৪৫ কোটি টাকার সম্পদ ১৪০ কোটি দেখিয়ে ঋণ অনুমোদন!

চট্টগ্রামের লিজেন্ড হোল্ডিংসের বিরুদ্ধে ২১৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

২০১৪ সালের ২১ অক্টোবর চট্টগ্রামের লিজেন্ড হোল্ডিংসের প্রোপ্রাইটর সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল হাই সাউথ ইস্ট ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করেন। ঋণ পেয়েও যান তিনি। কিন্তু শর্তানুযায়ী ঋণের টাকা পরিশোধ করেননি।

২০১৪ সালের ২১ অক্টোবর চট্টগ্রামের লিজেন্ড হোল্ডিংসের প্রোপ্রাইটর সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল হাই সাউথ ইস্ট ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করেন। ঋণ পেয়েও যান তিনি। কিন্তু শর্তানুযায়ী ঋণের টাকা পরিশোধ করেননি। বরং ঋণের বিপরীতে মর্টগেজ হিসেবে রাখা সম্পদের মূল্য ৪৫ কোটি টাকা হলেও ১৪০ কোটি টাকা দেখানো হয়। এর সঙ্গে ব্যাংকের তখনকার কর্মকর্তা ও দুটি সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। ৮১ কোটি টাকার সেই ঋণ এখন সুদাসলে ২১৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শেষে একটি মামলা দায়ের করেছে। মামলার এজাহার সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল হক মামলাটি দায়ের করেন।

সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল হাই সাউথ ইস্ট ব্যাংক প্রিন্সিপাল শাখার গ্রাহক। তিনি লিজেন্ড হোল্ডিংসের চট্টগ্রামের ঠিকানা ব্যবহার করে ২০১২ সালের ১৮ জানুয়ারি একটি হিসাব খোলেন। ২০১৪ সালের ২১ অক্টোবর পুরনো শিপ আমদানির জন্য রিভলভিং ঋণ সুবিধার আওতায় সাউথ ইস্ট ব্যাংক থেকে ৪৩ কোটি ও ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে ৩৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকার টেকওভার টার্ম লোনের আবেদন করেন। আবেদনটি পর্যালোচনা করে ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী ঋণ প্রস্তাব তৈরি করে ২৫ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সাউথ ইস্ট ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার এক্সিকিউটিভ জহিরুল হক, ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড ক্রেডিট ইনচার্জ বজলুর রশিদ খান, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজার অপারেশনস সফিউর রহমান ও ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও শাখাপ্রধান এম কামাল হোসেন এসব কাজ সম্পন্ন করেন। প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটি পর্যালোচনা শেষে ২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর পরিচালনা পর্ষদের ৪৫০তম সভায় উপস্থাপন করেন।

সাউথ ইস্ট ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের নথির তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর লিজেন্ড হোল্ডিংসকে ৪৩ কোটি টাকার সমপরিমাণ রিভলভিং এলসি সুবিধা ও ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে লোন টেকওভারের জন্য টার্ম লোন বাবদ ৩৯ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করা হয়। ঋণের মঞ্জুরিপত্র শাখায় পাঠানো হলে শাখা থেকে ১৬ নভেম্বর ঋণ মঞ্জুরিপত্র ইস্যু করা হয়। মঞ্জুরিপত্রের অন্যতম শর্ত ছিল ১৮০ দিনের মধ্যে ৪৩ কোটি টাকার সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। তাছাড়া অন্য ঋণের ৩৯ কোটি টাকা প্রতি মাসে ১ কোটি ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে ৫০ মাসে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে আত্মসাৎ করেন।

গ্রাহক ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাত বছরে মাত্র ২ কোটি ৯৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা জমা দেন। গ্রাহকের কাছে ২০১৪ সালের ২১ অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আসল ১০৪ কোটি ৫৩ লাখ ৬০ হাজার, সুদ ১০৮ কোটি ৯৪ লাখ ১২ হাজার ও অন্যান্য ৭৮ লাখ ৬১ হাজার টাকাসহ মোট ২১৪ কোটি ২৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকা পাওনা হয়েছে ব্যাংক। দুদক বলছে, আসামিরা এ টাকা পরস্পর যোগসাজশে আত্মসাৎ করেছেন।

