নদী ভাঙন

ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে হাজারো মানুষ

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বগুড়ায় শুরু হয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন।

যমুনা যেন এবার শুধু মাটি নয়, মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি ও অস্তিত্বও গিলে খাচ্ছে। প্রতিদিন বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি পূর্বপুরুষদের কবরও। নদীর তীব্র স্রোতের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছে সারিয়াকান্দিসহ বিভিন্ন উপজেলার হাজারো মানুষ। বাধ্য হয়ে অনেকে গাইবান্ধা, বগুড়া, রংপুর, জামালপুর, ঢাকা, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় আশ্রয় নিচ্ছে।

জানা গেছে, বর্ষাকালে নদী ভরাট থাকায় গতিপথ তেমন বোঝা না গেলেও শুকনা মৌসুমে মূল প্রবাহ থাকছে না যমুনায়। যমুনা নদী বয়ে গেছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলা হয়ে। তিন উপজেলায় যমুনা নদীর কারণে প্রতি বছর ভাঙনের শিকার হয়।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে যমুনা নদীর অবস্থান ছিল বাম তীরঘেঁষে বা জামালপুর জেলার দিকে। পরে বিভিন্ন সময়ে নদী ভাঙতে ভাঙতে ডান তীরঘেঁষে অবস্থান নেয় বা বগুড়ার দিকে। ডান তীরে নদী শাসনের কাজ হওয়ায় বর্তমানে নদী আবারো বাম তীর ঘেঁষতে শুরু করেছে। ১৯৮৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত গত আড়াই দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার বিভিন্ন অংশে যমুনা নদীর ডান তীরে প্রায় ৫৬০ মিটার ভেঙেছে। ২০১০ সালের পর থেকে সরকারিভাবে নদীশাসনের কাজ হওয়ায় এ এলাকা বন্যায় বড় আকারে আর ভাঙেনি। তবে বেশকিছু এলাকায় নদীভাঙন দেখা যায় মাঝেমাঝে। সারিয়াকান্দির কালিতলা গ্রোয়েন বাঁধ থেকে পূর্ব দিকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নদী বেশির ভাগ সময় অবস্থান করছে। কয়েক বছর আগে নদী সবসময় কালিতলা গ্রোয়েন বাঁধের সঙ্গে থাকায় নদীটি পূর্ব দিকে কিছুটা সরে যাওয়ার কারণে সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর ডান তীরের সামনে চালুয়াবাড়ী, হাটশেরপুর, কাজলা ও সারিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নে বিশালাকার চরাভূমির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এসব এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া একসময়ের প্রখর স্রোতধারার প্রমত্তা যমুনা নদী এখন তার গতিপথ পরিবর্তন করে বাম তীরঘেঁষে জামালপুরের দিকে পুনরায় বাঁক নিয়েছে।

সরজমিনে দেখা গেছে, হাটশেরপুর ইউনিয়নে যমুনা নদীর ভাঙনে গত এক সপ্তাহে ১৫০ পরিবারের বসতভিটা যমুনায় বিলীন হয়েছে। সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের চকরথীনাথ, ধনারপাড়া, করনজাপাড়া, শেরপুর, শিমুলবাড়ী, নয়াপাড়া, কর্ণিবাড়ী, দুব্বাগাড়ী ও চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের সুজালিরপাড়া গ্রামে ২০১৫ সাল থেকেই যমুনা নদীর ভাঙন চলমান রয়েছে। হাটশেরপুর ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এ ইউনিয়নের বর্ণিত গ্রামগুলোর প্রায় দুই হাজার পরিবার, বসতভিটা, চাষের জমি ও সড়ক যমুনা নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। বারবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে গ্রামের মানুষ বিভিন্ন এলাকায় চলে যাচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। গত কয়েক দিনে এসব গ্রামের দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের শিকার হয়েছে। চকরথীনাথ গ্রামে পানি বৃদ্ধির কারণে গ্রামের লোকজন ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। গ্রামের চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেশকিছু মসজিদ ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানসহ তিন শতাধিক পরিবারের বসতভিটা, কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।

চকরথীনাথ গ্রামের আব্দুল জলিল শেখ জানান, চকরথীনাথ চরেই চারবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। সাত বছর আগে এ গ্রামে ঘর তুলে বসবাস করে আসছিলেন। বসতভিটায় বেশ বড় বড় গাছপালা হয়। বিদ্যুৎ সুবিধাও পেয়েছিলেন। কিন্তু যমুনা নদীর ভাঙনে এখানে আর থাকা হলো না। ভাঙন দেখা দেয়ায় অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে।

সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূর মো. মেহেদী হাসান আলো বলেন, ‘সাতদিন আগে নদীভাঙনের শিকার ১৪০টি পরিবারের তালিকা করেছি। এ তালিকা দ্রুত বাড়ছে। গত বুধবার পর্যন্ত ১৯৫টি পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে বসতভিটা হারিয়েছে এবং বাড়িঘর অন্যত্র স্থানান্তর করেছে। দ্রুত যমুনা ভাঙন রোধে কাজ শুরু করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এলাকাবাসীর পক্ষে জোর দাবি জানানো হয়েছে।’

সারিয়াকান্দি উপজেলার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানান, প্রায় ১৮ বছর আগে হাটফুলবাড়ি এলাকায় নদীতে তাদের বাড়িঘর, গৃহপালিত পশু, প্রাণী, ঘরের আসবাব পর্যন্ত ভেসে যায়। প্রথমে নদীপাড়ে, পরে সেখান থেকে বগুড়া শহরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। তাদের সঙ্গে তাদের চাচার পরিবারও এসেছে। কুতুবপুর নামের একটি গ্রাম ছিল, যার পুরোটাই নদীতে চলে গেছে।

বগুড়া পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মালেক জানান, বর্ষাকালে নদীতে পানি বৃদ্ধি পায়। যমুনা নদী প্রতি বছর ভাঙছে। শত শত বিঘা জমি ও মানুষ এ ভাঙনের শিকার হয়েছে। তারা নদীতীরবর্তী এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন জেলায় আশ্রয় নিয়ে আছে। কেউ বা জমি কিনে বাড়ি তৈরি করে কোনোমতে জীবনযাপন করছে।’

আরও