স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বের হতে দ্বিতীয় দফায় জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আজ জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এলডিসিগুলোর জন্য ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা বৈঠক শুরু করছে। সিডিপি দ্বিতীয় দফায় এলডিসি থেকে বের হওয়ার প্রয়োজনীয় মানদণ্ড বাংলাদেশ পূরণ করতে পেরেছে কিনা তার পর্যালোচনা করবে।
সিডিপির পর্যালোচনা সভা ২২-২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনে অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের পক্ষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেবে।
প্রথম দফায় ২০১৮ সালের মার্চে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার যোগ্য হিসেবে সিডিপির সুপারিশ লাভ করে। নিয়ম হচ্ছে এলডিসি থেকে বের হতে সিডিপির পরপর দুটি পর্যালোচনায় উত্তরণের স্বীকৃতি পেতে হয়। এ স্বীকৃতি পাওয়ার পর আরো তিন বছর এলডিসি হিসেবে থাকে একটি দেশ। তারপর উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যাত্রা শুরু হয়। এ তিন বছরকে এলডিসি থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতির সময় ধরা হয়। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ সম্প্রতি অনুষ্ঠিত স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ সম্পর্কিত এক্সপার্ট গ্রুপের সভায় সিডিপির কাছে এ উত্তরণকাল তিন বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার আহ্বান জানিয়েছে।
উত্তরণ প্রক্রিয়াকে মসৃণ ও টেকসই করা এবং করোনাভাইরাসের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে বাড়তি দুই বছর সময় চেয়েছে বাংলাদেশ। সিডিপি ওই বৈঠকে বাংলাদেশের এ আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। সিডিপির বিধান অনুযায়ী, এলডিসি থেকে বের হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ লাভের পর একটি দেশ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রস্তুতিকাল ভোগ করতে পারে। সুপারিশপ্রাপ্ত দেশ প্রস্তুতিকালীন এ সময়ে এলডিসি হিসেবে প্রাপ্ত সব সুবিধা পেয়ে থাকে। এছাড়া বর্তমান নিয়মে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারগুলোতে আরো তিন বছর শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ ইইউর বাজারে ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা পাবে।
সিডিপি একটি দেশের তিনটি সূচকের মানের ভিত্তিতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করে। সূচকগুলো হচ্ছে মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ এ তিনটি সূচকেই প্রয়োজনীয় মান অর্জন করেছে। সিডিপির বিচারে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৪২ মার্কিন ডলার হতে হয়। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ২ হাজার ৬৪ ডলার। মানব সম্পদ সূচকে দেশের ৬৬ ভাগ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে হয়, বাংলাদেশের এক্ষেত্রে অর্জন ৭২ দশমিক ৯ ভাগ। এ সূচক পুষ্টি, স্বাস্থ্য, মাতৃমৃত্যু হার, স্কুলে ভর্তি ও শিক্ষার হারের সমন্বয় করে তৈরি করা হয়। আর অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুরতার মাত্রা ৩২ ভাগের নিচে হতে হয়, বাংলাদেশের এ মাত্রা ২৫ ভাগে রয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার জন্য যেসব শর্তাদি রয়েছে, তার সবগুলোই ভালোভাবে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। সিডিপি বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের জন্য অবশ্যই সুপারিশ করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমরা পুরো জাতি সম্মান ও গৌরবজনক অর্জনের সামনে রয়েছি।
বাংলাদেশের সামনে এলডিসি থেকে বের হওয়ার সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ দুটোই আছে। এ অর্জনে বাংলাদেশের বড় ধরনের ব্র্যান্ডিং হবে। এখানকার অর্থনীতি উদীয়মান, বড় বাজার সৃৃষ্টি হচ্ছে—এমন বার্তা বিশ্ববাসী পাবে। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের মানদণ্ডে উন্নীত হওয়া মানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তুলনামূলক কম ঝুঁকি রয়েছে। ফলে দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যখন দেখবে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বাড়ছে মানে এখানে অভ্যন্তরীণ বাজার বড় হচ্ছে, তখন তাদের আগ্রহ বাড়বে। দেশের বাইরের বিভিন্ন উৎস থেকে সরকার এবং বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘ক্রেডিট রেটিং’ আগের চেয়ে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।