১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ বিশাল কমপ্লেক্সের বড় অংশই এখনো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতিষ্ঠার প্রায় চার বছরেও প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত আলোর মুখ দেখেনি। শহর থেকে দূরত্ব, বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ, লোকবলের অভাব, সঠিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং পরিকল্পনার দুর্বলতায় এ বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না। ইনকিউবেটরের বিভিন্ন স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবলও নেই।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২২ সালে উদ্বোধন করেছিলেন উচ্চাভিলাষী এ প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রমকে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেমের মধ্যে নিয়ে আসা এবং গ্র্যাজুয়েটদের উদ্ভাবনী ধারণাকে সফল ব্যবসায়িক উদ্যোগ বা স্টার্টআপে রূপান্তর করা। বলা হয়েছিল, এখানে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সমাবেশ ঘটবে। বাস্তবে প্রতিষ্ঠার চার বছরেও বিশাল এ অবকাঠামো অব্যবহৃতই রয়ে গেছে। শুরুর দিকে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮২ কোটি ২ লাখ টাকা। পরবর্তী ধাপে সেই ব্যয় ৯৪ কোটি ২৫ লাখ থেকে ১১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। সবশেষ প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২৫ কোটি টাকায়।
গত মঙ্গলবার ইনকিউবেশন ভবনে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের নিচতলা সম্পূর্ণ ফাঁকা; বিভিন্ন স্থানে ধুলার আস্তরণ জমে আছে। দ্বিতীয় তলায়ও টেবিল-চেয়ারসহ ফার্নিচারের ওপর ধুলা পড়ে রয়েছে। তৃতীয় তলাতেও একই চিত্র। চতুর্থ তলায় একটি কোম্পানির এক কর্মীকে কাজ করতে দেখা গেলেও সেখানকার আসবাবপত্রেও ধুলা জমে আছে। পঞ্চম তলাটি পুরোপুরি ফাঁকা। ষষ্ঠ তলায় ‘টর্ক’ নামে একটি কোম্পানির অফিস খোলা থাকলেও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। ইনকিউবেটরের প্রবেশপথে কেবল একজন নিরাপত্তাকর্মীকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
চুয়েটের প্রায় ৩ দশমিক ৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ আইটি বিজনেস ইনকিউবেটরে রয়েছে একটি ১০ তলা ইনকিউবেশন ভবন, একটি ছয় তলা মাল্টিপারপাস ভবন এবং নারী-পুরুষদের জন্য আলাদা দুটি চার তলা ডরমিটরি। ইনকিউবেশন ভবনের মধ্যে রয়েছে স্টার্টআপ জোন, আইডিয়া বা ইনোভেশন জোন, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিক কোলাবরেশন জোন, ব্রেইনস্ট্রর্মিং জোন, ই-লাইব্রেরি, ডেটা সেন্টার, রিসার্চ ল্যাব, প্রদর্শনী সেন্টার, ভিডিও কনফারেন্সিং কক্ষ ও সভা কক্ষ। এর বাইরে ব্যাংক ও আইটি ফার্মের জন্য পৃথক কর্নার, অত্যাধুনিক সাইবার ক্যাফে, ফুড কোর্ট, ক্যাফেটেরিয়া, রিক্রিয়েশন জোন, মেকার স্পেস, ডিসপ্লে জোন, মিডিয়া কাভারেজ জোন, নিজস্ব পার্কিং–সুবিধা রয়েছে ইনকিউবেশন ভবনে।
এছাড়া বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য মাল্টিপারপাস ভবনে পাঁচটি কম্পিউটার ল্যাব, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স/মেশিন লার্নিং ল্যাব, এআর, ভিআর ল্যাব, সাইবার সিকিউরিটি ল্যাব, অপারেটিং সিস্টেম ল্যাবসহ ১০টি অত্যাধুনিক ল্যাব রয়েছে। এতসব সুবিধা থাকলেও মাত্র ৩০ জন শিক্ষার্থী এখানে বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে কাজ করছেন।
ইনকিউবেশন ভবনের পাঁচটি ফ্লোর আইটি কোম্পানিকে ভাড়ায় বরাদ্দ দেয়ার পরিকল্পনা থাকলেও মাত্র তিনটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এখন সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে রোবোকার, ডিলিজিট, সিটিও টর্ক। এর বাইরেও ইনকিউবেটর চালুর পরপর পাঁচটি প্রতিষ্ঠান—রকওন আইটি গ্লোবাল, টেক ওয়েভ-এক্স,সিমস ইন্টারেক্টিভ, চালডাল, মিস্ট্রি বাজার অফিস বরাদ্দ নিলেও কার্যক্রম শুরু না করে ইনকিউবেটর ছেড়ে চলে গেছে।
