চুয়াডাঙ্গার আকন্দবাড়ীয়া আশ্রয়ণ

২৩ ব্যারাকের সব ঘরই বসবাসের অনুপযোগী

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের আকন্দবাড়ীয়া গ্রামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এ প্রকল্পে ২৩টি ব্যারাকের সব?ঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের আকন্দবাড়ীয়া গ্রামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রকল্পে ২৩টি ব্যারাকের সব?ঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব ঘরে ১০০টি পরিবারের তিন শতাধিক সদস্য মানবেতর জীবনযাপন করছে। এছাড়া গুচ্ছগ্রামের ৭০টি ঘরেরও একই দশা। আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাদের স্বাবলম্বী করতে নানা ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার কথা থাকলেও সেটি শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বেগমপুর ইউনিয়নের ২৩ নন্বর আকন্দবাড়ীয়া গ্রামের নম্বর খাস খতিয়ানের জমিতে রজনীগন্ধা পারিজাত আশ্রয়ণ নামে ২৩টি ব্যারাকে সারিবদ্ধভাবে গড়ে তোলা হয় টিনশেড ঘর। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে ব্যারাক নির্মাণ করা হয়। সেখানে মাথাগোঁজার ঠাঁই হয় ১৯০টি ভূমি গৃহহীন পরিবারের। পরবর্তী সময়ে ডালিয়া গুচ্ছগ্রামে ৪০টি এবং উদয়ন নামে ৩০টি একক পরিবারের জন্য গড়ে তোলা হয় ৭০টি একক ঘর। আকন্দবাড়ীয়া গ্রামে ২৬০টি পরিবারের জন্য গড়ে ওঠে ৯৩টি ব্যারাক।

একই সারিতে পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে ঘর তৈরি হওয়ায় এখানে বরাদ্দ পেলেও অনেকেই বসবাস করতে চাননি। আবার অনেকে অন্যত্র চলে গেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয়ণের অধিকাংশ ঘর জরাজীর্ণ। দীর্ঘদিন অবস্থায় থাকার কারণে ঘরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আবাসনে নেই বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ স্যানিটেশন ব্যবস্থা। অনেকটা খোলা জায়গাতেই আশ্রয়ণের বাসিন্দাদের মলমূত্র ত্যাগ করতে হয়। ব্যারাক এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে দুর্গন্ধময় পরিবেশ।

অধিকাংশ ব্যারাকের ছাউনির টিনে মরিচা ধরে বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় ছিদ্র হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি এলেই টিনের ছিদ্র দিয়ে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। বৃষ্টির পানিতে ঘরের ভেতরে রাখা জিনিস আসবাব ভিজে যায়। শোয়ার জায়গাটাও পানিতে ভিজে একাকার। ঘরের জিনিসপত্র রক্ষায় টিনের ছিদ্র বরাবর হাঁড়ি-পাতিল পেতে রাখতে হয়।

পাকা খুঁটির সিমেন্টগুলো খসে পড়ে লোহার রড বের হয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি আটকাতে অনেকে আবার টিনের চালের ওপর টাঙিয়ে দিয়েছেন পলিথিন। পানির জন্য বসানো টিউবওয়েল এবং শৌচাগারের অবস্থাও বেহাল। প্রায় সব শৌচাগার ভেঙে নষ্ট হয়ে গেছে। সেখান থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। মশামাছির উপদ্রবের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন আশ্রয়ণের বাসিন্দারা। রাতের আঁধারে খোলা জায়গায় সারতে হচ্ছে তাদের মলমূত্র ত্যাগের কাজ।

আশ্রয়ণে বসবাসকারী জনাব আলী, আলেয়া, রোজিনাসহ অনেকেই বলেন, এখানে বসবাসকারী প্রায় সবাই দিনমজুর, কৃষিকাজ, ভ্যান অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। অনেকের ঘরে উপার্জনক্ষম লোক না থাকায় বয়স্ক, বিধবা ভাতা সরকারি ত্রাণ তাদের একমাত্র অবলম্বন। অবস্থায় ঘূর্ণিঝড় বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়। বাসিন্দারা বলেন, সরকারি ঘর পেয়ে আমরা আনন্দিত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ঘরে থেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বাবলম্বী হব। কিন্তু স্বাবলম্বী হওয়া তো দূরের কথা এখন আর কেউই আমাদের খোঁজ রাখে না। আশ্রয়ণের ঘরগুলো মেরামতের জন্য বারবার কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

একটি সূত্র জানিয়েছে, এখানে ঘর নিয়ে কেউ অনৈতিক কর্মকাণ্ডে আবার কেউ মাদক কারবারে জড়িয়ে আবাসন ছাড়া হয়েছে। ওই ঘরগুলোয় কে কখন কোথা থেকে এসে বসবাস করছে তার সঠিক হিসাব কেউ রাখে না।

বেগমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী হোসেন বলেন, ইউনিয়নে যতগুলো আশ্রয়ণের ঘর আছে তা নির্মাণ এবং দেখভাল করে থাকে উপজেলা প্রশাসন। যেখানে জনপ্রতিনিধিদের কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। সরকারি টাকা খরচ করে গড়ে তোলা ঘরগুলো বসবাসের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। আবার একই নামে অনেকে একাধিক ঘর নিয়ে রেখেছে। যেখানে গরু-ছাগল পোষা হচ্ছে। মানুষের সঙ্গে পাশাপাশি ঘরে পশুও বসবাস করছে।

বেগমপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সেলিম রেজা বলেন, সরেজমিনে তদন্ত করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো মেরামত করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। আশা করি, তাড়াতাড়ি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম ভূইয়া বলেন, ব্যারাক মূলত সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে নির্মাণ করা হয়েছে। ব্যারাকের জমি এখনো সরকারি সম্পদ। সেটা ব্যবহারকারীদের দলিল করে হস্তান্তর করা হয়নি। সে কারণেই এখানে সমস্যা রয়েছে। তাছাড়া ব্যারাকে একই সঙ্গে একই সারিতে ঘরগুলো নির্মাণের ফলে এখানে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাসে সমস্যা হয়। সে কারণেই অনেকে এখানে বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। কিন্তু আশ্রয়ণের একক ঘরগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। ঘরগুলোর সামনে বেশকিছু জমি রেখে সেটা দলিল করে তা বসবাসকারীকে দেয়া হচ্ছে। ফলে বসবাসকারীরা নিজেদের মতো করে ঘরের সবকিছুই তদারকি করছেন। তবে আশ্রয়ণে বসবাসের অনুপযোগী ঘরগুলো চিহ্নিত করে তা মেরামতে ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দের টাকা এলেই মেরামতের কাজ শুরু হবে।

আরও