গ্যাসের অপচয় রোধ ও সিস্টেম লস এড়ানো যায় বলে রাজধানীতে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে স্মার্ট মিটার। গ্রাহকসেবা বাড়াতে এবার ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় সাড়ে ছয় লাখ স্মার্ট মিটার স্থাপন করতে চায় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। প্রকল্পটিতে প্রতিটি মিটার স্থাপন ও কমিশনিং বাবদ ৩০ হাজার ১০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও একই ধরনের চলমান একটি প্রকল্পে প্রতি মিটারে দাম পড়ছে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। সে হিসেবে প্রায় দ্বিগুণ দামে মিটার কিনতে চাচ্ছে তিতাস। অতিরিক্ত এ মূল্য নির্ধারণে আপত্তি জানিয়ে যৌক্তিকতা জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
চলমান প্রকল্পে মিটার ফি বা ভাড়া ১০০ টাকা হলেও প্রস্তাবিত প্রকল্পে সেই ফি ২০০ টাকা করতে চাচ্ছে তিতাস। বিষয়টিকে অস্বাভাবিক আখ্যা দিয়ে তা ভোক্তা পরিপন্থী বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মিটারের দ্বিগুণ মূল্যের বিষয়েও তারা বলছেন, বাড়তি এ চাপ পড়বে ভোক্তাদের ওপরই। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অস্বাভাবিক মিটার ভাড়া ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এটা অগ্রহণযোগ্য। আর এখন ১ টাকার জিনিস ১০ টাকায় কেনা হয়।’
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্রমতে, ‘স্মার্ট মিটারিং এনার্জি ইফিশিয়েন্সি ইমপ্রুভমেন্ট’ নামের প্রকল্পটি ২০২৪-২৮ সালের মধ্যে অর্থাৎ পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন করতে চায় তিতাস। ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। এর সিংহভাগই অর্থায়ন করবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। মোট ব্যয়ের ৭৯ শতাংশ অর্থ ব্যয় হবে সাড়ে ছয় লাখ প্রি-পেইড মিটার কেনা ও স্থাপন বাবদ। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে।
যাচাই কমিটির গত জুনের বৈঠকে প্রস্তাবিত প্রকল্পে মিটারের অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের যৌক্তিকতা জানতে চেয়েছে কমিশন। পাশাপাশি প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন বেশকিছু মতামতও দিয়েছে। ক্রয় পদ্ধতি নির্ধারণে পিপিআর-২০০৮-এর বিধি অনুসরণ করা হয়নি বলছে কমিশন। মিটারপ্রতি সব সংস্থাকে একই হারে ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া যানবাহন কেনা, বিদেশে প্রশিক্ষণ, অফিস ভাড়া এবং একই সময়ে একাধিক সমজাতীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে মতামত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পটির বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সংশ্লিষ্ট উইংয়ের যুগ্ম প্রধান এএসএম মুস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতিরিক্ত দাম নির্ধারণের ভিত্তি কী, সেটা আমরা জানতে চেয়েছি তিতাস কর্তৃপক্ষের কাছে। এ বিষয়ে তাদের কাছ থেকে এখনো জবাব আসেনি। সন্তুষ্টিজনক যুক্তি না থাকলে প্রকল্পটি একনেকে পাঠানো হবে না।’
সিলেট অঞ্চলে ৫০ হাজার মিটার স্থাপনের জন্য ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড (জেজিটিডিএসএল) একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে। প্রতিটি মিটার সাড়ে ১৭ হাজার টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত হয়। তাছাড়া তিতাসের প্রকল্পে ওয়েব সিস্টেম ও অটোমেটিক রিয়েল টাইম মনিটরিং সুবিধাসংবলিত যে স্মার্ট মিটার ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, তার বাজারদর ঘেঁটে দেখা যায়, প্রস্তাবিত দামের চেয়ে এর প্রকৃত দাম প্রায় অর্ধেক। চীনের হুয়ান টাইমওয়েব টেকনোলজি কোম্পানির এ স্মার্ট মিটারের মূল্য মানভেদে ৭০ থেকে ১৪৫ ডলারের মতো। সে হিসাবে প্রতি ডলার ১১০ টাকা ধরে মিটারের দাম আসে ৭ হাজার ৭০০ থেকে ১৬ হাজার টাকার মতো। এসব মিটার বাসা ও কারখানায় ব্যবহার করা হয়।
