কুষ্টিয়ার শীর্ষ চরমপন্থী নেতা লিপটন বিপুল অস্ত্র গোলাবারুদসহ গ্রেফতার

এ সময় বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। এগুলোর মধ্যে ৬টি বিদেশী পিস্তল, একটি শর্টগান, ম্যাগাজিন, গুলি ও দেশী ধারালো অস্ত্র রয়েছে।

কুষ্টিয়ার নিষিদ্ধ ঘোষিত শীর্ষ চরমপন্থী দল গণমুক্তিফৌজের নেতা জাহাঙ্গীর কবির লিপটন গ্রফতার হয়েছে। সেনাবাহিনীর একটি দল রাতভর তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া সদরের দূর্বাচারা গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাকেসহ আরো তিন সহযোগীকে আটক করে। বৃহস্পতিবার (৫ জুন) গভীর রাত থেকে শুরু করে শুক্রবার সাড়ে আটটা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

এ সময় বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। এগুলোর মধ্যে ৬টি বিদেশী পিস্তল, একটি শর্টগান, ম্যাগাজিন, গুলি ও দেশী ধারালো অস্ত্র রয়েছে।

আজ শুক্রবার (৬ জুন) দুপুরে সেনাবাহিনীর কুষ্টিয়া ক্যাম্পে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, হত্যা, গোলাগুলি, চাঁদাবাজির প্রায় ৫০টি মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে আরো শতাধিক। সে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ চরমপন্থীদের একজন। র‌্যাপিড আ্যকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) অস্ত্র ব্যবসায়ীদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে সেখানে লিপটনের নাম রয়েছে।

বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বসে দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে নানা অপকর্ম করে আসছিল এই লিপটন।

একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, তার ওপরের ও নিচের সারির অনেক চরমপন্থী বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অথবা প্রতিপক্ষ অথবা নিজ দলের অপরপক্ষের হাতে নিহত হলেও বেঁচে রয়েছে এই চরমপন্থী লিপটন। বলা হয়ে থাকে, রাজনৈতিক আশীর্বাদ ও প্রশাসনে কর্মরত নিজ আত্মীয়স্বজনের বিশেষ তদবির ও প্রশ্রয়েই সে এতদিন বেঁচে থেকে তার অপকর্ম চালিয়ে গেছে।

সন্ত্রাসে হাতেখড়ি কৈশোরেই

জেলা পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী ও চরমপন্থী নেতা লিপটনের বাড়ি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার দুর্বাচারা গ্রামে। তার বাবার নাম আজিজুর রহমান ওরফে মিনা। জামায়াত-বিএনপি আদর্শের পরিবারে বড় হওয়া লিপটন নব্বইয়ের দশকের পর কলেজে ভর্তির পর ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যোগ দেয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে লিপটন ধীরে ধীরে চরমপন্থী দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ সময় কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেয় লিপটন। এ সময়ই সে নাম লেখায় গণমুক্তিফৌজ নামের চরমপন্থী দলে।

এরপর ক্ষমতার পালাবদল হলে আবার বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলে। বিএনপি-জামায়াত সরকার আমলে জেলা বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা, তৎকালীন সংসদ সদস্যের ছত্রছায়ায় টেন্ডারবাজি ও খুন-খারাবিতে মেতে ওঠে সে। সে সময় নিজে হাতে একের পর এক হত্যা মিশন চালিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে শুটার হিসেবে পরিচিতি পায়। ওই সময়ে চরমপন্থীদের হাতে নিহত হয় কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়ার একটি বাসায় জামাই বাবু, কুষ্টিয়া বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম দুলাল, জগন্নাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মুন্সী রশিদুর রহমান। পালিয়ে থাকা শীর্ষ দুই চরমপন্থী এ হত্যা মিশনে নেতৃত্ব দেয়। তাদের হত্যা মিশনে লিপটন অংশ নেয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এক পর্যায়ে নিজেই বাহিনী গড়ে তোলে। এ সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জোরদার অভিযান শুরু করলে লিপটন ভারতে পালিয়ে যায়। সেখান থেকেই এ সময় দেশে গড়ে তোলা সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতে থাকে। এরপর অর্থের জোরে সবকিছু ম্যানেজ করে ২০১৩ সালে লিপটন দেশে ফিরে দীর্ঘ এক যুগ ধরে আবারো চরমপন্থী সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, লিপটন স্থানীয় র‌্যাবের কিছু সদস্যকে হাত করে নিজেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত সোর্স পরিচয় দিয়ে থাকে।

এরপর সে আবার ভারতে পালায়। ভারতে অবস্থানরত কুষ্টিয়া অঞ্চলের একাধিক সন্ত্রাসীদের কারো সঙ্গে সখ্যতা, কারো সঙ্গে গোলমাল চলতে থাকে।

সরকারের একটি গোয়েন্দা সূত্রমতে, কুষ্টিয়ার বেশ কয়েকজন শীর্ষ চরমপন্থী নেতা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সেখানে খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ে। এতে কুষ্টিয়া পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ চরমপন্থী নেতা আনোয়ার হোসেন আনু, আজিবর মেম্বার, ওবাইদুল ইসলাম ওরফে লালসহ আরো কয়েকজন নেতা কয়েক বছরে নিহত হয়। এসব ঘটনায় লিপটনের গভীর যোগসূত্র থাকলেও সে থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সূত্রটি জানায়, এদের মৃত্যুর পর ভারত ও দেশে অবস্থান করে কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রাখে লিপটন। এ অবস্থায়, ২০১৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কলকাতা সিআইডি পুলিশের একটি বিশেষ টিম লিপটনকে গ্রেফতার করে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করে। কলকাতার একাধিক সূত্রমতে, বাংলাদেশী সন্ত্রাসী লিপটন দীর্ঘদিন ভারতে অবস্থান করে এদেশে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে আসছিল।

সেখান থেকে ছাড়া পেয়ে আবার দেশে চলে আসে সে। সূত্র বলছে, এর মধ্যে কুষ্টিয়ার লিপটন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স পরিচয় দিয়ে দলকে সংগঠিত করে আসছিল। শহরে প্রকাশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাকে গল্প করতে দেখা গেছে বলে অনেকেই দাবি করেছে। এছাড়া ওই সময়ের সরকার দলীয় বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে।

এরপর থেকে লিপটন এলাকাতেই অবস্থান করছিল। এলাকার বিভিন্ন গোলমালেও সে সক্রিয় ভুমিকা রাখছিল। ২০২৩ সালে ওই এলাকায় সংঘটিত কয়েকটি গোলমালেও সক্রিয় ভুমিকা ছিল তার। গোলমালগুলোর পর এলাকায় একচ্ছত্র অধিপত্য বিস্তার করে লিপটন।

৫ আগস্টের পর থেকে নতুন মেরুকরণেও সে সক্রিয় ছিল এবং একটি দলের পক্ষ নিয়ে এলাকায় বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করে আসছিল সে।

আরও