ফেনীতে গভীর নলকূপ স্থাপন প্রকল্প

কার্যাদেশে উল্লেখিত সরঞ্জাম পাচ্ছেন না উপকারভোগী

আর্সেনিকমুক্ত সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে ফেনীতে ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে গভীর নলকূপ স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রকল্পের আওতায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৪ হাজার ১৮৮টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হবে। এসব নলকূপের ১ হাজার ২৮১টির কার্যাদেশে একটি করে দেড় ঘোড়া মোটর ও পানির ট্যাংক দেয়ার কথা।

আর্সেনিকমুক্ত সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে ফেনীতে ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে গভীর নলকূপ স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রকল্পের আওতায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় হাজার ১৮৮টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হবে। এসব নলকূপের হাজার ২৮১টির কার্যাদেশে একটি করে দেড় ঘোড়া মোটর পানির ট্যাংক দেয়ার কথা। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনোমতে নলকূপ স্থাপন করেই টাকা উত্তোলন করছে। এমনকি নলকূপ স্থাপনে জন্য কার্যাদেশে উল্লেখিত নিদের্শনাও মানছে না তারা। নিয়ে প্রতিবাদ করায় সম্প্রতি জনস্বাস্থ্যের এক প্রকৌশলীকেও মারধর করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছর ১৯-২০ অর্থবছরে প্রকল্পের আওতায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে হাজার ১৮৮টি গভীর নলকূপ স্থাপনের কথা। এর মধ্যে পাম্পযুক্ত হাজার ২৮১টি নলকূপের জন্য ব্যয় ধরা হয় লাখ ১৪ হাজার ৮০০ টাকা করে ১৪ কোটি ৭০ লাখ ৫৮ হাজার ৮০০ টাকা। এর মধ্যে সদর উপজেলায় হাজার ২৮৬, দাগনভূঞায় হাজার ৪৫০ সোনাগাজীতে হাজার ৪৫২টি স্থাপনের কথা রয়েছে। এরই মধ্যে পাম্পযুক্ত গভীর নলকূপ প্রকল্প থেকে ফেনীতে পাঁচশতাধিক নলকূপ বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ নলকূপের সঙ্গে মোটর পানির ট্যাংক সংযোজন করা হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমবিডিএস এবং জামাল অ্যান্ড ব্রাদার্স।

সংশ্লিষ্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমবিডিএসের নামে যুবলীগ নেতা হুমায়ুন এবং জামাল অ্যান্ড ব্রাদার্সের নামে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন আরিফ প্রকল্পের কাজ করছেন।

কার্যাদেশে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, কার্যাদেশে প্রতিটি নলকূপ ৭২০ ফুট গভীর, ২২০ বর্গমিটার প্লাটফর্ম পাকাকরণ, একটি দেড় ঘোড়া মোটর ৫০০ লিটার পানির ট্যাংক দেয়ার কথা উল্লেখ করে। এছাড়া ৭২০ ফুট গভীরতায় ৮০ ফুটে ইঞ্চি পরিমাণ বাকি ৬৪০ ফুটে দেড় ইঞ্চি পরিমাণ পাইপ, ইটের গাঁথুনি করে পাঁচ ফুট উঁচু ট্যাংকের ফিটিং বেজ করার কথা রয়েছে। নলকূপের সঙ্গে মোটর পানির ট্যাংক ফিটিংসের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। বাস্তবে এসব নির্দেশনা পরিপালন করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি নলকূপ হাজার টাকা জমা দেয়ার কথা থাকলেও আদায় হচ্ছে ১৫-৩৫ হাজার টাকা। আবার নলকূপ স্থাপনে নিয়োজিত শ্রমিকদের খাওয়া খরচসহ নানা অজুহাতেও - হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ফেনীতে বসানো বেশির ভাগ পাম্পযুক্ত নলকূপে মোটর পানির ট্যাংক বসানো হয়নি। কিছু কিছু গ্রাহক বিষয় নিয়ে ঠিকাদার অফিসের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ করলে তাদের মোটর পানির ট্যাংক দিয়ে উল্টো হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। পরে গাড়ি ভাড়া করে এসব মোটর পানির ট্যাংক বাড়িতে নিয়ে গ্রাহকরা নিজ খরচে ফিটিংস করছেন। অথচ প্রকল্পে মোটর ট্যাংক ফিটিংসের জন্য ঠিকাদারদের অতিরিক্ত ১৫ হাজার টাকা পরিশোধ করছে সরকার।

সদর উপজেলার কালিদহ ইউনিয়নের ভালুকিয়া গ্রামে এক বাড়িতেই গিয়ে পাওয়া গেছে প্রকল্পের ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র। ওই বাড়ির আবদুল লতিফ নলকূপের জন্য ঠিকাদারের লোকজনকে ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। এছাড়া আরো হাজার টাকা দিয়েছেন শ্রমিকদের খাওয়া বাবদ। একই বাড়ির বৃদ্ধ এবাদুল হক জানান, তার ছেলে শাহ আলম হাজার শেখ আহমদ ১৫ হাজার টাকা নলকূপের জন্য জমা দিয়েছেন। ১৫ মাস আগে ওই টাকা দিয়ে বারবার ঠিকাদারের কাছে ধর্ণা দিলেও অদ্যাবধি নলকূপগুলো বসানো হয়নি। তবে কিছু পাইপ তার ঘরের আঙিনায় ঠিকাদারের লোকজন রেখে গেছেন।

পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মানিক জানান, তার ইউনিয়নে ১৫০টি নলকূপের মধ্যে কয়েকটিতে পাইপ স্থাপন করা হলেও একটাও চালু করা হয়নি। কোনোটিতেই মোটর-ট্যাংক দেয়া হয়নি।

সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বাদল জানান, তার ইউনিয়নে বরাদ্দকৃত ৫০টি নলকূপের মধ্যে এরই মধ্যে ২২টি স্থাপন করা হয়েছে। তবে এগুলোর অধিকাংশই অসম্পূর্ণ।

ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন বলেন, অনিয়মের বিষয়ে মৌখিকভাবে অভিযোগ পেয়েছি। তবে লিখিত অভিযোগ এখনো পাইনি।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সূত্র জানায়, সম্পূর্ণ কাজ শেষ না করে বিল দিতে রাজি না হওয়ায় সম্প্রতি এক ঠিকাদারের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন সদর উপজেলা প্রকৌশলী সমেশ আলী।

ঠিকাদার হুমায়ুন আহমেদ জানান, তিনি যেসব কাজ করেছেন সবগুলোয় মোটর, ট্যাংক প্রদানসহ যথাযথভাবে সরকারি নির্দেশনা মানা হচ্ছে। প্রকল্পের বেশির ভাগ কাজই চলমান রয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক প্রকৌশলীর ঘুষ দাবির কারণে কাজে ধীরগতি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জানতে চাইলে সোনাগাজী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন বলেন, গভীর নলকূপ প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। অবৈধ সুবিধা নিতে কতিপয় ব্যক্তি আমার নাম ব্যবহার করতে পারে।

আরও