ডিপিপির (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) তথ্যমতে, দেশে তিতাসের আবাসিক গ্রাহক রয়েছে ২৩ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি। সিস্টেম লস ও অবৈধ গ্রাহক রুখতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ তিন বছরের মধ্যে শতভাগ স্মার্ট মিটার স্থাপন করবে বলে ২০২০ সালে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যদিও এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ২৮ হাজারের কিছু বেশি গ্রাহককে এডিবি ও জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পের মাধ্যমে স্মার্ট মিটার দিতে পেরেছে তিতাস। এর মধ্যে জাইকার প্রকল্পটি ২০১৭ সালে শুরু হয়ে এখনো চলমান। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আরেকটি প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে ১১ লাখ মিটার স্থাপন করা হবে। অর্থাৎ সব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তিতাসের মোট গ্রাহকের প্রায় ৮৫ শতাংশ স্মার্ট মিটারের আওতায় আসবে।
২০১০ সালে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বুয়েটের সহায়তায় সাড়ে চার হাজার স্মার্ট মিটার স্থাপন করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে আরো সাড়ে আট হাজারের বেশি মিটার স্থাপন করা হয় এডিবির অর্থায়নে। অন্যদিকে তিতাসের প্রস্তাবিত প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দেখা গেছে, স্মার্ট মিটার স্থাপনে প্রতিটি চুলা থেকে মাসে প্রায় ২৬ ঘনমিটার গ্যাস সাশ্রয় হবে। যদিও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে প্রকল্পটিকে আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত নয় বলে উল্লেখ করা হয়। তবে অর্থনৈতিক বিবেচনায় মিটার স্থাপন করা হলেও নমনীয় ঋণের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের পরামর্শ দেয়া হয় স্টাডিতে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানান, রান্নার গ্যাস ব্যবহারে চুলাপ্রতি টাকা দেয়ার বদলে প্রি-পেইড মিটারে খরচ ও গ্যাসের ব্যবহার দুটোই অনেক কম হয়। তাছাড়া প্রি-পেইড বা স্মার্ট গ্যাস মিটার সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। এ মিটারে কোনো লিকেজ থাকলে গ্যাস সরবরাহ অটোম্যাটিক বন্ধ হয়ে যায়, ফলে গ্যাসের সাশ্রয় হয় ও অযাচিত দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হয়।
প্রি-পেইড মিটার লাগানোর পর অনেকে গ্যাস ব্যবহারেও সাশ্রয়ী হয়েছেন। জানতে চাইলে শাহজাদপুরের বাসিন্দা তামান্না আক্তার বলেন, ‘গ্যাসের বিল কত হবে এটা আসলে পুরোটাই আমার ওপর নির্ভর করে। যেমন ধরেন, আগে একটা রান্না সারার পর চুলা জ্বালানোই থাকত। বর্ষাকালে অনেক সময় কাপড়ও শুকানো হতো চুলার আগুনে। অথবা প্রায়ই দেখা যেত চুলা হালকা করে জ্বালিয়ে রেখেও অনেক কিছু করতাম। এখন আর সেটা তো করিই না বরং সবকিছু রেডি করে একবারে চুলা ধরাই, সব রান্না একসঙ্গে করি।’ তবে মিটারের মূল্য ও ফি বাড়লে তা গ্রাহকের ওপরই চাপ বাড়বে বলে জানান তিনি।
মিটারের দাম আরো বেশি হওয়ার কথা ছিল বলে জানান তিতাসের পরিকল্পনা বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক ড. প্রদীপ চন্দ্র মণ্ডল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এসব মিটার ১০ বছর চলবে। এ সময়ের ভেতর টাকা উঠিয়ে আনতে আরো বেশি ভাড়া হতে পারত। কিন্তু যেহেতু সরকারি প্রকল্প, তাই সেভাবে ভাড়া ধরা হয়নি।’
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে প্রকল্পটি আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত নয় বলা হচ্ছে—এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে মিটার ভাড়া ছাড়া তিতাসের আর কোনো আয় নেই। তাই আর্থিক বিবেচনায় এটা বাস্তবসম্মত না হলেও রাষ্ট্রের দিক থেকে বাস্তবিক। কারণ মিটার স্থাপনের ফলে গ্যাস অপচয় রোধ করা যাবে। তখন আর বিদেশ থেকে বেশি পরিমাণে এলএনজি আনতে হবে না।’
মিটারের অতিরিক্ত দামের বিষয়ে এ প্রকৌশলী বলেন, ‘আগের চেয়ে এ প্রকল্পের মিটারগুলো বেশি স্মার্ট। আগের মতো দোকানে গিয়ে কার্ডে টাকা রিচার্জ করতে হবে না। বাসায় বসেই নিজে নিজে টাকা রিচার্জ ও রিয়েল টাইম ডাটা চেক করা যাবে।’