ব্রহ্মপুত্র নদের উত্পত্তি চীন অধিকৃত তিব্বতের মানস সরোবরে। বৈশ্বিক নদ-নদীর তালিকায় মোট পানিপ্রবাহের দিক থেকে ব্রহ্মপুত্রের অবস্থান নবম, দৈর্ঘ্যে পঞ্চদশ। তিব্বতে (চীন) ইয়ারলুং-স্যাংপো নামে প্রবাহিত হয়ে নদটি ভারতের অরুণাচল প্রদেশে এসে সিয়াং নাম ধারণ করেছে। তারপর আসামের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করে যমুনা নদী নাম ধারণ করেছে। প্রায় ৪ হাজার ৬৯৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ব্রহ্মপুত্র নদসংশ্লিষ্ট অববাহিকা অঞ্চলের বাসিন্দা জীবন-জীবিকা ও প্রতিবেশ গড়ে তোলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রবাহপথে উজানের দুই দেশ চীন ও ভারতের মধ্যকার বৈরিতা নদটিকে এখন করে তুলেছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু। অন্যদিকে ভাটির দেশ হওয়ায় ব্রহ্মপুত্রের পানিপ্রবাহ নিয়ে যেকোনো বিরোধপূর্ণ কার্যক্রমের বলি হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রকৃতপক্ষে, নদটির পানিপ্রবাহ নিয়ে চীন ও ভারত উভয় দেশই বঞ্চিত করে রেখেছে বাংলাদেশকে।
অথচ ব্রহ্মপুত্রের গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্যই সবচেয়ে বেশি। নদটির ৫ লাখ ৮০ হাজার বর্গকিলোমিটার অববাহিকা অঞ্চলে বাংলাদেশের অধিকার আছে মাত্র ৮ শতাংশে। তার পরও এটিই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের বৃহত্তম জলপ্রবাহ ব্যবস্থা। বাংলাদেশের নদীগুলোয় মোট প্রবাহিত পানির প্রায় ৬৫ শতাংশই আসে ব্রহ্মপুত্র থেকে।
নদের পানি বণ্টন নিয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি না থাকার সুযোগ নিয়ে ব্রহ্মপুত্রের তিব্বত অংশে (ইয়ারলুং-স্যাংপো) একের পর এক বাঁধ দিয়ে চলেছে চীন। এ অংশে শুধু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রই পরিচালনা হচ্ছে কমপক্ষে ১১টি। পাশাপাশি সবচেয়ে উজানে থাকার সুবিধা নিয়ে ভারতের সঙ্গে যেকোনো বিরোধে ব্রহ্মপুত্রকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে দেশটি। কিছুদিন আগেও লাদাখে চীন ও ভারতের মধ্যে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ব্রহ্মপুত্রে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি আরো একটি বাঁধ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং। নির্মীয়মাণ বাঁধটির মাধ্যমে ইয়ারলুং-স্যাংপোকেন্দ্রিক দ্বিতীয় বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে চীন।
জুলাইয়েই তিব্বতের জিয়াচা হাইড্রোপাওয়ার স্টেশনের জন্য নির্মিত বাঁধে সাফল্যের সঙ্গে গেট স্থাপনের কথা জানায় চায়না সোসাইটি ফর হাইড্রোপাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং। এর মধ্যেই নতুন আরেকটি বাঁধের ঘোষণা ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ একেবারে শীর্ণ করে আনার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিষয়টি ভারত ও বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার লাখ লাখ মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়ার পাশাপাশি এ অঞ্চলের প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য হুমকিতে ফেলেছে।
শুধু যে চীন ব্রহ্মপুত্রের ওপর যেখানে সেখানে বাঁধ দিয়ে চলেছে তা নয়। এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই ভারতও। অরুণাচলে লোয়ার সুবানসিরি প্রজেক্ট ও দিবাং ভ্যালি প্রজেক্টের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্রের শাখা ও উপনদীগুলোর প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে সেখানকার প্রাদেশিক সরকার। অরুণাচলের রাজ্য সরকার এবং ব্যক্তি, সরকারি ও যৌথ অংশীদারিত্ব খাতের অনেকগুলো কোম্পানির মধ্যে গোটা প্রদেশে মাঝারি ও বৃহদায়তনের বাঁধ নির্মাণ নিয়ে অনেকগুলো সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে।
চীন ও ভারতে একের পর এক বাঁধ এবং পানি উত্তোলনের কারণে নদীতে পানিপ্রবাহ কমে গিয়ে বাংলাদেশে যমুনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে মারাত্মক খরা দেখা দেয়। আবার ব্রহ্মপুত্র নিয়ে এ বাছবিচারহীন খামখেয়ালিপনাই সেখানে ভয়াবহ বন্যার কারণ হয়ে দেখা দেয়া বর্ষা মৌসুমে। প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে উপচে পড়ার উপক্রম হলে বাঁধের গেটগুলো খুলে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ ও আসামে প্রতিবারই দেখা দিচ্ছে মারাত্মক বন্যা। বাংলাদেশের যমুনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য প্রতিবারই বর্ষা মৌসুম হয়ে উঠছে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির কারণ। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকাগুলোয় এ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে সিকিম থেকে আসা নদী তিস্তার প্রবাহ বাংলাদেশে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিশেছে। নদীটির পশ্চিমবঙ্গ অংশে নির্মিত গজলডোবা বাঁধের কারণেও বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার মানুষকে ভুগতে হচ্ছে অনেক।
শুধু বাঁধ নির্মাণ নয়, চীন-ভারত বিরোধের ক্ষেত্রে আরো নানাভাবে বলি হয়েছে ব্রহ্মপুত্র ও ব্রহ্মপুত্র পারের মানুষ। ২০১৭ সালে এ দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা যখন চরমে, ঠিক সে সময় হঠাৎ করেই অরুণাচলে ব্রহ্মপুত্রের (সিয়াং) পানি কর্দমাক্ত ও কালো হয়ে যায়। নদের পানি হয়ে পড়ে মনুষ্য ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। তীরবর্তী এলাকার কোথাও কোথাও ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত দূষিত পলি পড়তে দেখা যায়। বিষয়টি ওই সময় ব্রহ্মপুত্রের উজানে চীনের কার্যক্রম নিয়ে ভয়াবহ শঙ্কা তৈরি করে।
ওই সময়ে অরুণাচলের ভাতের ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত সিয়াং উপত্যকার কৃষি ও মত্স্য আহরণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে চীন দাবি করেছিল, ২০১৭ সালের নভেম্বরের এক ভূমিকম্পের কারণে নদের পানিপ্রবাহ এমন অস্বাভাবিক আকার ধারণ করেছিল। যদিও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভূমিকম্পের অনেক আগেই এ পানির চেহারা অস্বাভাবিক আকার ধারণ করেছিল। আবার এ অরুণাচলেই নদটিকে বাঁধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণের একের পর এক প্রয়াস ভয়াবহ শঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে ভাটিতে থাকা আসাম ও বাংলাদেশের মানুষের জন্য।