ইনকিউবেটরের সপ্তম তলায় ১ হাজার ৬৭ বর্গফুট স্পেসের অফিস নেয়া সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি সিটিও টর্কের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাহ সৈকত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার কোম্পানিতে পাঁচজন শিক্ষার্থী সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজ করেন। এখানে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে কিন্তু বেশির ভাগ জায়গাই অব্যবহৃত হয়ে পড়ে আছে। ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে ইনকিউবেটরের কোলাবরেশন নেই। শহর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় অনেকেই এখানে আসতে আগ্রহী নয়। আবার অনেকে জানেও না এখানে কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে এমওইউ সই করলে এবং এটির প্রচারণা করলে হয়তো কোম্পানিগুলো আগ্রহী হতে পারে।’
এছাড়া স্টার্টআপ কোম্পানির জন্য নির্ধারিত ইনকিউবেটরের চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় মোট ৩৯টি ডেস্ক রয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১৭টি স্টার্টআপ সেখানে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ ১৭টি স্টার্টআপের মধ্যে রয়েছে ইউনিক স্কুলিং, ফিনটিক, মার্স রোভার টিম, ব্যানানা প্যাডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এছাড়া কৌশল, র ভেগ, মিস্ত্রী কইসহ সাতটি স্টার্টআপ একসময় অফিস বরাদ্দ নিলেও এখন আর নেই।
এ ইনকিউবেটরে ২০২৩ সালের শেষের দিকে কার্যক্রম শুরু করা একটি স্টার্টআপ কোম্পানির সিইও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘সরকার শুধু অবকাঠামো করেছে কিন্তু কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই। হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে কিছু প্রোগ্রাম করে তারপর আর খোঁজ থাকে না। ইনকিউবেটরটি শহর থেকে অনেক দূরে। এটি চট্টগ্রাম অথবা ঢাকায় হলে ভালো হতো। অনেক কোম্পানি দূরত্বের কারণে এখানে আসতে চায় না। কয়েকজন বিদেশী এসে ভিজিট করে ওভারভিউ নিয়েছেন কিন্তু পরে আর আগ্রহ প্রকাশ করেনি। আমাদের কার্যক্রম এখনো ভালোভাবে শুরু করতে পারিনি।’
একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন প্রিন্টিং ভেন্ডিং মেশিন নিয়ে কাজ করা স্টার্টআপ কোম্পানি ‘সাইফার বাংলাদেশ’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ফয়সাল তাইসির। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি অফিস স্পেস দরকার ছিল সেটি পাচ্ছি কিন্তু এখানে বড় আকারে যে কার্যক্রম হওয়ার কথা ছিল সেটি হচ্ছে না। শহরকেন্দ্রিক না হওয়ায় বড় কোম্পানি আসতে চায় না। শহর থেকে চুয়েটে আসতে ২ ঘণ্টা সময় লাগে।’
ইনকিউবেটরে ডরমিটরি-১ এবং ডরমিটরি-২ নামে চার তলা বিশিষ্ট দুটি ডরমিটরি রয়েছে। ইনকিউবেটরে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণের জন্য আগত দেশী-বিদেশী অতিথিদের থাকার জন্য এ ডরমিটরিগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। মোট ৭৮টি কক্ষের (৩০টি এসি ও ৪৮টি নন-এসি) বিপরীতে মাত্র একজন কেয়ারটেকার কর্মরত। ডরমিটরিতে দুটি ডাইনিং রুম রয়েছে, রান্নার সব সরঞ্জাম আছে। কিন্তু লোকবল না থাকায় ডাইনিং চালু করাই সম্ভব হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডরমিটরির এসব রুমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ভাড়ায় থাকছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরির লক্ষ্যে নির্মিত এ ইনকিউবেটরে ৩৬০টি এসি, ২২৫টি কম্পিউটার, ১০ জিবিপিএস ইন্টারনেট, চারটি লিফট, সোলার প্যানেল, ডেটা সেন্টার, সিসিটিভি সিস্টেমসহ সবকিছুই আছে। কিন্তু এত বড় বিনিয়োগের বিপরীতে বর্তমানে সেখানে কার্যক্রম চালাচ্ছে মাত্র তিনটি কোম্পানি ও ১৭টি স্টার্টআপ। দুই হাজার কিলোওয়াটের সাবস্টেশন ও ৫০০ কিলোওয়াটের ডিজেল জেনারেটর রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবলের অভাবে কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। ১০টি ল্যাবে ২২৫টি কম্পিউটারের জন্য নেই কোনো টেকনিশিয়ান বা ল্যাব সহকারী। ফলে এগুলো সচল রাখা দুরূহ হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার জন্য মাত্র একজন কর্মী; লিফট-পাম্পহাউজ রক্ষণাবেক্ষণেও একই দুরবস্থা।
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ ইনকিউবেটরটি এখনো চুয়েটকে হস্তান্তর করা হয়নি। একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হয়েছিল কিন্তু সেটি যথাযথ নয়। বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে ইনকিউবেটরটি।’
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে চুয়েট আইটি বিজনেস ইনকিউবেটরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মশিউল হকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।