোর পর্যালোচনা চলছে। মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও ব্রুনাইও বিকল্প উৎস হিসেবে রয়েছে। এরই মধ্যে ব্রুনাইয়ের সঙ্গে মিটিংও হয়েছে। তবে এখনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি।’
কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং) মো. খোরশেদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারিভাবে সাধারণত সারা বছরই চার-পাঁচ লাখ টন মজুদ রাখা হয়। এ পরিমাণ সারের মজুদকে নিরাপদ ধরা হয়। বিগত পাঁচ-সাত বছর যে পরিমাণ মজুদ থাকে সেই তুলনায় এবার আমাদের কাছে নেই। অন্য বছর স্যার (শিল্প সচিব) যে পরিমাণের কথা বলেছেন, গড়ে সেটাই মজুদ থাকত। এবার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং যুদ্ধের কারণে পরিবহন বন্ধ থাকায় মজুদ কমেছে। তবে যেটুকু মজুদ আছে তা দিয়ে জুন পর্যন্ত চাহিদা পূরণ করা যাবে।’
বিসিআইসি সূত্র জানিয়েছে, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের অভাবে বিসিআইসির পাঁচটির মধ্যে চারটি এবং বহুজাতিক কাফকো ইউরিয়া কারখানাটি বন্ধ রয়েছে। আমনের আগে ইউরিয়ার সরবরাহ বাড়াতে আগামী মে মাস থেকে বর্তমানে উৎপাদনে থাকা ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার (জিপিএফ বা জিপি) পিএলসির সঙ্গে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (এসএফসিএল) এবং বহুজাতিক কর্ণফুলি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) চালুর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ঘোড়াশাল পলাশ কারখানার দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৮০০ টন। শাহজালালের ১ হাজার ৩০০ এবং কাফকোর দুই হাজার টন। এ তিনটি কারখানা চালু হলে মজুদ সংকট কিছুটা কমে আসবে বলে জানান, বিসিআইসি বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা শাখার পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের সার কারখানাগুলোতে দৈনিক ৩২ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে মাত্র সাত কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে গ্যাস সংকটে বহুজাতিকসহ ছয়টি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে মাত্র একটি উৎপাদনে রয়েছে।
কৃষিবিদরা বলছেন, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সার ইউরিয়া। এ সারের সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটলে তা সামগ্রিক কৃষির উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক এক মহাপরিচালক নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতি বছর দেশে যে পরিমাণ রাসায়নিক সারের চাহিদা রয়েছে তার প্রায় ৪০ শতাংশই ইউরিয়া। এককভাবে এটিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। বর্তমানে ইউরিয়ার মজুদ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে বলাই যায়। সামনে আমনের মৌসুম, তখন চাহিদা আরো বাড়বে। সংকট মোকাবেলায় সরকারকে এখনই কাজ করতে হবে। উৎপাদন বাড়ানো এবং হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে আনা যাবে এমন উৎস থেকে সার আমদানির দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় আমন মৌসুমে সংকট বাড়বে এবং কৃষকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ইউরিয়া সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দেশী কারখানাগুলো চালু রাখা অত্যাবশ্যকীয়। প্রয়োজনে কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে হলেও কারখানাগুলোতে গ্যাস দিয়ে চালু রাখতে হবে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং প্রাপ্যতার চিন্তা কমবে। পাশাপাশি গালফ কান্ট্রি বাদে বিকল্প উৎসও খুঁজতে হবে।’