অনুসন্ধানকালে দুদকের অনুরোধে ২০২৩ সালে ২৭ জুলাই গ্রাহকের মর্টগেজটি মূল্যায়নের জন্য সাউথ ইস্ট ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও শাখাপ্রধান আবিদুর রহমান চৌধুরীকে দলনেতা এবং সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ম্যানেজার অপারেশন ওয়াহিদুর রহমান পাটোয়ারী ও সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মঈনুল হক সিরাজিকে সদস্য করে কমিটি গঠন করে সাউথ ইস্ট ব্যাংক। ওই কমিটি ৩০ জুলাই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। ৩০ আগস্ট সেই প্রতিবেদন দুদকের কাছে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দুদক দাবি করছে, ঋণ মঞ্জুরের সময় ব্যাংকের অনুকূলে মর্টগেজকৃত সম্পত্তির বাজারমূল্য ১৪০ কোটি টাকা এবং ওই সময়ের তাৎক্ষণিক মূল্য ১২১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা দেখানো হয়। সার্ভেয়ার কমোডিটি ইন্সপেকশন সার্ভিসেস (বিডি) লিমিটেড ও রয়েল ইন্সপেকশন ইন্টার‌ন্যাশনাল লিমিটেড মর্টগেজ সম্পত্তির এ মূল্যায়ন করে। কিন্তু ২০২৩ সালে সাউথ ইস্ট ব্যাংক গঠিত কমিটি মর্টগেজকৃত সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য ৪৫ কোটি এবং তাৎক্ষণিক বাজারমূল্য ৩৬ কোটি টাকা নিরূপণ করে।

দুদক বলছে, সাধারণত স্থাবর সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধি পায়। কিন্তু আলোচ্য স্থাবর সম্পত্তির বাজারমূল্য কমে গেছে। এতে প্রতীয়মান হয়, ঋণ মঞ্জুরের সময় সার্ভেয়ার, তখনকার শাখা ম্যানেজার ও শাখার ঋণ প্রস্তাবকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজশে মর্টগেজকৃত সম্পত্তির অতিরিক্ত মূল্যায়ন করা হয়েছে। তাছাড়া ঋণ মঞ্জুরিপত্রে সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল হাই, তার স্ত্রী নিলুফার আক্তার, ছেলে আহাদ সাদমান হাই ও আরিক রুফাস হাইদের ব্যক্তিগত গ্যারান্টি নেয়ার নির্দেশ ছিল। কিন্তু তখনকার শাখা ব্যবস্থাপক ও ঋণ বিতরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যাংক কর্মকর্তা শুধু সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল হাই ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত গ্যারান্টি নিয়েছেন। তখনকার শাখা ব্যবস্থাপক ও ডিএমডি এম কামাল হোসেন, এসএভিপি ও ইমপোর্ট ইনচার্জ জহিরুল হক এবং সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজার অপারেশন সফিউর রহমান গ্যারান্টার আহাদ সাদমান হাই ও আরিক রুফাস হাইদের ব্যক্তিগত গ্যারান্টি থেকে অবৈধভাবে অব্যাহতি দেয়ার ব্যবস্থা করেন।

ঋণ মঞ্জুরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও দুদকের এজাহারে ক্রেডিট কমিটি ও পরিচালনা পর্ষদের কাউকে আসামি না করায় বিস্মিত হয়েছেন এজাহারে আসামি হওয়া ব্যাংক কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে এম কামাল হোসেন, জহিরুল হক ও সফিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা চাকরি করেছি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেভাবে বলেছেন, আমরা সেটাই করেছি। অথচ পরিচালনা পর্ষদ, ক্রেডিট কমিটির কাউকে দুদক আসামি করেনি!’

এম কামাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চেয়ারম্যান আলমগীর কবীরকে আমি অনেকবার বলেছি, লিজেন্ড হোল্ডিংস ঋণের টাকা পরিশোধ করবে না। তিনি আমার কথা শোনেননি। তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন। এখানে আমার অপরাধ কী? অথচ দুদক তাকে আসামি করেনি।’

এ বিষয়ে দুদকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্রেডিট কমিটি সবসময় সম্পৃক্ত নয়। তার পরও তদন্ত পর্যায়ে ক্রেডিট কমিটি ও বোর্ডের কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তারাও আসামি হবেন।’

এজাহারে লিজেন্ড হোল্ডিংসের প্রোপাইটর সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল হাই, সাউথ ইস্ট ব্যাংকের এম কামাল হোসেন, জহিরুল হক, বজলুর রশিদ খান, সফিউর রহমান, কমোডিটি ইন্সপেকশন সার্ভিসেস (বিডি) লিমিটেডের পরিচালক খন্দকার রবিউল হক ও রয়েল ইন্সপেকশন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান শেখ সাজেদ আলীকে আসামি করা হয়েছে।

আরও