আইন পাসের পাঁচ বছরেও হয়নি কমিটি

জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ভারসাম্য হারাচ্ছে পরিবেশ

দেশের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বেশ আশা নিয়েই ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সংসদে পাস হয় ‘বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন’।

দেশের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বেশ আশা নিয়েই ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সংসদে পাস হয় ‘বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন’। সে আইন অনুযায়ী কোনো গ্রামের জীববৈচিত্র্য কেমন তা লিপিবদ্ধ থাকবে রেজিস্টারে। পুরো বিষয়টি তদারকিতে থাকবে ইউনিয়ন জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা কমিটি। চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে দেশের প্রত্যেক ইউনিয়নেই এ কমিটি থাকার কথা। এমনকি পৌরসভা, উপজেলা এবং জেলায় জেলায়ও জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা ও তদারক কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে আইনে। যদিও বাস্তবে এমন কমিটির অস্তিত্বই নেই। ফলে একেবারে প্রান্তিক লোকজনকে এ বিষয়ে সচেতন করা যাচ্ছে না। ঠেকানো যাচ্ছে না জীববৈচিত্র্য বিনাশ। এসব কাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগকেই কেবল কখনোসখনো আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়। সেটিই এখন আশার আলো।

উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার মণ্ডলপাড়া এলাকায় গত বছরের ১২ মে একটি বিলুপ্ত নীলগাই ধরে জবাই করে এলাকাবাসী। খবর পেয়ে একদিন পর ঘটনাস্থলে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের লোকজন পৌঁছে। ততক্ষণে নিরুদ্দেশ জড়িতরা। ইউনিয়ন জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকলে হয়তো রক্ষা পেত রক্তের টানে ফিরে আসা নীলগাইটি। প্রায় ১০০ বছর আগে এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ এ অ্যান্টিলোপের আবাস ছিল দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় এলাকায়। 

সোহেল সুলতান জুলকার নাইন কবির ২০২০ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে রাণীশংকৈলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দাবি করেন, তার উপজেলায় জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা ও তদারক কমিটি আছে। এটি এখন আগের চেয়ে বেশ সক্রিয়। ফলে গত প্রায় ১০ মাসে এলাকায় বন্যপ্রাণী হত্যার ঘটনা ঘটেনি। একই সময়ে বেশকিছু বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। এলাকায় সচেতনতামূলক কাজও চালাচ্ছে সে কমিটি।

তবে ভিন্ন কথা বলছেন বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রাজশাহীর বন্যপ্রাণী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির। তিনি জানান, নীলগাই হত্যার খবর পেয়ে সেদিন তারা প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। চেয়ারম্যান পরে স্থানীয় ইউপি সদস্যের সঙ্গে তাদের কথা বলে দেন। খবর পেয়ে ওই সদস্য ঘটনাস্থলে গ্রাম পুলিশ পাঠান। কিন্তু ওই ইউনিয়নে জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকলে নিজের গরজেই চেয়ারম্যান এ কাজটি করতেন। মূলত স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সেখানে কাজ করলেও তারা এমন কোনো কমিটির সদস্য নন।

বন্যপ্রাণী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির আরো জানান, নীলগাই উদ্ধারের ঘটনায় কয়েকদিন তিনি রাণীশংকৈলে ছিলেন। ওই সময় কোনো উপজেলা জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা ও তদারক কমিটির কার্যক্রম চোখে পড়েনি। শুধু এ উপজেলাই নয়, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কোনো উপজেলা এমনকি জেলাতেও জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা ও তদারক কমিটির কার্যক্রম নেই। হয়তো কোথাও এমন কমিটির অস্তিত্ব-ই নেই। কেননা কমিটি থাকলে সেখানে তো বন বিভাগের প্রতিনিধিও থাকতেন। তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ডাক পড়ত। কমিটির দৃশ্যমান কার্যক্রমও থাকত। কিন্তু এসবের কিছুই নেই।

জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা কমিটি নেই নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার সদর ইউনিয়নেও। অথচ উত্তরাঞ্চলের বড় জীববৈচিত্র্যের আধার চলনবিলের অবস্থান এ এলাকায়। তবে সেখানকার মানুষ আগের চেয়ে অনেকটাই সচেতন। এটিও এসেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি’র হাত ধরে। এর পরও কিছু মানুষ রয়েছে, যাদের হাতে বিপন্ন এখানকার জীববৈচিত্র্য। এদেরই একজন ইউনিয়নটির ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল হামিদ। 

গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর আব্দুল হামিদ এলাকার লোকজনকে নিয়ে চারটি শিয়াল ও একটি দাঁড়াশ সাপ লাঠিপেটায় হত্যা করেন। বন্যপ্রাণী হত্যায় তারা পরিবেশের আনুমানিক দেড় লাখ টাকার ক্ষতি করেন বলে এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। এর আগেও আব্দুল হামিদ প্রায় ২০০ শামুকখোল হত্যা করেন। ওই দফা কেবল মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান।

এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মমিন আলী জানান, জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফোরামে তারা কথা বলছেন। উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটিতেও এ নিয়ে কথা হয়। ফলে আগের চেয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে। তবে ইউনিয়নে জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা কমিটি না থাকার কথা স্বীকার করেন তিনি।

জীববৈচিত্র্য আইন-২০১৭ অনুযায়ী জীববৈচিত্র্য ক্ষতিসাধনকারী কোনো কাজ যেন কেউ করতে না পারে সে বিষয়টি দেখবে ইউনিয়ন জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা কমিটি। কেউ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন করলে কিংবা করার উদ্যোগ নিলে তা বন্ধসহ যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব এ কমিটির। এ আইনে ইউনিয়নের পাশাপাশি প্রত্যেক পৌরসভা, উপজেলা, জেলা এবং সিটি করপোরেশনেও জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা ও তদারক কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। জেলা কমিটি মূলত উপজেলা, পৌর ও ইউনিয়ন কমিটিসহ জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক দল বা সমিতির কার্যক্রম দেখভালসহ দিকনির্দেশনা দেবে। আবার উপজেলা কমিটি পৌর ও ইউনিয়ন কমিটিসহ জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক দল বা সমিতির কার্যক্রম দেখভাল করবে। এছাড়া আইন অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্যবিষয়ক জাতীয় কমিটির সভাপতি হবেন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী। এ কমিটির সদস্য সচিব পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন যথাযথ বাস্তবায়নের বিষয়টিও তদারকির ভার এ কমিটির কাঁধে। প্রতি বছর তাদের অন্তত দুটি সভা করার কথা। এছাড়া সিটি করপোরেশন কমিটি দুটি এবং জেলা, উপজেলা, পৌর ও ইউনিয়ন কমিটি তিনটি করে সভা করবে বলে আইনে বলা হয়েছে। তবে আইন পাসের প্রায় পাঁচ বছরেও কমিটিগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। 

আইনটি বাস্তবায়নে গরজ নেই খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরেরই। এর সত্যতা পাওয়া গেছে অধিদপ্তরের রাজশাহীর উপপরিচালক মাহমুদা পারভীনের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘রাজশাহী সিটি করপোরেশন কিংবা রাজশাহী জেলায় এমন কোনো কমিটি আছে কিনা তা আমার জানা নেই। আইন অনুযায়ী, এসব কমিটি থাকলে অবশ্যই ডাক পেতাম।’ 

আইনটি এখনো কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) রাজশাহীর মাঠ সমন্বয়কারী তন্ময় কুমার সান্যাল। তিনি বলেন, ‘বাস্তবে এ আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। আমরা বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কথা বলি, যাতে আইনটি কার্যকর করা যায়। এটির প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সবদিক দিয়েই লাভ।’ 

জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় গুরুত্বারোপ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. বিধান চন্দ্র দাস বলেন, ‘জীববৈচিত্র্য আমাদের খাবার দেয়। আবার প্রকৃতির ভারসাম্য রাখে। আমাদের জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। চিত্তবিনোদনও দেয়। জীববৈচিত্র্যের এ চার ধরনের সেবা ছাড়া আমাদের জীবন-যাপন কল্পনাই করা যায় না। ফলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অবশ্যই জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে।’

জানতে চাইলে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে আমাদের এত অফিস কিংবা লোকবল নেই। প্রাথমিক কাজটা করেন মূলত স্বেচ্ছাসেবীরা। তারাই বন্যপ্রাণীবিষয়ক অপরাধের খবর দেন। প্রত্যেক ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলায় জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা ও তদারকি কমিটি থাকলে তারাই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করত।’

আরও